
ফাতেহ ডেস্ক
ভারতের দিল্লিতে গত চারদিন ধরে সংখ্যালঘু মুসলমান ও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধীদের সঙ্গে বিজেপি-আরএসএস-পুলিশের নজিরবিহীন সংঘাতের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এনডিটিভি, রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের দিন রোববার সংঘাত শুরুর পর থেকে তিন দিনে এই ২৩ জন নিহত হন। সিএএ নিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
মৃত্যুমিছিল আটকানো যাচ্ছে না রাজধানী দিল্লিতে। বুধবার সকালে আরো ৫ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে। তাতে চার দিনের মাথায় সেখানে মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়ালো ২৩ জনে। আহতের সংখ্যাও তিনশতাধিক।
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত দিল্লিতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৩। এ দিন সকালে গুরুতর আহত অবস্থায় আরো চার জনকে গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে, তাদের মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। পরে হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় আরো একজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের এমডি সুনীলকুমার গৌতম। বেলা বাড়লে আরো দু’জনের মৃত্যু হয়।দুপুরে চাঁদ বাগ থেকে এক গোয়েন্দা অফিসারের দেহ উদ্ধার হয়।
এনডিটিভি ও আনন্দবাজার জানিয়েছে, এই সংঘাতে আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ, হতাহতদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই রয়েছেন। আহত তিনশোর মধ্যে ৭০ জনই গুলিবিদ্ধ।
বুধবার ভোর সাড়ে ৪টা থেকে নতুন করে পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয় উত্তর-পূর্বের ব্রহ্মপুরী-মুস্তাফাবাদ এলাকায়। গোকুলপুরীতে একটি পুরনো জিনিসপত্রের দোকানেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। দমকলের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, বুধবার সকালে নগরীর চান্দবাগ এলাকায় সিএএ-র সমর্থক ও বিরোধীদের পরস্পরের দিকে পাথর নিক্ষেপের মধ্যেই আএএফ, সিআরপিএফ ও দিল্লি পুলিশের বহু সদস্য সেখানে অবস্থান নিয়েছে। সকালে দাঙ্গা কবলিত অন্যান্য এলাকায়ও পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী অবস্থান নিয়েছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।
নগরীর দাঙ্গাকবলিত উত্তরপূর্বাঞ্চলে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। কোথাও কোথাও অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে। বুধবার সকালে এই এলাকাগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছিল বলে প্রত্যক্ষদশী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
সকালে এক টুইটে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল পরিস্থিতিকে ‘ভয়ানক’ বলে বর্ণনা করে দাঙ্গা কবলিত এলাকাগুলোতে আশু সেনাবাহিনী মোতায়েন ও কারফিউ জারি করার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছেন।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার মধ্যরাতে উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনে যান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে মঙ্গলবার রাতেই তৃতীয়বার দিল্লি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অমিত শাহ। তার পরেই রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে প্রথমে সীলামপুরে যান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। পরে জাফরাবাদ, মৌজপুর-সহ উত্তর-পূর্ব দিল্লির একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত যান তিনি। মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটিকে (সিসিএস) এ নিয়ে সবিস্তার রিপোর্ট দেবেন তিনি।
দফায় দফায় সংঘর্ষে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল দিল্লির মুসলমান অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল। বিবিসি বলছে, দিল্লিতে এমন সহিংসতা গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবার কয়েকটি এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। বিভিন্ন স্থানে মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে, উত্তেজনা যেন না ছড়ায়, সেজন্য বেসরকারি টেলিভিশনগুলোকে সংঘাতের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে সাবধান করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এ ঘটনার মধ্যে মঙ্গলবার মধ্যরাতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবনের বাইরে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্র। রাজধানীতে সহিংসতা রুখতে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানান তারা।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন এবং জামিয়া কো-অর্ডিনেশন কমিটির তরফে মঙ্গলবার কেজরিওয়ালের বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়। তাতে সাড়া দিয়ে গভীর রাতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন মুখ্যমন্ত্রীবাসভবনের কাছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন তারা। দাবি ওঠে, উত্তর-পূর্ব দিল্লির যে যে এলাকায় হিংসা ছড়িয়েছে, অবিলম্বে সেখানে যেতে হবে কেজরিওয়ালকে। স্থানীয় বিধায়কদের শান্তি মিছিল বার করতে নির্দেশ দিতে হবে, যাতে যে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে রাশ টানা যায়।
যে বা যাদের ইন্ধনে রাজধানীতে হিংসার আগুন ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে হবে বলেও দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা। হিংসায় আক্রান্তরা সঠিক চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তারা। উদ্ধারকার্য চালাতে তাই সরকারকে পদক্ষেপ করার আর্জিও জানানো হয়। শান্তি ফেরাতে কী কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা-ও সাধারণ মানুষকে জানানোর দাবি ওঠে।
হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) পাস করার পর থেকে ভারতের মুসলমানরা ক্ষোভে ফুঁসছে। এই আইন বাতিলের দাবিতে নানা কর্মসূচিও চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি আইনের পক্ষে কর্মসূচি নিয়ে নামলে দেখা দেয় এ সংঘাত। রোববার সংঘাত শুরুর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম ভারত সফর শুরু করেন। সেদিনই নিহত হন এক পুলিশ কনস্টেবলসহ চারজন।
মৌজপুর, ব্রহ্মপুরী, ভজনপুরা চক, গোকুলপুরীসহ বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার নতুন করে ব্যাপক সংঘাত বাঁধে বলে জানায় ভারতের সংবাদ। মৌজপুরে এক সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়ার খবরও এসেছে। এক সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো একজন। মৌজপুরে একাধিক গাড়ি ও দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। মসজিদে মসজিদে হামলার ঘটনাও ঘটে। অনেক মসজিদের মিনারে উড়ানো হয় গেরুয়া নিশান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দিল্লির অশোকনগর এলাকায় আরো একটি মসজিদে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সংখ্যালঘু মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা আর লুটপাটের চলছে অব্যাহতভাবে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিএএবিরোধী ও সমর্থকদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ভজনপুরা চক। জ্বালিয়ে দেয়া হয় বহু দোকান। ভজনপুরা, চাঁদবাগ ও কারাওয়ালনগরের রাস্তায় লাঠি ও রড হাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে বিজেপি-আরএসএসের সমর্থকরা।
একই পরিস্থিতি দেখা গেছে কারবাল নগরে। ভোররাতে সেখানে একটি টায়ার কারখানায় বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরানো হয় বেশ কিছু গাড়িতেও। পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ায় সেখানে পৌঁছায়নি অগ্নিনির্বাপক বাহিনী।
এনডিটিভি জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশন থেকে সিএএবিরোধীদের হটিয়ে মৌজপুরের দিকে এগোচ্ছিল পুলিশ। মৌজপুরের বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের নেতৃত্বে সিএএর পক্ষে কর্মসূচি চলছিল। এই বিজেপি নেতা নানা সময়ে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেয়ার জন্য সমালোচিত।
বিবিসির সাংবাদিক বলেছেন, উত্তর-পূরআব দিল্লিতে পাথর হাতে দল বেঁধে থাকা সিএএ সমর্থক একদল স্লোগান দিচ্ছিল- ‘দালালদের গুলি কর’।
সোমবারের পর কেন্দ্রীয় সরকার ও পুলিশ সহিংসতা দমনে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল, দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ট্রাম্প এ মুহূর্তে রাজধানীতে আছেন বলে যত শিগগিরই সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ দিয়েছেন অমিত শাহ, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
সার্বিকপরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে দিল্লি পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
-এ
