ইসলামি মহলে ধর্মনিরপেক্ষতার সুলুক সন্ধানে

রাকিবুল হাসান :

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দির শুরুতে ইসলামি দল এবং আন্দোলনে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এই প্রভাব খাটানো খুব সহজেই সম্ভব হয়নি; বরং এর পেছনে দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে তৎপর ছিল। কারণ, পশ্চিমা শক্তির উত্থানের পর, ইসলামি আন্দোলনগুলোই ছিলো মুসলিম উম্মাহর একমাত্র আশ্রয়-দুর্গ। তাদের ইমান-আমল, বিশ্বাস-দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষার শক্ত কবজ। সুতরাং এই দুর্গে যদি বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেয়া যায়, এই কবজের শক্তি যদি কেড়ে নেয়া যায়, তাহলেই বাজিমাত।

ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা সেকুলারাইজেশন দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার পর, ইসলামি আন্দোলনগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। ইসলামি দলগুলো এখন বিভিন্ন দিকে ছুটছে। চিন্তানৈতিকভাবে কেউ আদি মানহাজে অটুট, কেউ আদি মানহাজ থেকে সরে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে কেউ গণতন্ত্রকে গ্রহণ করেছে পুরোপুরি, কেউ আংশিক, আবার কেউ এখনো গ্রহণ করেনি। সামাজিকভাবে কেউ গণমানুষের সঙ্গে একদম মিশে গেছে। এই মিশে যাওয়াকে ধর্মীয় বৈধতা দিতে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে কুরআন-হাদিস। দ্বীন কয়েমের চেয়ে প্রাধান্য দিচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিপত্তি। সবচে ভয়ের কথা— কৌশল ও হেকমতের দোহাই দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে আদতে তারা যে আপোস করেছে, এই বিষয়টুকু অনেকেরই বোধগম্য নয়। রোগের অনুভূতিই যার নেই, সে কিভাবে চাইবে দাওয়াই?

এই লেখায় ইসলামি দল ও আন্দোলনে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবেশের একটি সুলুক সন্ধান তুলে ধরা হবে।

ধর্মনিরপেক্ষায়নের প্রক্রিয়া

চারটি ধাপে মূলত ইসলামি দলগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষায়ন ও সেকুলারাইজেশনের প্রসার ঘটে। এই চারটি ধাপ একের পর এক সম্পন্ন হয়।

১. প্রথমত রাজনৈতিকভাবে দমন-পীড়নের শিকার হয় ইসলামি দলগুলো। কারণ, মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমাদের সমর্থন এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটে সেকুলার দলগুলো রাজনৈতিকভাবে সুযোগ-সুবিধা পায় বেশি। ফলে ইসলামি দলগুলো রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গেলেই সেকুলারদের দমন-পীড়নের সম্মুখীন হয়। কখনো সেই দমন-পীড়ন নির্মমতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। যেমন প্রায়শই মিশর, বাংলাদেশ, আলজেরিয়ায় এই দৃশ্য দেখা যায়।

২. সেকুলারদের দমন-পীড়নের শিকার হয়ে ইসলামি দলগুলো সরাসরি বিরোধিতায় না গিয়ে একটু অন্যভাবে বেঁচে থাকতে চায়। তারা তাদের শক্তি এবং সেকুলারদের শক্তি মাপতে শুরু করে। ফলে সেকুলারদের সঙ্গে তাদের আপসরফা এবং বোঝাপড়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। ইসলামি দলগুলো সেকুলারদের সঙ্গে এই আপসের বৈধতা খুঁজে বের করে ইসলাম থেকেই। ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ওসিলা, রুখসত এবং ছাড় বের করে বৈধতা দিতে চেষ্টা করে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে আপোসকে।

