মুসান্না মেহবুব :
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা যেমন কয়েকগুণ বেড়েছে, তেম্নি বেড়েছে মাহফিলগুলোতে আলোচকের সংখ্যাও। তরুণদের মধ্যে অনেকেই আসছেন এই ময়দানে, আসছেন তুলনামূলক প্রবীণরাও। ওয়াজ মাহফিলে বক্তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিভ্রান্তিকর অনেক বক্তব্যও। বয়ান করতে গিয়ে অনেকেই ইসলাম ও ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়র ভুল কিংবা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছেন মানুষের সামনে। ফলে সাধারণ মানুষদের অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন এসব বক্তব্যে, আবার অনেকে বক্তব্যের অসারতা ধরতে পেরে ঢালাওভাবে সমালোচনা করছেন ওলামায়ে কেরামের।
প্রবীণ ওয়ায়েজ ও বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বলছেন, ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মাহফিলগুলোতে সুরেলা বক্তার চাহিদা থাকায় ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ অনেক সুরেলা কারী কিংবা সঙ্গীতশিল্পী অথবা কণ্ঠধারী লোক বয়ানের ময়দানে নামার কারণেই মূলত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদানের মাত্রাটা বেড়েছে।
ইউটিউব ঘেঁটে দেখা গেছে বিভ্রান্তিকর কথা বলে বেড়ানো বক্তাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা প্রশ্নবিদ্ধ। কণ্ঠ ভালো হবার কারণে মাজারের খাদেম থেকে উচ্চতর পড়াশোনা ব্যতিরেকেই বক্তা হয়ে গেছেন অনেকে। ফলে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তার অবতারণা করছেন তাঁরা।
কিছুদিন আগে কিশোরগঞ্জের এক বক্তা অতিরিক্ত নবিপ্রেম দেখাতে গিয়ে দাবি করে বসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুসলমান না, তিনি নিজেই ইসলাম! এই বক্তব্যের অসারতা স্থানীয় জনতাও ধরতে পেরেছিল। উত্তেজিত জনতার হাতে পাকড়াও-ও হয়েছিল এই বক্তা, পরে পুলিশ এসে তাকে থানা হেফাজতে নিয়ে রক্ষা করে।
ওয়াজে বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা কেন বাড়ছে জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও ওয়ায়েজ ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ওয়াজের ময়দানে বক্তাদের অনেকগুলো ধারা আছে। বেরলভি, জামায়াত, কওমি ওলামায়ে কেরামদের মধ্যেও আরও কয়েকটি ধারা। মাহফিলের বক্তারা এসব ধারার যেকোনো একটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। নির্দিষ্ট ধারা থেকে তাদেরকে পৃষ্ঠপোষণও করা হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সবকয়টি ধারায়ই ইদানীং ব্যাপক হারে তরুণ ও নতুন বক্তা এসেছেন। ময়দানে চাহিদা থাকবার কারণে তাঁরা বেশ সমাদৃতও হচ্ছেন, এটা ভালো দিক। কিন্তু সমস্যা হলো এই বক্তাদের অনেকেরই ইলমি যোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে, ফলে ইসলামের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এরা নিজেদের জ্ঞানহীনতার কারণে বিভ্রান্তিকর ও অমূলক কথাবার্তা বলে ফেলেন।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, অতীতে এতো ব্যাপকহারে ‘বে-ইলিম’ বক্তার উপস্থিতি ছিল না, ময়দানে যাঁরা আলোচনা করতেন তাঁদের অনেকেই মুহাদ্দিস কিংবা মুফাসসির ছিলেন। যাঁরা আক্ষরিক অর্থে মুহাদ্দিস কুংবা মুফাসসির না, তাঁরাও কুরআন-হাদিস সম্পর্কে ভালো জানাশোনা রাখতেন। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, একসময় যে কারী হিসেবে মাহফিলে মাহফিলে কেরাত পড়ত, কিংবা শিল্পী হিসাবে হামদ-নাত বা কাসিদা পড়ত, সুর এবং কথা বলার যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে সেও এখন বক্তা হয়ে গেছে। অথচ তার না আছে ইলমি যোগ্যতা, না আছে দাওরা কিংবা কামিলের সার্টিফিকেট। ইসলাম বিষয়ে বাংলা কিছু বই-পত্র পড়ে তারা ওয়াজের ময়দানে নেমে যায়, তাদের অধিকাংশের কথায়ই থাকে ভ্রান্তি কিংবা ইসলামের জাহালাতপূর্ণ ব্যাখ্যা।
ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, কয়েকদিন আগে বেশ কয়েকজন তরুণ বক্তা সম্পর্কে আমি জানতে পারলাম, এরা দাওরাও পাশ করেনি, কিন্তু কণ্ঠ ভালো, নামকরা বিভিন্ন সুরেলা ওয়ায়েজের কণ্ঠ নকল করে কথা বলতে পারে, তাই বাংলা কিছু ওয়াজের বই পড়ে তারা ময়দানে নেমে গেছে।
বিশিষ্ট এই ইসলামিক স্কলার বলেন, এটা অত্যন্ত ভয়াবহ দিক। এমনটা চলতে থাকলে দাওয়াতের এই ময়দানটা ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। তাই, ধর্মীয় প্রত্যেকটি ঘরানার মুরব্বিদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, বেএলেম এবং জাহেল কোনো লোক যেন কেবলই সুরের ওপর ভর করে বয়ানের ময়দানো না আসতে পারে, সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক হবেন। যারা ইতিমধ্যে এসে গেছে, তাদেরকে যথাযথ কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে কুরআন-হাদিস নিয়ে আলোচনার বেসিক জ্ঞানটুকু শিখিয়ে দেবেন। পাশাপাশি বিভ্রান্তিমূলক কোনো কথাবার্তা যাতে তাঁরা আর না বলতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক রাহনুমায়ি করবেন।
