কার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের নিয়ে গোপন চুক্তি করেছে জাতিসংঘ?

 ওমর ফারুক: 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) করা চুক্তি গোপন রাখা আপত্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী মুস্তাইন জহির। এ ধরণের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক বলেও তিনি আশঙ্কা  প্রকাশ করেছেন।  ‘জাতিসংঘ এ চুক্তি গোপনের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের স্বার্থ রক্ষা করছে, পাশাপাশি  রোহিঙ্গাদের  গণহত্যার বিষয়ে তাদের মতামতকেই প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছে।’ মুস্তাইন জহির বলেন।

‘মিয়ানমার সরকারের কাছে জাতিসংঘ নতি স্বীকার করে এ চুক্তি গোপন রেখেছে। যদি এ চুক্তি গোপনই রাখা হয় তাহলে যাদের নিয়ে চুক্তি তারা কী করে জানবে এ চুক্তিতে কী আছে? এবং সে চুক্তির অধীনে তারা কীভাবে সেখানে ফেরত যাবে?’

এর আগে চলতি সপ্তাহে এ চুক্তি প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথ্যমতে উল্লিখিত সমঝোতা স্মারক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে চলাচল ও “মিয়ানমারের স্বাধীন নাগরিক” হিসেবে তাদের অধিকার লাভের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এ ধরনের চুক্তি বাস্তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে পদদলিত করে তাদের চিরতরে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই গোপন সমঝোতার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করায় প্রত্যাবাসনসহ সার্বিকভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নির্যাতন বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিষয়টি মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং লির সাম্প্রতিক বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।’

একই সুরে জাতিসংঘের ভূমিকার সমালোচনা করে কথা বলেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার হিউম্যান রাইটস রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের পরিচালক জন প্যাকার। প্রথম আলো পত্রিকার মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা চার দশক ধরে পরিকল্পনামাফিক হত্যা, নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিধিব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে এসব কর্মকাণ্ড বহু বছর ধরে চলে এলেও জাতিসংঘসহ গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলো চুপ করে থেকেছে। তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে।’

মিয়ানমারের নির্বাসিত নাগরিক ও ‘ফ্রি বার্মা কোয়ালিশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা মং জার্নিও জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংগঠনগুলো বড় বড় কথা বলছে, কিন্তু রোহিঙ্গা নিয়ে কোনো আলোচনায় রোহিঙ্গাদেরই অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছেনা।

মিয়ানমারে জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগও আছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো তদন্ত করেননি। চুক্তিটির একটি কপি এখন মানবাধিকার কর্মীদের হাতে হাতে ঘুরছে। এ চুক্তিটি পর্যবেক্ষণ করে তারা বলেছেন এ চুক্তিতে মিয়ানমারের স্বার্থই রক্ষা পেয়েছে।

মং জার্নির ভাষায় কথা বলেছেন মানবাধিকার কর্মী মুস্তাইন জহিরও। তিনি বলেন, এ চুক্তি একেবারেই নীতিবিরোধী ও অগ্রহণযোগ্য। এ চুক্তির সবচেয়ে বড় গর্হিত ও অন্যায় কাজটি হচ্ছে, চুক্তিতে কোথায়ও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। একবারের জন্যও না। এর মাধ্যমে তাদের জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়েছে। এভাবে মিয়ানমার জুলুম ও নির্যাতনের অপরাধে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। জাতিসংঘও এই মতামত প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করছে।

মুস্তাইন জহির আরও বলেন, ‘মিয়ানমার আজও পর্যন্ত স্বীকার  করেনি যে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায়। পাশাপাশি সেখানে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি  না করে তাদের ফেরত পাঠানোও ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ছাড়া তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না। সেখানে এখনো রোহিঙ্গারা অনিরাপদ জীবন যাপন করছে। মিয়ানমারের এ লোক দেখানো চেষ্টাকে জাতিসংঘ গোপন চুক্তির মাধ্যমে আরও সুযোগ করে দিয়েছে।’

আগের সংবাদবিমানবন্দরে গ্রেপ্তার পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ
পরবর্তি সংবাদরূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী