মুজাহিদুল ইসলাম :
নতুন জিনিস সবার কাছেই চিত্তাকর্ষক। নতুনত্ব মানুষকে খুব সহজেই টানতে পারে। এবং নতুন উপস্থাপিত বস্তু যদি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মাধ্যম হয়, তবে তো তার গুরুত্ব ও ভালোলাগাটা ভিন্ন মাত্রা পায়।
পশ্চিমা বিশ্বের জগত প্রথমে জানার গরজ থেকে ইসলাম পাঠের চেষ্টা করে এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই মূলত মুসলিমদের ওপর পশ্চিমা আগ্রাসনের সূচনা। ইসলামের অনুসারীদের সভ্য করার কথিত নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা মুসলিম ভূখণ্ডে উপনিবেশবাদ কায়েম করে। উপনিবেশবাদ কায়েমের পর শাসিত শ্রেণীকে নৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য তাদের বিশ্বাসের উৎসে পরিকল্পিত আগ্রাসনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে পশ্চিমারা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই পাশ্চাত্যের কারখানায় তৈরী ধর্মপাঠের নতুন ও উদ্ভট নিয়ম-কানুন আমদানি মুসলিম বিশ্বে। শাসিত শ্রেণীর নিকট হাতে-নাতে প্রাচ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও দুর্বলতা ধরা খাওয়ার পর শুরু হয় তাদের নির্বাচিত মুসলিম ব্যক্তিদের মাধ্যমে নতুন বোতলে সেই পুরাতন মদের অভিনব উপস্থাপন। এটাই ইসলামের নতুন ব্যখ্যার প্রেক্ষাপট।
ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা উদ্ভবের পেছনের কথা, ব্যাখ্যার দিকপাল এবং তাদের গুরু প্রাচ্যবিদদের চিন্তা ও কর্মপন্থার অভিন্নতার কিছু উদাহরণসহ এটা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা ব্যক্তি ও বইয়ের কিছু পরিচয় খোঁজা হবে এই লেখায়।
‘নতুন মুসলিম চিন্তা’ গড়ে ওঠার পেছনের কথা ও কারিগর
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকায় ফ্রান্সের এবং ভারতবর্ষে ব্রিটেনের দখলদারিত্বে নিষ্পেষিত মুসলিম বিশ্বের মুক্তিকামী আরব ও মুসলিম যুবকরা পাশ্চাত্যের চোখ ধাঁধানো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উথানে মুগ্ধ হয়। কুরআন-সুন্নাহের মূলপাঠের ব্যাখ্যা পাশ্চাত্য অনুসৃত রীতিনীতি অনুযায়ী করতে তারা স্বস্তি অনুভব করতে থাকে। এবং মুসলমানদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি তাদেরই মতো, এটা প্রমাণ করাই কেমন যেন তাদের মৌলিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়। পাশ্চাত্যের নিকট পশ্চাদপদতার কালিমা দূর করার উপায় খোঁজা হয়। মুহাম্মাদ আব্দুহ, জামালুদ্দিন আফগানী, রাফাআহ তাহতাবীসহ অনেকের মাধ্যমে ভবিতব্য আশংকাকে স্বাগত জানানো হয়।
ইসলামের স্বতন্ত্র গবেষণা-রীতি বহির্ভূত পশ্চিমা মানদন্ডে রচিত কিছু বই যার নতুন ব্যাখ্যার পথকে সুগম করে। বইগুলোর সংক্ষিপ্ত একটা তালিকা এখানে পেশ করা হলো। ১. ‘ইসলাম ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা’, লেখক : পাকিস্তানী চিন্তক আব্দুর রহমান। ২. ‘কুরআনের গাল্পিক শৈল্প’, লেখক : মুহাম্মাদ খালফাল্লাহ। ৩. ‘বিশ্বাস থেকে বিপ্লব’ লেখক: হাসান হানফী।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে এ ধারা পূর্বের যে-কোনো সময়ের তুলনায় আরো পরিপক্ক ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুহাম্মাদ আরকুন লিখিত ‘ইসলামী চিন্তার সমালোচনা’ এবং মুহাম্মাদ আবিদ আল জাবিরী লিখিত ‘আরব মানসের সমালোচনা’ বইদুটি সরাসরি ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি তথা উত্তরাধিকারের উৎসের সমালোচনা করে প্রকাশিত হয়। যা এ ধারার পথিকৃত বলে স্বীকৃত। এবং বর্তমানে এর বিপরীতেই তৈরী হচ্ছে একাধিক লেখনী।
নব্য ব্যাখ্যায় যা আছে
