মুসান্না মেহবুব :
বাংলাদেশের ইসলামি ঘরানার বিশিষ্ট রাজনীতিক শেখ গোলাম আসগর গতকাল (১৪ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার) না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। আজ শনিবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শেখ গোলাম আসগর খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই মজলিসের রাজনীতির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত। নব্বইয়ের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে অনুষ্ঠিত ইসলামি ঘরানার সবকয়টি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারির কর্মী ছিলেন তিনি। বাবরি মসজিদ অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ ও তসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো।
নব্বইয়ের দশকে ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে ক্রমান্বয়ে সেক্রেটারি ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করার পর খেলাফত মজলিসে যোগ দিয়েছেন। তারপর মৃত্যুর আগ অবধি পর্যায়ক্রমে সংগঠনটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী’র কাছে জানতে চেয়েছিলাম শেখ গোলাম আসগরের কর্মতৎপরতা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, গোলাম আসগর ভাই আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। এতো তাড়াতাড়ি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, ভাবিনি। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর আমরা সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। আমরা একসাথে ছাত্র মজলিসের রাজনীতি করেছি, তারপর খেলাফত মজলিসেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ছিলেন, আমি ছিলাম প্রকাশনা সম্পাদক। তারপর তিনি সভাপতি নির্বাচিত হলে আমাকে সেক্রেটারির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘ এ পথচলার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলে এক-দুকথায় মূল্যায়ন করা খুবই মুশকিল। এতো অমায়িক এবং কর্মতৎপর মানুষ ছিলেন, এমন মানুষ আমরা খুব কমই দেখেছি।
মুনতাসির আলী বলেন, ছাত্র মজলিসের কর্মীদের জন্য তিনি এক প্রেরণার নাম ছিলেন। কর্মীদেরকে এতো অমায়িকভাবে গাইড করতেন, আমরা অবাক হয়ে যেতাম। বাকপ্রতিভা ছিল অতুলনীয়। এতো চমৎকারভাবে বক্তব্য দিতেন, সবাই সম্মোহিত হয়ে যেতো। একইসঙ্গে ছিলেন তুমুল মেধাবীও।
খেলাফত মজলিসের এ যুগ্ম মহাসচিব আরও বলেন, জুনিয়রদের প্রতি গোলাম আসগর ভাইয়ের যেমন স্নেহ ও ভালোবাসা ছিল, সিনিয়রদের প্রতি তেমন ছিল নিরঙ্কুশ আনুগত্য। ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। নব্বইয়ের দশক থেকে এ যাবৎকাল পর্যন্ত দেশের সবকয়টি ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
একই কথা বলছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, গোলাম আসগর আমাদের জুনিয়র ছিল, ছাত্র মজলিসের রাজনীতির ধারাবাহিকতায় সে খেলাফতে যোগ দিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছে। ইসলামি রাজনীতি ও আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় তৎপরতা সবসময় ছিল, কখনো কখনো তাঁর উৎসাহ ও তৎপরতা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বড় আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে সে হৃদয়ে লালন করত।
ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, গোলাম আসগর যেমন স্বপ্নবান একজন মানুষ ছিল, তেম্নি ছিল সাহসী। ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে যেকোনো ঝুঁকি নিতে সে পরোয়া করত না। মজলিসের যেকোনো সভাসমাবেশের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন বা ঝামেলা সে একাই সামাল দিত। তাঁর বিয়োগে যে শূন্যস্থানের তৈরি হয়েছে, বিশেষত খেলাফত মজলিসে, তা কখনোই পূরণ হবার নয়।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আরও বলেন, মানুষ হিসেবে গোলাম আসগর ছিল অসম্ভব অমায়িক এবং সুন্দর মনের অধিকারী। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কাউকে সে দূরে ঠেলে দিত না, বা সে কারও থেকে দূরে সরে যেত না। ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে নিজের আপনজন বিবেচনা করত। এর পাশাপাশি মানবিকতার গুণটাও তাঁর মধ্যে উত্তমরূপে ছিল। আর্তমানবতার সেবায় সে ছিল নিবেদিতপ্রাণ। বয়সে আমাদের ছোট হওয়া সত্ত্বেও আমাদের আগে হঠাৎ করেই তাঁকে চলে যেতে হলো। তাঁর এই বিয়োগব্যথা সহ্য করার মতো না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সবর করার তৌফিক দান করুন এবং তাকে জান্নাতে সম্মানিত স্থানে আসীন করুন, এই দোআ করি।
