ভাষা ও উপনিবেশ : মালেক বেন নবীর দৃষ্টিকোণ

ইফতেখার জামিল :

মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা উপনিবেশে জীবনের প্রায় প্রত্যেক শাখাই আক্রান্ত ও প্রভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে ভাষার কথা উল্লেখযোগ্য। ভাষা মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। দৈনন্দিন চিন্তা, চর্চা ও লিপ্ততায় ভাষা ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভাষায় উপনিবেশের বিশেষ প্রভাব বিস্তারিত হয়; ভাষার মধ্যে উপনিবেশ-নির্ধারিত অর্থ, বর্গ, মর্ম ও মানসিকতা সংযুক্ত হয়। যার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় ‘উপনিবেশ-মোহ’ ও ‘উপযুক্ততা’। ফলে উপনিবেশের সাথে ভাষার সম্পর্কের বিচার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বে যে কয়জন তাত্ত্বিক এই কাজটি করেছেন, তাদের মধ্যে মালেক বেন নবী অন্যতম। আমরা এই লেখায় তার দোহাইয়ে ভাষা ও উপনিবেশের সম্পর্ক যাচাইয়ের চেষ্টা করবো।

বাংলা ভাষা : রাজনৈতিক সক্ষমতার অনুপাত

প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ বাঙলা ভাষায় কথা বলেন। বাঙলা পৃথিবীর ষষ্ঠ-সপ্তম বৃহত্তর ভাষা, এখানে ব্যাখ্যাগত কিছু ভিন্নতা আছে, সে হিসেবে অবস্থান বর্ণনায় একেক রকম বক্তব্য আছে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষাভাষীদের অধিকাংশই মাতৃভাষী, দ্বিতীয় ভাষাভাষী নয় ; মাতৃভাষীর বিচারে চায়নিজ, ইংরেজি ও স্পেনিশের পরেই বাংলার অবস্থান। এর মধ্যে বাংলার চেয়ে মাতৃভাষীর বিচারে ইংরেজি মাত্র সাত-আট কোটি ও স্পেনিশ তেরো-চৌদ্দ কোটি বেশী। জনমিতির বিচারে এই সংখ্যা খুব বেশী নয়। তবে প্রধান প্রধান ভাষার মধ্যে দ্বিতীয় ভাষাভাষীর সংখ্যায় বাংলা সবার পেছনে। অর্থাৎ প্রধান প্রধান ভাষিক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে কম।

উল্লেখিত অনুপাতের (মাতৃভাষী বনাম দ্বিতীয় ভাষাভাষী) সাথে বাংলা অঞ্চলে সংঘটিত দুই বৃহত্তর দুর্ভিক্ষের সংখ্যা সংযুক্ত করলে বুঝা যাবে, বাংলা ও বাঙালীরা পৃথিবীর বৃহত্তর সভ্যতার মধ্যে অন্যতম। মাতৃভাষীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা মুসলিম বিশ্বের প্রথম ভাষা। তবে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা খুব বেশী সুবিধা পায়নি। বাংলা ভাষায় ধর্মচর্চার ইতিহাস খুব বেশীদিনের নয়, ফলে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণে কেউ বাংলা শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠেনি। আবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবেও বাঙালীদের প্রভাব বিশ্বের প্রধান ভাষাভাষীদের মতো বিস্তারিত হয়নি, তাতে কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষা শিখতে চায়নি।

পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবেও বাংলাভাষাভাষীদের অনেকভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আরাকান, আসাম, বিহার ও ত্রিপুরায় বাংলা অন্যতম প্রধান ভাষা, এসব অঞ্চলে একসময় বাঙ্গালীদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া কোথাও বাংলা প্রধান ও কেন্দ্রীয় ভাষা নয়। এসব কারণে বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ভাষা হওয়া সত্ত্বেও খুব বেশী প্রভাবশালী ভাষা নয়। এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী উপনিবেশ। উপনিবেশের অভিশাপে বাংলা ভাষা রাজনৈতিক অনুপাতে প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। এখানে থেকেই ভাষার সাথে উপনিবেশের সম্পর্ক বিচারের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এই কাজে আমরা বেন নবীর সাহায্য নিবো।