১. ইসলাম বহিরাগত সভ্যতা : ইসলামের বিশ্বাস ও বিভিন্ন মুজিযা পূর্ববর্তী বিভিন্ন সভ্যতা থেকে নেওয়া। স্বতন্ত্র ও ঐশ্বরিক নয়। যেমন আহমাদ আমীন বলেন, ‘আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিশ্বাস ইহুদিদের থেকে গৃহীত।’ অথচ ইহুদিদের গ্রন্থে আদ-সামুদের কথা নেই।
তিউনিশিয়ার হিশাম বলেন, ‘কুরআন পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থে থেকে রচিত।’
জাবিরী বলেন, ‘হাদিসে নববি হারমুসিয়াহ ও গুনুসিয়াহ থেকে গৃহীত।’
২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত : ইসলামের জন্য বিভিন্ন শাসক ও মনীষীদের রাখা অবদানকে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হিসেবে চিত্রায়িত করা। যেমন : আরব মানস গঠনের লেখক জাবিরী বলেন, ‘আন্দালুসে ইবনু হাযম কর্তৃক জাহেরী মাযহাব গ্রহণ ফাতেমী ও আব্বাসীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন পিছিয়ে থাকা উমাইয়াদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার জন্য করা হয়েছে। এখানে নিছক জ্ঞান চর্চার কোনো দখল ছিল না।’ অথচ সে সময় উমাইয়ারা আভ্যন্তরীণভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে ফাতেমী ও আব্বাসীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেয়ার তো কথাই ওঠে না।
অন্যদিকে নতুন প্রথার আরেক প্রবক্তা হামিদ আবু যায়েদ বলেন, ‘শাফেয়ী রা. তার লেখনী দ্বারা উমাইয়াদের স্বার্থ রক্ষা করতেন।’ অথচ উমাইয়া শাসন শাফেয়ী রাহ.-এর জম্মের আগেই মূলত শেষ হয়।
নব্য ব্যাখ্যাকারদের কর্মপন্থার ফলাফল
রিসালাতের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি, মূলপাঠ তথা কুরআন-সুন্নাহের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং মূলপাঠের ওপর বুদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়াসহ ইসলামি আইনের উৎস ফিকহের প্রতি অসংখ্য মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা হয়েছে।
কথিত নতুন ব্যাখ্যা-মোকাবেলায় রচিত বই
নিজ সন্তানদের দ্বারা উদ্ভট ব্যাখ্যার কবলে থাকা ইসলামের সেবায় এগিয়ে আসেন কিছু মানুষ। লিখেন সেসব মানুষের বিভ্রান্ত চিন্তার কথা। সতর্ক করেন উম্মাহকে। এরমধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইয়ের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলো। ১. ‘আত-তাফসীরুস সিয়াসী লিল কাদায়ার আকীদাহ’, লেখক : ড. সুলতান উমরী। ২. ‘যাহিরুত তা’বীলুল হাদিছিয়য়্যাহ’, লেখক: খালিদ সাইফ। ৩. ‘আল আলমাইয়য়ূন ওয়াল কুরআনুল কারীম’, লেখক: ড. আহমাদ। ৪. ‘আত’তাবীলুল হাদিসী লিততুরাস’, লেখক: ইব্রাহিম সাকরান।
সারকথা
ইসলাম সম্পর্কে অশুদ্ধ তথা নেতিবাচক ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বহু শতাব্দী আগে থেকেই প্রাচ্যতত্ত্বের উপর পশ্চিমা গবেষকরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাচ্যবাদের গর্ভ থেকে এমন এক নতুন অথচ বিকৃত ‘ইসলাম’ ভূমিষ্ঠ হয়েছে যা প্রকৃত ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের পরাজয় তথা সকলের সামনে তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হওয়ার পর এখন নতুন গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নিমিত্তে পরিকল্পিত অবস্থান নিয়েছে। প্রাচ্যবিদ ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত নতুন স্কলাররা ইসলামের মূল উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে চাতুর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
উদ্দেশ্যের অসাধুতা, জানাশোনার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কথা স্বরণ রেখে প্রাচ্যবিদ ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত গোষ্ঠীর নব্য ব্যাখ্যার অধ্যয়ন, পাঠ ও খন্ডন সময়ের নতুন দাবি এনে দিয়েছে।
