
রাকিবুল হাসান:
মিসরি সিরিয়াল ‘আল ইখতিয়ারে’ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সন্ত্রাসী হিসেবে ট্যাগ দেয়া হয়েছে। সিরিজটির সম্প্রতি সম্প্রচারিত একটি এপিসোডের সংলাপে এই ট্যাগ দেয়া হয়। সিরিয়ালের ঘৃণ্য এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মিসরের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
সম্প্রতি প্রচারিত একটি পর্বে দেখা যায়—সন্ত্রাসী চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা সন্ত্রাসী অভিযানের সময় বেসামরিক নাগরিক হত্যার ন্যায্যতার প্রসঙ্গে ইবনে তাইমিয়ার একটি উক্তি উদ্ধৃত করে। এতে একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক হাদীসের অংশ ইবনে তাইমিয়ার সঙ্গে জুড়ে দেয়।
মিশরের সশস্ত্র বাহিনীর ১০৩ বিগ্রেডের কমান্ডার কর্নেল আহমেদ সাবের আল মানসির জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছে ‘আল ইখতিয়ার’ সিরিয়ালটি। ২০১৭ সালের রমজানে এক সশস্ত্র অভিযানের সময় নিহত হন এই কর্নেল। তখন মিসরীয় মিডিয়া তাকে ‘বজ্রপাত বাহিনীর আইকন’ হিসেবে তুলে ধরেছিলো। এই সিরিয়ালটি নির্মিত হয়েছে মিসর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়।
মিসরীয় লেখক ইসলাম আল বেহিরি, যিনি বহু আলেম এবং চিন্তাবিদদের ওপর আক্রমণ করার জন্য পরিচিত, তিনি সিরিয়ালের এই কর্মকাণ্ডকে ‘দুর্দান্ত বিজয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘আমাদের শহীদদের জন্য সমবেদনা। কিন্তু ইবনে তাইমিয়ার জন্য কোনো সমবেদনা নেই।’ তবে একজন লেখক উলটো কলম ধরলেও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন মিসরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইবনে তাইমিয়াকে ডিফেন্ড করে তৈরী করেছেন হ্যাশট্যাগ ‘ইবনে তাইমিয়া মেশ ট্যারোরিস্ট’।
هجوم على شيخ الإسلام ابن تيميه رحمه الله في كل مرة غير مبرر، أتمنى مرة واحدة مناقشة شيخ الإسلام تكون مبنية على الأدلة والبراهين والحجج بعيدة عن الهمز واللمز بجهل وغباء. لم يكن ابن تيميه نبيا حتى يكون معصوما و لم يكن شخصا عاديا حتى يناقشه الجهلة.#ابن_تيمية_مش_ارهابي
— خالد الحوينى (@khaledalheweny) May 4, 2020
ইবনে তাইমিয়ার পক্ষে যারা কথা বলছেন, তারা বিভিন্নভাবে যুক্তি দিয়ে সিরিয়ালের বক্তব্যের প্রতিবাদ করছেন। কেউ লিখছেন, ‘ইবনে তাইমিয়া সবসময় খারেজি এবং বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন। তার সঙ্গে যারা দুর্ব্যবহার করেছে, জেলে আটকে রেখে তাকে নির্যাতন করেছে, তিনি তাদেরকেও মাফ করে দিয়েছেন।’ কেউ মিসরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়ালে টাঙানো ইবনে তাইমিয়ার একটি বাণীর ছবি শেয়ার করছেন। বাণীতে লেখা—’যদি সত্যের সঙ্গে না থাকো, বাতিল তোমাকে নিয়ে খেলবে।’
كلمات بن تيميه موجوده علي جدران التجنيد وزاره الدفاع#ابن_تيميه_مش_ارهابي pic.twitter.com/YBnzyqXMq2
— Mohammed Ahmed (@mohammed__gmail) May 5, 2020
আবার কেউ লিখছেন, ‘ইবনে তাইমিয়া নিষ্পাপ নন; সমালোচনার উর্ধ্বেও নন। তবে সমালোচনা করতে হলে যথার্থ প্রমাণ, যুক্তি দিয়েই কথা বলতে হবে। শুধু এমনিতেই একটি ট্যাগ লাগিয়ে দিলে হবে না।’ কেউ লিখছেন, ‘ইবনে তাইমিয়াকে যারা আক্রমণ করছে, তারা তার সমসাময়িক এবং তার আগের অন্যন্য আলেমদের নিয়েও সমালোচনা করে। যেমন ইমাম বুখারী, শায়খ আল শারাভি, শায়খুল আজহার। তারা মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করে না। বরং ইসলামের চিহ্ন এবং আলেমদের আক্রমণ করে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চায়।’
سينقلب السحر على الساحر وهتكون اكبر حمله تعريف بشيخ الإسلام إبن تيميه #ابن_تيمية_مش_ارهابي
— سناء الأنور (@nNrYReWjg0X98hN) May 4, 2020
উল্লেখ্য, ইবনে তাইমিয়া রহ. একজন ইসলামি পণ্ডিত, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও যুক্তিবিদ। হিজরী সপ্তম শতাব্দীর একজন সংস্কারক। ইসলাম ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে একজন উজ্জল নক্ষত্র। ১২৬৩ সালের ২২ জানুয়ারি (৬৬১ হিজরি) সিরিয়ার হাররান (বর্তমানে তুরস্কের অর্ন্তগত) প্রদেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
ইবনে তাইমিয়ার পূর্ণ নাম তাকিউদ্দিন আবুল আব্বাস ইবনে আবদুল হালিম ইবনে আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া আল হারানি। তবে তিনি ‘ইবনে তাইমিয়া’ নামে বেশি পরিচিত।
ইবনে তাইমিয়া তার সূক্ষ্ম বিচারশক্তি ও সুদক্ষ তাকির্কতার পারদর্শীতার কারণে আলেম সমাজে অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী একজন ফকীহ। তিনি ছিলেন একজন হাফেজ। আল-কোরআন ও হাদীসের ব্যখ্যা প্রদানে সে সময় তার সমকক্ষ তেমন কেউ ছিলনা বললেই চলে। ইবনে তাইমিয়া ইসলামি আইনের ক্ষেত্রে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। ইবনে কুদামার পাশাপাশি তার অনুসারীরা ইবনে তাইমিয়াকে হাম্বলি মাজহাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করেন।
মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়ার কারণে তিনি বেশি আলোচিত হয়েছিলেন। তার সময়ে মোঙ্গলরা ইসলাম গ্রহণ করলেও শরিয়ার অনুসরণ না করায় তিনি তাদের অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
মুসলমানদের মধ্য থেকে শিরক, বিদাত দূর করার জন্যে ইবনে তাইমিয়া লিখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে সার জীবন কাজ করে গেছেন।
বিরোধীদের চক্রান্তে ইবনে তাইমিয়াকে জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছিলো। এমনকি ইমাম আবু হানীফার মতো তার মৃত্যুও কারাগারের ভেতরেই হয়েছিলো। মৃত্যুর এক বছর পূর্ব থেকে ইবনে তাইমিয়াকে কলম, কালি, কাগজ সরবরাহ করা হয়নি, যাতে তিনি তার জ্ঞান না লিপিবদ্ধ করতে পারেন। বিশ্ববিখ্যাত এ ইমাম ১৩২৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর (২২ যুলক্কাদা ৭২৮ হিজরীতে) সিরিয়ার দামেস্কের কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