মালেক বেন নবীর পরিচয় ও প্রকল্প

মালেক বেন নবী আলজেরিয়ান মুসলিম লেখক ও চিন্তাবিদ। ১৯০৫ সালে কন্সটেইন্টাইনে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আলজেরিয়ায় পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণ করেন ফ্রান্সে। পড়াশোনা শেষে মিসরে বেশকিছুদিন কাটান, যে সময়ে আব্দুস সবুর শাহিন ও মাহমুদ শাকেরের সাথে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফ্রেঞ্চ মিডিয়ামে পড়াশোনার কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি আরবি বক্তব্য ও লেখালেখিতে অভ্যস্ত ছিলেন না। তার নিজের জীবনে উপনিবেশ বিশেষ দাগ কেটেছিল। মালেক বেন নবী জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশে মুসলিম সভ্যতার পতনের বুঝাবুঝি ও ব্যাখ্যায় কাটিয়েছেন।

মুসলিম সভ্যতার পতনের প্রেক্ষিতে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা প্রধানত ধর্মীয় ব্যাখ্যা পেশ করেন, মালেক বেন নবী এর পাশাপাশি মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের আলোকে বুঝাবুঝির চেষ্টা করেছেন। তিনি মুসলমানদের সভ্যতাগত পতনের কারণ, এর প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের নানাদিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টাই শুধু করেননি, বরং একে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প ও প্রসঙ্গ বানানোর চেষ্টা করেছেন। তাকে ইবনে খালদুনের উত্তরসূরি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। সে হিসেবে তার বয়ানে উপনিবেশ ও ভাষার সম্পর্ক বিচারের প্রশ্ন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

উপনিবেশ ও উপনিবেশের উপযুক্ততা

উপনিবেশের মানে শুধু ভূমিদখল নয়, ভূমিদখলের ব্যাখ্যায় শুধু উপনিবেশের চূড়া দেখা যায়, এর ভিত্তি ও বিকাশের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ধরা যায় না। মালেক বেন নবীর ব্যাখ্যাকার আব্দুস সবুর শাহিন বলেন, বেন নবীর লেখাজোখা পড়লে বুঝা যাবে সমাজ জীবনে নানাভাবে উপনিবেশের প্রকাশ ঘটতে পারে। তার মতে যেসব চর্চা ও কর্মকাণ্ড নিজেদের আদর্শ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে, তাকেই উপনিবেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হবে। সে হিসেবে বেন নবীর মতে কমিউনিজম ও লিবারেলিজমও উপনিবেশের অংশ ও ধারাবাহিকতা।

উদারতা ও সামাজিক সাম্যের চেষ্টা প্রত্যেক সমাজের চর্চার ধারাবাহিকতা হলেও তার সাথে আমদানিকৃত কমিউনিজম ও লিবারেলিজমের পার্থক্য অনেক। যেসব দেশ মুসলমানদের মাধ্যমে বিজিত হয়েছে, সেসব দেশে ইসলাম ও মুসলমানি সংস্কৃতি ধর্মগ্রহণের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাধ্যতায় ইসলাম চর্চিত হয়নি। এ কারণেই যেসব দেশে ইসলাম প্রবেশ করেছে, সেসব দেশ থেকে ইসলাম বিতাড়িত হয়নি। বরং আত্মীকরণের বিশেষ প্রক্রিয়ায় ইসলাম চর্চিত হওয়ায় ইসলাম সেসব ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্বতার অংশ হয়ে গিয়েছে।

