শহীদ মিনারে নামাজ ও কোরআন পাঠ : আলেমরা কীভাবে দেখেন?

মুসান্না মেহবুব:

গতকাল একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথারীতি নানা আয়োজন ও উদযাপনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নানা কিসিমের কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে বায়ান্নর ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে। এরমধ্যে দেশের উল্লেখযোগ্য একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। এবারের ভাষা দিবসে তারা কুরআন খতম, বর্ণমালা মিছিল, শহীদ পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ, কবর জিয়ারত ও দোআ মাহফিলের আয়োজন করেছে।

বিষয়টা অনেকের কাছে প্রশংসনীয় হলেও ধর্মীয় অঙ্গনের বড় একটি অংশ প্রভাতফেরীতে শহীদ মিনারের সামনে বসে কুরআন তেলাওয়াতের সমালোচনা করছেন। প্রভাতফেরীতে খতমে কুরআন অনুষ্ঠানের ছবি অনলাইনে ভাইরাল হলে সমালোচকরা বলছেন, এটা একধরনের হীনমন্যতা। ইসলামি চেতনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে প্রশংসাকারীরা বলছেন এর বিপরীতটা। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন দিবসে শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ নানাবিধ কর্মসূচি আদতে শহিদদের কোনো কাজে আসে না। কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাদের স্মরণ করলে কবরে সে তেলাওয়াতের সওয়াব তারা পাবেন। এ জন্য এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।

প্রভাতফেরীতে কুরআন তেলাওয়াতের ওই ছবির পাশাপাশি আরেকটি ছবিও গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিটিতে দেখা যায়, একই সংগঠনের কিছু কর্মী শহিদ মিনারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন। এই ছবিটি নিয়েও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে গতকাল থেকে।

শহীদ মিনারে এভাবে কুরআন তেলাওয়াত এবং নামাজ আদায়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কী জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম দেশের বিশিষ্ট দুজন আলেমের সঙ্গে। তাঁরা ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলছেন, শহীদ মিনারে কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কোনো দিবস উদযাপন ইসলামি চেতনার সঙ্গে মানানসই নয়। বরং ইসলামপরিপন্থী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবার কারণে আপত্তিজনক। একইভাবে শহিদ মিনারের বেদিতে ঘটা করে জামাতের সাথে নামাজ আদায়ও ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তির দাবি রাখে।

রাজধানীর শায়খ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদ এ ব্যাপারে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, মূলগতভাবে যেকোনো জায়গায় (জায়গাটি পবিত্র হবার শর্তে) কুরআন তেলাওয়াত এবং নামাজ আদায় করা জায়েজ। কিন্তু কোনো দিবস উদযাপন করতে শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের বদলে কুরআন তেলাওয়াত—এটা অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি। ইসলামি চেতনার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই।

দেশের শীর্ষস্থানীয় এ মুফতি বলেন, শহিদ বা মৃতব্যক্তির জন্য তাদের কবর জিয়ারতে গিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করে সওয়াব রেসানি করা যায়, অথবা ঘরে বসেও করা যায়। এটা ইসলাম সমর্থিত। কিন্তু শহিদ মিনারে গিয়ে, যেখানে শহিদদের কোনো কবর নেই, সম্মান ও স্মরণের জন্য এম্নিতেই একটি স্তম্ব বানিয়ে রাখা হয়েছে, ইসলামের সঙ্গে যার কোনো সাযুজ্য নেই, সেখানে গিয়ে আয়োজন করে শহিদদের স্মরণে কুরআন তেলাওয়াত, এটা ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে আমার কাছে। কারণ, শহিদ মিনারে গিয়ে শহিদদের স্মরণ করার রেওয়াজ বিধর্মীদের কাছ থেকে এসেছে। আর বিধর্মীদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ করা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী আপত্তিজনক।

মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ আরও বলেন, শহিদ মিনারে ঘটা করে নামাজ আদায়ের ব্যাপারেও একই কথা। এটা বাড়াবাড়ি। শহিদদের স্মরণের জন্য আলাদা স্তম্ব বা জায়গা নির্দিষ্ট করার রেওয়াজ ইসলামে নেই। একই সঙ্গে সেই নির্দিষ্ট জায়গাকে নামাজ-কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামিকিকরণেরও কোনো জরুরত নাই।

মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদের এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করছেন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও আলেম ব্যক্তিত্ব, ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনও। তিনি বলেন, আসলে জাতীয়তাবাদের যে চর্চা বিশ্বব্যাপী ব্যাপৃত হয়ে আছে, সেটারই প্রভাব এ ধরনের কাজ। আমি মনে করি, আয়োজকরা ভালো নিয়তেই এটা করেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার দেশগুলোতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও মোটামুটি এ রকম।

তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে দেশপ্রেমের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশপ্রেমের প্রতি ইসলামও উদ্বুদ্ধ করে। এ দিক বিবেচনায় হয়তো ওই সংগঠনটি এমন কর্মসূচি পালন করেছে। তবে আমি মনে করি, কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে তাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত, যাতে কোনো কর্মসূচিতে ইসলামি চেতনার পরিপন্থী কোনো কাজের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে।

আগের সংবাদকরোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা চীনে কমছে, বাড়ছে বাইরের দেশে
পরবর্তি সংবাদনিখোঁজের দেড় বছর পর বাসায় ফিরলেন চাকরিচ্যুত লে. কর্নেল