
শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী :
কারো কারো ধারণা, শবে বরাতের ফযিলত কুরআন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত করাকে বিশেষ ফযিলতের ব্যাপার মনে করা ভিত্তিহীন। কেউ কেউ তো এ রাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করাকে বেদআতও বলেছেন। ফলে, জনমনে এ নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য এ বিষয়ে কিছু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি।
সঠিক অনুসরণই প্রকৃত দ্বীন :
কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আছার, তাবেয়ীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের আমলে যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, সেটাকে দ্বীনের বিষয় মনে করা নিঃসন্দেহে বিদআত। নিজে নিজে আবিস্কার করে আমল করার নাম দ্বীন না; অনুসরণের নাম হচ্ছে দ্বীন। কার অনুসরণ ? হুজুর সা., সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের অনুসরণ। যদি ধরে নেই কুরআন হাদিসের আলোকে শবে বরাতের ফযিলত ভিত্তিহীন (যেমন শবে মে’রাজে আলাদা কোন ইবাদত বা এ রাতের বিশেষ কোন ফযিলত কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়), তাহলে এ রাতকে ফযিলতপূর্ণ বানানো অবশ্যই বিদআত হবে।
শবে বরাতের ফযিলত ভিত্তিহীন নয় :
হাদিসে শবে বরাতের কোন ফযিলতের কথা নেই, এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল৷ কমপক্ষে দশজন সাহাবী থেকে শবে বরাতের ফযিলত বিষয়ক হাদিস বর্ণিত হয়েছে৷ তবে এ কথা ঠিক যে, তার মধ্যে কোন কোন হাদিস সনদের বিবেচনায় দূ্র্বল। এবং এ কারণেই কোন কোন আলেম শবে বরাতের ফযিলতকে ভিত্তিহীন মনে করেন। মনে রাখার বিষয়, মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত হল, কোন বর্ণনা সনদের বিবেচনায় দূর্বল হলেও তার বিষয়বস্তু যদি অন্যান্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে সে বর্ণনাটি শক্তিশালি হয়ে যায়৷ তাহলে যেখানে দশজন সাহাবী থেকে শবে বরাতের ফযিলত বিষয়ক হাদিস রয়েছে, সেখানে ফযিলতকে ভিত্তিহীন মনে করা নিতান্তই ভুল।
খায়রুল কুরূনে শবে বরাত :
খায়রুল কুরূন তথা সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনের যুগে শবে বরাতকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখা হতো৷ মানুষজন এ পবিত্র রজনীতে ইবাদতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতেন। সুতরাং শবে বরাতের ফযিলতকে ভিত্তিহীন মনে করা বা বিদআত বলা কোনটারই সুযোগ নেই। আসলে, শবে বরাত ফযিলতপূর্ণ একটি রাত । এতে রাত জেগে বিভিন্ন ইবাদত করা সওয়াবের কাজ।
শবে বরাতে নির্দিষ্ট কোন ইবাদত নেই :
তবে স্মরণ রাখা জরুরি, এ রাতে নির্দিষ্ট কোন ইবাদত নেই। যেমন কেউ কেউ দু’রাকাতের বিশেষ একপ্রকার নামাযের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। প্রথম রাকাতে অমুক সূরা এতবার, দ্বিতীয় রাকাতে অমুক সূরা এতবার ইত্যাদি ইত্যাদি, যা একদম ভিত্তিহীন। সুতরাং কেউ চাইলে যতটুকু মনে চায় নফল নামায, কুরআন তেলাওয়াত, দুআ, তাসবীহে নিমগ্ন থাকতে পারে৷ কিন্তু এ রাতে বিশেষ কোন ইবাদত বা ইবাদতের পদ্ধতির কথা ইসলামে প্রমাণিত নয়।
হালুয়া রুটির শবে বরাত :
মোটকথা, শবে বরাত অত্যন্ত বরকতপূর্ণ রাত। যত বেশি সম্ভব এ রাতে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদত করা চাই৷ বাকী, এ মোবরক রাতে হালুয়া রুটির যে পসরা সাজানো হয়, এটা একটা অনর্থক কাজ। যার সাথে শবে বরাতের কোন যোগসূত্র নেই৷ আসল কথা কি, শয়তান প্রত্যেক কাজেই নিজের শয়তানির ভাগ বসাতে চায়। শয়তান দেখল, এ রাতে প্রচুর বান্দার গোনাহ মাফ করা হয়। যেমন এক হাদিসে আছে, এ রাতে আল্লাহ তা’য়ালা (আরবের)বনু কালব গোত্রের ছাগলের গায়ে যে পরিমাণ পশম রয়েছে, সে পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন।(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৩৭৯; মুসনাদে আহমদ, হদিস ২৪৮২৫)
শয়তান ভাবল, এত বিপুল পরিমাণ মানুষ ক্ষমা পেয়ে বসলে আমি তো আমার সব হারালাম৷ শয়তান তাই মানুষদেরকে বুঝাল, এ রাতে বেশি বেশি হালুয়া-রুটির আয়োজন করতে সমস্যা নেই। সারা বছরই তো হালুয়া-রুটি পাকানোর সুযোগ রয়েছে। যার যখন খুশি, ইচ্ছে হলেই পাকিয়ে খেতে পারে৷ কিন্তু এ মোবারক রজনীর সাথে এর বিশেষ সম্পর্ক কী? কুরআন হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আছার, তাবেয়ীনে কেরামের আমলে কোথাও হালুয়া-রুটির হদিস নেই। কিন্তু শয়তান ভিত্তিহীন, অনর্থক এক কাজে লাগিয়ে দিল৷ সবাই খাবার-দাবার নিয়ে ব্যস্ত। দুঃখজনক ব্যাপার হল, মানুষ এর প্রতি যতটা মনোযোগী থাকে, ইবাদতের প্রতিও কিন্তু ততটা মনযোগী থাকে না।
নির্মল হোন, রমজানের প্রস্তুতি নিন :
বাস্তবতা হল, এ রাত অত্যন্ত ফযিলতের। এ রাতের ফযিলতকে ভিত্তিহীন মনে করা নিঃসন্দেহে ভুল। বরং আমি তো মনে করি, আল্লাহ তা’য়ালা এই শবে বরাত রমজানের দুই সপ্তাহ আগে রেখেছেন, এটা মূলত রমজানের ইস্তেকবালের জন্য৷ রমজানের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য৷ বান্দাকে রমজানের জন্য প্রস্তুত ও সচেতন করা হচ্ছে, প্রস্তুতি নাও, রহমতের পবিত্র মাস আসছে । মাফ পেতে তৈরী হয়ে যাও, মাগফিরাতের সব দরোজা খুলছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে শবে বরাতের কদর করার এবং বেশি বেশি ইবাদাতে নিমগ্ন থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।
[সূত্র : ইসলাহি খুতুবাত, খ.৪, পৃ.২৫৭-২৭০]
অনুবাদ ও সংক্ষেপণ : উবায়দুল্লাহ তাসনিম