উপনিবেশের এই বিশেষ ব্যাখ্যার পাশাপাশি বেন নবী উপনিবেশের উপযুক্ততার পরিভাষা যোগ করেন। যার অর্থ হচ্ছে, উপনিবেশী শক্তি বহির্গত বিশেষ প্রক্রিয়ায় উপনিবেশিতদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক অভ্যস্ততা ও মুগ্ধতা তৈরি করে। যাতে উপনিবেশী সংস্কৃতি ও চর্চাকে সে তার নিজের অংশ হিসেবে দেখে, নিজের সম্ভ্রান্ততা ও উচ্চশ্রেণী পরিচয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে। একেই বেন নবী বলেছেন, উপনিবেশের উপযুক্ততা। এই পর্যায়ে এসে উপনিবেশিতরা চতুষ্পদ জন্তুর মতো হয়ে যায়। সে অন্ধ অনুসরণ করলেও নিজেকে সে স্বাধীন হিসেবে দেখতে থাকে।

জোরপূর্বকতা ও উপযুক্ততা, এই দুই পরিভাষায় বেন নবী উপনিবেশের সাথে ভাষার সম্পর্ক বিচারের চেষ্টা করেন। এর গুরুত্ব অনেক। কেননা ভাষাই সমাজে চিন্তার ধারণ ও বহন করে এবং প্রকাশ ও বিকাশ ঘটায়। এভাবে ভাষাই উপনিবেশের বৈশিষ্ট্য, প্রভাব ও প্রকৃতি বুঝতে বিশেষ সাহায্য করতে পারে।

ভাষা ও উপনিবেশ : সম্পর্কের তিন রকম

বেন নবী দেখিয়েছেন, মোটাদাগে তিনভাবে উপনিবেশ উপনিবেশিত ভাষাকে পরিবর্তন করে থাকে। উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে ভাষার অর্থ, বর্গ, মর্ম ও মানসিকতার পরিবর্তন, উপনিবেশিত ভাষার স্থানে উপনিবেশী ভাষা প্রতিস্থাপন বা উপনিবেশিত ভাষায় অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন।

উপনিবেশ সবভাষায় একরকমভাবে প্রভাব বিস্তার করে না। একদিকে উপনিবেশ কবলিত মিসরে আমরা দেখি, ইংরেজরা শিক্ষাক্রমে ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে। সব বিষয় ইংরেজিতে পড়ানোর চেষ্টা করে। প্রতিবাদ হলে আরবি ভাষায় পড়াতে রাজি হলেও ব্রিটিশ শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবার শর্ত আরোপ করে। এভাবে প্রথমে মাতৃভাষা আরবিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাষায় রুপান্তর করার চেষ্টা করে, পরবর্তীতে আরবিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় রাজি হলেও ভাষার অর্থ, বর্গ, মর্ম ও মানসিকতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখে।

অন্যদিকে আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চ শুধু শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং অফিস-আদালত-জনসাধারণের মধ্যেও ফ্রেঞ্চের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ফলে আরবি ভাষাভাষীরা সমাজে অপ্রাসঙ্গিক ও অকার্যকর হয়ে উঠেন। ফ্রান্সের বাইরে আলজেরিয়ায় সবচেয়ে বেশী ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী বাস করেন। সিআইয়ের মতে ফ্রেঞ্চ আলজেরিয়ান লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। আলজেরিয়ান প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ ফ্রেঞ্চে বলতে ও লেখতে পারেন। এর মধ্যে দেড় লাখ মানুষের জন্য ফেঞ্চ মাতৃভাষা। আরবিকে প্রধান ভাষা করার অব্যাহত চেষ্টা সত্ত্বেও আলজেরিয়ায় ফ্রেঞ্চের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে।