৩. ইসলামি দলগুলোর কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিপালক গণতন্ত্রকে। তারা বলে, প্রয়োজনের খাতিরে আমরা গণতন্ত্রকে গ্রহণ করেছি। তারপর রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবো। কিন্তু প্রয়োজনের খাতিরে গ্রহণ করতে করতে প্রজন্ম পরম্পরায় এই গণতন্ত্র মানুষের রক্তে মাংসে মিশে যায়। তখন প্রয়োজন শুধুই প্রয়োজন থাকে না, হয়ে ওঠে প্রধান এবং একমাত্র অবলম্বন।

৪. শেষ ধাপে এসে ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বব্যাপী প্লাবনের মতো সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কথায়-বলায়, চিন্তায়-বিশ্বাসে, সাহিত্য-পাঠ্যপুস্তকে, এবং মিডিয়া-প্রচারমাধ্যম—সর্বত্র জয়জয়কার পড়ে যায় ধর্মনিরপেক্ষতার। ইসলামি আন্দোলনের জোয়ার তখন শ্লথ এবং ম্লান হয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে মরক্কোয় ক্ষমতাসীন ইসলামি দল ‘জাস্টিস এন্ড ডেপেলপমেন্ট পার্টি’র কথা বলা যায়। দলটি প্রথমে ‘জামাতে ইসলামি’ নামে নিরেট একটি দাওয়াতি আন্দোলন হিসেবেই পথচলা শুরু করেছিল। ইসলামি অনুশাসন অনুযায়ী চলা, অন্যদের সঙ্গে আপস না করা ইত্যাদি মূলনীতি তার গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর দলটি ইসলাম শব্দ বাদ দিয়ে নতুন একটি নাম ‘হারাকাতুল ইসলাহ ওয়াত তাওহিদ’ গ্রহণ করে। নাম পরিবর্তনের পর তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেয়া এবং তার জন্য অন্যদের সঙ্গে মেশার প্রয়োজন অনুভব করে। এরপর তারা রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসার লক্ষ্যে দল গঠন করে। তখন দলের আগের নাম বদলে নতুন নাম হয় ‘জাস্টিস এন্ড ডেপেলপমেন্ট পার্টি’। তবে পাশাপাশি দ্বীনি বিষয় গুরুত্ব দেয়ার জন্য ইসলাহ ওয়াত তাওহিদ দলটিও থাকে। সর্বশেষ দলটি ধর্মনিরপেক্ষতার যাবতীয় মূলনীতি মেনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

ধর্মনিরপেক্ষায়নের নেপথ্যে

ইসলামি দল কিংবা মুসলিম সমাজে ধর্মনিরপেক্ষায়ন প্রক্রিয়ার পেছনে অনেক কারণ বিদ্যমান। ধর্মনিরপেক্ষায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি কারণের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। মোটাদাগে কয়েকটি কারণ এমন—

১. বাহ্যিক কারণ

বর্তমান সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার সয়লাব। চিন্তা-চেতনায় মানুষ এখন দারুণ বস্তুবাদী। এই সমাজ থেকেই কিন্তু ইসলামি দলের কর্মীরা উঠে আসে কিংবা এই সমাজেই তারা বসবাস করে। বস্তুবাদী চিন্তার অন্ধকারাচ্ছন্ন এই সমাজে বাস করে অন্ধকার থেকে বেঁচে থাকাটা দুষ্কর। ফলে ইসলামি দলের কর্মীরা প্রভাবিত হয়ে পড়ে বস্তুবাদী চিন্তায়। তবে অবশ্যই এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সব অন্ধকারের ঊর্ধ্বে উঠে আলোর মশাল জ্বেলে রাখে।

আবদুল ওহহাব মাসিরি বস্তুবাদী চিন্তার উদাহরণ টানতে গিয়ে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একবার আমার স্ত্রী একটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি অমুককে বিয়ে করতে কেন রাজি হয়েছো? মেয়েটি উত্তর দিলো, ছেলের বিএমডাব্লিউ গাড়ি আছে, তাই। এখান থেকেই স্পষ্ট— মেয়েটি ভদ্র-সভ্য; নামাজও পড়ে নিয়মিত। কিন্তু তার চিন্তা-চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আছে বস্তুবাদী চিন্তায়। সে তার হবু স্বামীকে দেখছে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে।’

