
রাকিবুল হাসান:
অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শায়খ হামাদ এওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ এর সিজন ৬ এর তৃতীয় সিম্পোজিয়াম। গত বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই কাতারে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ‘বাংলাদেশে আরবি অনুবাদের বাস্তবতা এবং সম্ভবনা’ শীর্ষক এই সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষাবিদ এবং অনুবাদক।
সিম্পোজিয়ামে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির আরবি বিভাগের প্রফেসর ডা. আবু জামাল মুহাম্মদ কুতুবুল ইসলাম নোমানি। তার বক্তৃতার শিরোনাম ছিল—’আরবি এবং অন্যান্য ভাষায় বাংলাদেশের অনুবাদ অভিজ্ঞতা : রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ধরণ’। বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশে শাসনকাল এবং তাদের ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি যোগ করেন, বাংলাদেশে অনুবাদের ক্ষেত্রে সবচে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে পবিত্র কুরআনুল কারীম। কুরআনের অনেক অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন অনুবাদকের হাতে।
অনুবাদে গুরুত্ব দেয়, বাংলাদেশের এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তারমধ্যে অন্যতম হলো দ্বীনি বই অনুবাদের সবচে বড় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশন থেকে তাফসির, ফিকাহ, জীবনী, সিরাত, হাদীসসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি ফুটনোটে এটাও বলেছেন যে, বাংলা থেকে আরবি ভাষায় অনুবাদের প্রচেষ্টা খুবই কম।
বাঙালি সমাজে আরবি থেকে অনূদিত বইয়ের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন নোমানি। তিনি বলেন, আরবি থেকে বাংলায় অনূদিত বইয়ের মার্কেট গড়ে উঠার ক্ষেত্রে ইসলামি জাগরণের বড় একটা প্রভাব রয়েছে।
অভিজ্ঞতা এবং সঙ্কট
সিম্পোজিয়ামে ‘বাংলা অনুবাদে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা : বাংলা থেকে আরবি এবং অন্যান্য ভাষায় অনুবাদকদের পরিসংখ্যান’ শিরোনামে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া ইউনিভার্সিটির আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ডা. মাহফুজুর রহমান মুহাম্মদ জহির। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দ্বীনি বইয়ের অনুবাদ বেড়েছে। কারণ, আরবি থেকে অনুবাদকারীগণ দ্বীনি ইলমে অভিজ্ঞ। অন্যান্য বিষয়ে ততটা পারদর্শী নন। যেমন দর্শন। ফলে অন্যবিষয়ে তারা অনুবাদ খুব কম করেন।’
আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদকগণ যেসব সমস্যায় পড়েন, তার প্রসঙ্গ তুলেন ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, অনুবাদকগণ অনুবাদ করতে গিয়ে কিছু বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ক কঠিন শব্দের মারপ্যাচে পড়েন। ফলে বিভিন্ন উৎস এবং সোর্সের দিকে তাদের হাত পাততে হয়। মাঝেমধ্যে তাদেরকে এমন বিষয়ে অনুবাদ করতে বলা হয়, যে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা নেই। যেমন মনোবিজ্ঞান।
ডা.মাহফুজুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, এই সময় একজন অনুবাদককে ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে হয়। পরিপূর্ণ প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করতে হয়। ইলমি আমানত রক্ষা করতে হয়। ইলমি আমানত রক্ষা করাটা একজন অনুবাদকের বিশেষ শর্ত।
দুই ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্র
ঢাকার ‘শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি’র ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক ডা. আব্দুল্লাহ মামুন আবদুল লতিফ বক্তব্য রাখেন এই সিম্পোজিয়ামে। ‘বাংলা ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্র এবং ধরণ’ শিরোনামে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে ১৮৯ মিলিয়নের বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। জাতিসংঘে লিপিবদ্ধ জীবন্ত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই ভাষা। ফলত বাংলা ভাষায় লিখিত এবং মৌখিক অনুবাদের এত গুরুত্ব।’
আব্দুল্লাহ মামুন তার বক্তৃতায় বাংলা অনুবাদের দু’টি যুগের কথা তুলে ধরেন। এক—মধ্যযুগ। এর ব্যাপ্তি ১২০০ থেকে ১৬০০ খৃস্টাব্দ। দুই—আধুনিক যুগ। এর ব্যাপ্তি ১৬০১ থেকে বর্তমান অব্দি। বাংলা থেকে আরবিতে অনূদিত কয়েকটি গ্রন্থের কথা বলেন তিনি। এরমধ্যে একটি ফারুক আহমাদ খানের কবিতার অনুবাদ। দ্বীনি বিষয় বাদে অন্যন্য বিষয়ে বাংলায় অনুবাদ খুব কম হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুবাদে ধর্মীয় প্রেরণা
কুষ্টিয়া ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর আবু মুহাম্মদ সালেহ বাংলাদেশে অনূদিত গ্রন্থের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তুলে ধরেন বাংলা অনুবাদের ইতিহাস এবং প্রারম্ভিক সূচনা। তিনি বলেন, অনুবাদের সূচনা হয়েছিল মুসলিম সুলতানদের আদেশে। এতেই বুঝা যায়, অনুবাদের প্রতি তাদের কী গুরুত্ব ছিল।’
আবু মুহাম্মদ সালেহ বাংলাভাষার দুটি অঞ্চলের প্রার্থক্যও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকা কেন্দ্রিক যে বাংলা ভাষা, তাতে মিশে আছে স্বভাবজাত ইসলাম। কলকাতা কেন্দ্রিক যে বাংলা ভাষা, তাতে মিশে আছে স্বভাবজাত হিন্দুয়ানি আবেশ। তাই অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করতে গেলে এই দিকটি লক্ষ্য রাখতে হয়। আরবি থেকে বাংলায় অনূদিত প্রথম গ্রন্থ ‘ইউসুফ জুলায়খা’। এটি ১৫০০ শতকে অনূদিত হয়।’
সিম্পোজিয়ামে সবার শেষে এই পুরস্কারের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ‘শায়খ হামাদ এওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ এর মিডিয়া কনসালট্যান্ট ডা. হান্নান ফাইয়াজ।
সূত্র : আল জাজিরা