পাশাপাশি মিসরের কপটিকদের পক্ষ থেকে প্রমিত আরবির বদলে মিসরের আঞ্চলিক আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারিত করার পক্ষে ব্যাপক চেষ্টা চালু ছিল। অর্থাৎ ভাষা আরবি থাকবে ঠিকই, তবে সেটা হবে মিসরের নিজস্ব আঞ্চলিক আরবি। যার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিখ্যাত সাহিত্যিক সালামাত মুসার নাম উল্লেখ করা যায়। ঠিক একই কাজ বাংলার ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। বাংলা প্রধান ভাষা হিসেবে চর্চিত থাকলেও ব্যাপকভাবে বাংলার সংস্কৃতকরণ করা হয়েছে। বাংলাকে জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষার বদলে সংস্কৃত কেন্দ্রিক হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাষায় রুপান্তরিত করা হয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ছিল হিন্দুস্থানি ভাষা বা ফার্সি-উর্দু মিশ্রিত ভাষা। উপনিবেশ হিন্দুদের জন্য বিশেষায়িত হিন্দিভাষা উৎপাদন করে এবং উর্দুর স্থানে প্রতিস্থাপিত করে । তবে তার শব্দ ও বাক্যবৈশিষ্ট্যে খুব বেশী পরিবর্তন করতে পারেনি। অন্যদিকে বাংলাকে হিন্দুস্থানি ভাষার থেকে দূরে সরিয়ে সংস্কৃত কেন্দ্রিক ভাষায় রুপান্তরিত করেছে। এই রুপান্তরিত ভাষায় বাংলা অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা, সাহিত্য, অফিস ও আদালত পরিচালিত হয়েছে। এভাবে ভাবলে দেখা যাবে, বাংলা ভাষায় উপনিবেশ মালেক বেন নবী কথিত তিন প্রকল্পই বাস্তবায়ন করেছে। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

ভাষায় উপনিবেশ : শব্দের অর্থ ও ব্যবহারে পরিবর্তন

উপনিবেশের প্রভাবে নতুন নতুন শব্দ ও অর্থের সৃষ্টি হয়। প্রচলিত শব্দের অর্থে বিকৃতি ও বিবর্তন ঘটে। বেন নবী এর দৃষ্টান্ত হিসেবে সৈন্য ও কর্নেল শব্দের ব্যবহার দেখিয়েছেন। উপনিবেশের আগে মুসলিম দেশগুলোতে সৈন্যের স্থানে মুজাহিদ ব্যবহার হত এবং কর্নেলের স্থানে শায়েখ শব্দ ব্যবহার হত। যুদ্ধের স্থানে ব্যবহার হত জিহাদ। এভাবে উপনিবেশের প্রভাবে ভাষা তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মর্ম হারিয়ে ফেলে। ভাষিক দ্বৈততায় সামাজিকভাবে বিভক্তি ও দ্বৈত কাঠামোর জন্ম হয়।

আমরা তলিয়ে দেখলেই বুঝবো, জিহাদ ও মুজাহিদ শব্দের সাথে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবেগ ও ইতিহাস জড়িত। কোরআন ও হাদিস থেকে উদ্ভূত শব্দদু’টি বিশেষ মূল্যবোধ বহন করে ও দায়িত্বের নির্দেশ করে। অন্যদিকে শায়েখ শব্দটির সাথে আছে তাসাউফের ঘরানা ও ইলমি চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস। সৈনিকরা শায়েখকে শুধু নেতা হিসেবেই নয়, বরং মুরুব্বি ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতেন। উপনিবেশের প্রভাবে এভাবে ভাষার দার্শনিক, ধর্মীয় ও পরলৌকিক ভিত্তি বাতিল হয়ে যায়।

