কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন : বেরলবি ঘরানা যা বলছে

কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন : বেরলবি ঘরানা যা বলছে

মুসান্না মেহবুব:

কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কওমি ঘরানার ওলামায়ে কেরাম। এ উপলক্ষে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে একটি করে সমাবেশ অনুষ্ঠানপূর্বক আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে তাঁরা স্মরণকালের বৃহত্তম গণসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের বেরলবি ঘরানার আলেম ও নেতৃস্থানীয়রা কাদিয়ানিদের কাফের ঘোষণার দাবিতে একমত থাকলেও কওমি ঘরানার ওলামায়ে কেরামের এ আন্দোলনে তাঁরা শরিক হবেন না বলে জানিয়েছেন।

ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে একান্ত আলাপে তাঁরা বলেছেন, কওমি ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে আকিদাগত নানা বিষয়ে তাদের মতপার্থক্য রয়েছে, কওমি আলেমরা মিলাদ-কিয়ামের তীব্র বিরোধিতা করেন, ফলে তাঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্দোলন করা সম্ভব নয়। তবে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে কাফের ঘোষণার দাবিতে যে বা যারাই চেষ্টা চালাবে, তাদের সে চেষ্টার প্রতি বেরলবি ঘরানার নৈতিক সমর্থন থাকবে।

বেরলবি ঘরানার বিশিষ্ট আলেম ড. সৈয়দ এরশাদ বোখারির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, ‘সিংহকে মারার জন্য বাঘের সঙ্গে হাত মেলানো সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, কওমি ঘরানার সঙ্গে আমাদের বিশ্বাসগত মতপার্থক্য এবং এর সূত্র ধরে মনোমালিন্য বিদ্যমান, তাই তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কোনো আন্দোলনে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি তাঁরাও জোরালোভাবে করে আসছেন বলে জানান ড. সৈয়দ এরশাদ। তিনি বলেন, কাদিয়ানিরা আমাদের মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে শেষ নবি হিসেবে মানে না। কুরআন ও হাদিসের অনেকগুলো ভাষ্যের অস্বীকারকারী তারা। তাই তারা কোনোভাবেই মুসলিম থাকতে পারে না। তারা কাফের। মনগড়া স্বতন্ত্র ধর্মের অনুসারী। তাদেরকে যারা কাফের মনে করবে না, তারাও কাফের। অতএব বাংলাদেশে তারা বসবাস করতে চাইলে অমুসলিম পরিচয়েই বসবাস করতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ঘোষণা দিতে হবে যে, তারা অমুসলিম। আমরা মাঠে ময়দানে বহুকাল আগ থেকেই এই দাবি জানিয়ে আসছি। কওমি আলেমরাও একই দাবি জানাচ্ছেন, তাদের দাবির সঙ্গে আমরা একমত, কিন্তু তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনে আমাদের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না।

ড. এরশাদ আরও বলেন, কাদিয়ানিরা মুসলিম পরিচয়ে এ দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, মানুষ বুঝতেই পারছে না এরা যে কাফের, তাই তাদের এই অপতৎপরতা প্রতিরোধে অবিলম্বে তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাফের ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি আমরা সরকারের কাছে।

তিনি বলেন, এই দাবি জানাতে কওমি আলেমদের সাথে একজোট হবার এবং তাদের আন্দোলনে শরিক হবার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। আমরা হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম—এদের কারও সঙ্গেই কোনো আন্দোলনে কখনও যাবো না।

কওমি আলেমরা যে দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সে দাবির ব্যাপারে আপনাদের ঐক্যমত্য থাকা সত্ত্বেও ঠিক কী কারণে তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করছেন না জানতে চাইলে ড. এরশাদ বলেন, সিংহকে মারার জন্য বাঘের সঙ্গে তো আমরা হাত মেলাতে পারি না, তাই না?

ড. এরশাদের দাবি, কওমি আলেমগণ মিলাদ-কিয়ামের বিরোধিতা করতে গিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেন না। তাই এ ধরনের মানুষের সাথে তারা কোনো ধরনের আন্দোলনে যেতে রাজি না। তবে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবির প্রতি যেহেতু ঐক্যমত্য আছে, তাই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলে এর প্রতি নৈতিক সমর্থন থাকবে বলে জানান তিনি।

একই কথা বলছেন বেরলবি ঘরানার অন্যতম সংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক। তিনি বলেন, কাদিয়ানিরা সর্বসম্মতভাবে কাফের বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের আলেমগণ এ ব্যাপারে সোচ্চার বক্তব্য রাখেন। কওমি আলেমরা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, ভালো কথা, দাবির প্রতি যেহেতু আমরা একমত, তাই এতে স্বাভাবিকভাবেই নৈতিক সমর্থন থাকবে। কিন্তু আন্দোলনে আমরা শরিক হবো না।

গাউসিয়া কমিটির অন্যতম এই নেতা আরও বলেন, তবে আমাদের ঘরানার বড় বড় আলেমদের সঙ্গে যদি আপোষ করতে পারেন কওমি আলেমরা, এবং মতপার্থক্য দূর করে তাদেরকেও আন্দোলনে ‘সম্মানজনক’ অংশীদার করেন তাহলে হয়তো ঐকবদ্ধভাবে আমরা আন্দোলনে শরিক হতে পারি।

আগের সংবাদধর্মের মুখোশে পশ্চিমা মূল্যবোধ: ইসলামের আধুনিক ব্যাখ্যা
পরবর্তি সংবাদকাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন: আহলে হাদিস আলেমরা যা বলছেন