মানুষ প্রথমে পশ্চিমা সভ্যতার খোঁজ পায়; এরপর তলিয়ে দেখে; তারপর একদম অনুসরণ করতে শুরু করে। তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ উন্নতির কারণে বস্তুবাদী চিন্তার সয়লাব বেড়েই চলছে, বেড়েই চলছে।

২. শরঈ ইলম-স্বল্পতা

ভালো নিয়তের দোহাই দিয়ে খারাপ কাজ করতে গেলে আদতে কেউ বাধা দেয় না। ইসলামি দলগুলোও বাধা দেয়নি। ফলে শরঈ ইলমের স্বল্পতার কারণে আকিদাগত বিভ্রান্তির শিকার হয়ে যায় তারা। শরঈ ইলমের স্বল্পতা—ইসলামি দলের কর্মীদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর এবং আশঙ্কাজনক। ইসলামি দলের কর্মীদের চিন্তানৈতিক অধঃপতন তৈরির পেছনে পশ্চিমা দার্শনিকদেরও বিরাট একটা ভূমিকা আছে। শরঈ ইলম স্বল্পতা নিয়ে তাদের বই পড়তে গিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছে; নিয়ম, হেকমত, কৌশল সব গুলিয়ে ফেলেছে।

৩. অভ্যন্তরীণ কারণ

ইসলামি দলগুলো কেবল বস্তুবাদী চিন্তায় বিধ্বস্ত হয়নি, বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবেও তারা পশ্চিমাদের কাছে নতিস্বীকার করেছে। চারদিকে যখন পশ্চিমা সভ্যতার ছড়াছড়ি, ইসলামি সভ্যতার পতন, তারা মেনে নিয়েছে—এখন পশ্চিমা সভ্যতাই একমাত্র অবলম্বন। এর কোনো বিকল্প নেই; ফলে তারা পশ্চিমা সভ্যতাকে পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। পশ্চিমা পদ্ধতিতেই আপাদমস্তক ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করছে। তারা মানুষকে কাছে টানার জন্য, মানুষের হেদায়াতের জন্য ইসলামের নিত্যনতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। সর্বোপরি তারা তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘ইকামাতে দ্বীন’ তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। তারা এখন ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিক কর্তব্যবোধ, জাতীয় মুক্তি ও ইস্যু নিয়ে কথা বলে, পরিকল্পনা পেশ করে; কিন্তু দ্বীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে না। মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাবার কারণে তারা যেমন হতাশ হচ্ছে, তেমনি আপস-রফাও করতে হচ্ছে সেকুলারদের সাথে।

আখেরি কালাম

ধর্মনিরপেক্ষতার জোয়ারে একেবারে ভেসে যাবার আগে ইসলামি দলগুলোকে এখন থেকেই চৌকান্না হতে হবে। দলের কর্মীদের যেমন সচেতন করতে হবে, তেমনি তাদের শরঈ ইলম বৃদ্ধির ওপরও জোর দিতে হবে। ইসলামি দল ইসলামিই থাকবে; পরিবর্তন করে সংস্কারবাদী দল, সামাজিক দল ইত্যাদি দলে রূপান্তরিত করা যাবে না। পাশাপাশি লিখনির ময়দানেও এগিয়ে আসতে হবে আলেমদের। মানুষকে সচেতন করে লিখতে হবে বই, পত্রিকা, লিফলেট। নিজেদের জায়গা থেকে চেষ্টা করতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সেকুলারিজমের স্রোত আটকে দিতে। নইলে বালুর বাঁধের মতো আমাদের অস্তিত্ব পড়বে হুমকির মুখে।

সূত্র : আল আলমানাতুম মিনাদ দাখিল

আগের সংবাদওমরাহ যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেবে বিমান
পরবর্তি সংবাদকরোনাভাইরাস: প্রাণ গেল ইরানের সাবেক রাষ্ট্রদূতের