বাংলায় দৃষ্টান্ত দিলে ধর্ম ও আধ্যাত্মিক শব্দদু’টির প্রসঙ্গ আনা যায়। যদিও ধর্ম ও আধ্যাত্মিক শব্দদু’টি বাঙালী মুসলিমদের চর্চায় বহুলভাবে ব্যবহারিত, তবে এই শব্দ দু’টি প্রধানত ইংরেজি রিলিজিউন ও স্পিরিচুয়ালিটির মর্ম প্রদান করে, অথচ রিলিজিউন ও স্পিরিচুয়ালিটি আর মুসলিম দ্বীন ও ইহসান-তাসাউফের মর্ম এক নয়। তবু উপনিবেশের প্রভাবে বাংলা ভাষার ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা শব্দদু’টি দ্বীন ও ইহসান-তাসাউফের প্রতিশব্দ না হয়ে রিলিজিউন ও স্পিরিচুয়ালিটির প্রতিশব্দে রুপান্তরিত হয়েছে। আদতে চিন্তার কোন ভাষা নেই। ভাষা বরং প্রভাবশালী চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। এভাবে উপনিবেশ উপনিবেশিত ভাষায় তার চিন্তার বিস্তার ঘটায়। শব্দ ঠিক থাকে, মর্ম চুরি হয়ে যায়।

ভাষাদ্বৈততা ও উপনিবেশের মোকাবেলা

এভাবে উপনিবেশের প্রভাবে ভাষার মধ্যে, বেন নবীর মতে, ভাষিকদ্বৈততার সৃষ্টি হয়। এক জাতি ও দেশের মধ্যে দুই রকম ভাষার উৎপত্তি ঘটায়। যা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনহীন বিভক্তির তৈরি করে। যেহেতু একেক জনের ভাষার মর্ম ও গঠন একেক রকম, তাই পারস্পরিক বোঝাপড়া দুরূহ হয়ে উঠে। বাংলা ভাষার দিকে তাকালেও এই বিভক্তি টের পাওয়া যায়। এখন উচ্চবিত্তের প্রধান ভাষা ইংরেজি আর মধ্যবিত্তের পরিসরে আমরা আজকাল সংস্কৃতপ্রবণ ও কলকাতায় জমে উঠা ভাষাকে শুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেই। যার সাথে মুখের ও ধর্মীয় পরিসরের ভাষার দূরত্ব অনেক। দূরত্ব তাই বোঝাপড়াতেও। রাষ্ট্রীয় অফিস ও আদালতেও এই বিভক্তি বিদ্যমান।

কেউ বলতে পারেন, ভাষায় বিদেশি কাঁচামালের সংযুক্তি তো খারাপ নয়, তবে বেন নবী বলেন, বিদেশি ভাষা ও উপনিবেশী ভাষার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিদেশি ভাষা আপনি নিজস্ব প্রয়োজনে অন্তর্গত প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করেন। উপনিবেশী ভাষা ক্ষমতার জোরে নিজেকে জরুরী করে তুলে, উপনিবেশী ভাষা আরোপিত। এই আরোপের প্রক্রিয়ায় ভাষা দ্বৈততা সৃষ্টি হয়। ভাষার মধ্যে অন্তর্গত ও বহির্গত কাঠামো ও প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক ও ঐতিহাসিক সিলসিলা বাঁধাগ্রস্থ হয়। নতুন শব্দ, অর্থ ও পরিভাষার জন্ম হয়।

এর মোকাবেলায় বেন নবী পশ্চিমা ভাষার অনুবাদ ও পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তার মতে অনুবাদ ও ভাষিক দ্বৈততা এক নয়। অনুবাদ ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে পশ্চিমা চিন্তা ও প্রকল্পের যথাযথ ভাষিক প্রতিনিধিত্ব সম্ভব। এভাবে আমরা পশ্চিমা শব্দের যথাযথ অনুবাদ করতে পারবো। ভাষিক দ্বৈততা ও মর্ম প্রতিস্থাপনের বিপদ থেকে শুধু রক্ষাই পাবো না, বরং পশ্চিমা চিন্তার পর্যালোচনা ও মোকাবেলা করতে পারবো।

আগের সংবাদভাষা আন্দোলনের খণ্ডচিত্র : ইসলামপন্থীদের ভূমিকা
পরবর্তি সংবাদবাংলাদেশী বাংলা : আবুল মনসুরের সাংস্কৃতিক প্রকল্প