জাবিতে তিলক বরণ : সেকুলারিজমে যেভাবে হিন্দু রীতি সংস্কৃতিতে রুপান্তরিত হয়

মোঃ আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম:

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিলক পরিয়ে নবীন বরনের ঘটনা ঘটেছে। মুসলমান ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষত হিজাব পরিহিতারাও তিলকের আগ্রাসন থেকে রেহাই পান নাই। তিলক স্পষ্টতই একটি হিন্দু ধর্মীয় রীতি যা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে আয়োজকরা বলেন, ‘আমরা কারো কপালে জোরপূর্বক তিলক দেয়নি। আর এভাবে বরণ করে নেওয়া আমাদের ইনস্টিটিউটের একটি রীতি। আমরা কোন ধর্মমত আঘাত করিনি বা করতেও চাই না। এটা শুধু একটা সংস্কৃতি।’

অর্থাৎ, আয়োজকদের ব্যাখ্যা হচ্ছে তারা হিন্দুধর্ম অনুকরণে তিলক পরান নাই। তাদের কাছে তিলক শুধুমাত্র সংস্কৃতি। কিন্তু যেকোন সচেতন মানুষই বুঝতে পারছেন তিলককে যতই সংস্কৃতি হিসাবে চালিয়ে দেওয়া হোক, এর হিন্দুধর্মীয় উতসকে কোনভাবেই লুকানো সম্ভব না। এখন, কীভাবে একটা হিন্দুধর্মীয় আচার সংস্কৃতি হিসাবে উপাস্থাপন করার মাধ্যমে একে সেকুলার সমাজে আমভাবে গ্রহণীয় ও আপত্তির উর্ধ্বে তোলা হল সেটা বোঝার জন্য আমাদেরকে কোনটা সেকুলার ও কোনটা রিলিজিয়াস সেটা কিভাবে সেকুলারিজম নির্ধারণ করে সেটার দিকে আলোকপাত করতে হবে। কিভাবে সালাম-বিসমিল্লাহ দিয়ে বক্তব্য শুরু করা মুসলিম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা কিন্তু তিলক পড়ানো সেকুলার সাংস্কৃতিক রীতি হয়ে উঠে এটা বোঝার জন্য স্রেফ হিপোক্রিসির জিগির তোলাই যথেষ্ট না। বরং এজন্য আমাদের বুঝতে হবে কিভাবে সেকুলারিজম কোন জিনিসকে সেকুলার বা রিলিজিয়াস আখ্যা দেয়। হিন্দু ধর্মীয় রীতিকে সেকুলার, নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক রীতি হিসাবে চালিয়ে দেওয়াটা শুধু বাংলাদেশের সঙ্কট না, এটা স্রেফ ‘ছুপা হিন্দুত্ববাদীদের’ও সঙ্কট না। বরং বিশ্বজুড়ে সেকুলারিজম এভাবেই ক্রিয়া করে। এপ্রসঙ্গে আমি Is Critique Secular? Blasphemy, Injury and Free Speech এর মুখবন্ধে Wendy Brown, Judith Butler ও Saba Mahmood কি বলেছেন তার দিকে দৃষ্টিপাত করতে চাচ্ছি।

উক্ত লেখকগন আমাদেরকে দেখাচ্ছেন যে সেকুলারায়ন শুধু ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথকই করে না। বরং হেজিমনিক রিলিজিয়াস ট্র্যাডিশনের বিভিন্ন রীতিকে নিউট্রাল হিসাবে উপস্থাপন করে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। একটা পর্যায়ে হেজিমনিক রিলিজিয়াস ট্র্যাডিশন থেকে উৎসারিত এইসব রীতিকে আর ধর্মীয় কাজ বলে চিহ্নিত করাও সম্ভব হয় না। সমাজের আইন, বানিজ্য, প্রথা, রাষ্ট্র-নাগরিকের সম্পর্ক ইত্যাদির মধ্যে এগুলো প্রোথিত থাকে। আপাতঃদৃষ্টিতে এসমস্ত রীতিকে দেখে মনে হতে পারে এর সাথে ধর্মের কোন সংযোগ নাই। অথচ এইসমস্ত রীতি ধর্ম থেকেই উতসারিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেমন মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, দীপ প্রজ্জ্বলন ইত্যাদি হিন্দু ধর্মীয় রীতিকে নিরপেক্ষ-সেকুলার রীতিতে পরিণত করা হয়েছে, তেমনি পশ্চিমেও খ্রিষ্টীয় অনেক আচার পশ্চিমা সেকুলারিজমের মধ্যে মিশে আছে। এখানে প্রথমে যেটা বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে সেকুলারিজম আপনাকে বলছে সে নিরপেক্ষ। সে কোন ধর্মেরই পক্ষ নিচ্ছে না। অথচ আদতে সে বিভিন্ন ধর্মীয় রীতিকে সংস্কৃতি হিসাবে দেখিয়ে জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমে সে খ্রিষ্টীয় রীতিকে সংস্কৃতি হিসাবে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দু রীতিকে। অন্যদিকে, মুসলিম সংস্কৃতিকে সে ধর্ম হিসাবে দেখিয়ে তাকে জনপরিসর থেকে মুছে দিচ্ছে।

প্রথমেই এখানে যেটা বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে সেকুলারিজমের নিউট্রালিটির ধাপ্পাবাজি। সেকুলার কখনোই নিউট্রাল না বরং হেজিমনিক ধর্মীয় রীতিকে ভিন্ন মোড়কে সমাজে চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যম মাত্র। একারনেই হিন্দু ধর্মীয় রীতি সেকুলারিজমে এসে হয়ে উঠে ‘সংস্কৃতি’। অথচ মুসলমানদের সালাম-বিসমিল্লাহ হয়ে উঠে ধর্ম-সেহেতু-পরিত্যাজ্য। সংস্কৃতি আর ধর্ম নিয়ে বিতর্কের মাধ্যমে সেকুলারিজম কিভাবে নিউট্রালিটির ভেক ধরে থাকে সেটা বোঝা সম্ভব না। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেকুলারিজম কোনটাকে সংস্কৃতি সাব্যস্ত করে আর কোনটাকে ধর্ম সাব্যস্ত করে সেটা নিয়ে বোঝাপড়া করা। আমাদের বুঝতে হবে কিভাবে হিন্দুধর্মীয় রীতি সংস্কৃতি হয়ে উঠল এবং এর বিরোধিতা করা সংস্কৃতিবিরোধী মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদতা হইল কিন্তু অপরের শান্তি চেয়ে করে দোয়া করা তথা সালাম দেওয়া বাংলাদেশের সুশীল মহলে ধর্মীয় রীতি হিসাবে চিহ্নিত করে সেটাকে বিতাড়িত করা হল। তাহলেই সংস্কৃতির মাধ্যমে ভিন্নধর্মের আগ্রাসনের সেকুলার রাজনীতির মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

আগের সংবাদইতালিতে আইসিইউ সঙ্কট, করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধদের সেবা না দেয়ার সিদ্ধান্ত
পরবর্তি সংবাদদেশের সব সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা