‘তৃতীয় লিঙ্গ’ : প্রচলিত যৌন বিকার ও ব্যতিক্রম ব্যাখ্যা কেন সমস্যাজনক?

রাকিবুল হাসান:

২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে হিজড়াদের স্বীকৃতি দেয়। ২০০৮ সাল থেকেই বাংলাদেশে হিজড়ারা ভোটার। তাদের এ রাজনৈতিক অধিকার রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। আমাদের দেশে তাই নারী আছে, পুরুষ আছে, তৃতীয় লিঙ্গও আছে। মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী হিজড়ারা মা-বাবার সম্পত্তির ভাগ পাবে। তাদের বঞ্চিত করা আইনের বরখেলাপ হবে। তবে তারা উত্তরাধিকার সম্পদে নারী হিসেবে পাবে নাকি পুরুষ হিসেবে পাবে, তা-ও শরিয়ায় নিশ্চিত করা আছে।

রাজধানী ঢাকার শায়েখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদের মতে, প্রকৃতপক্ষে হিজড়া নারী-পুরুষের বাইরে আরেকটি লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানবধারা। হিজড়া মানববিশেষ লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হয়, তার লিঙ্গ অনুপযোগী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ। ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী হিজড়া হচ্ছে সে, যার পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়টিই রয়েছে অথবা কোনোটিই নেই। শুধু প্রস্রাবের জন্য একটি ছিদ্রপথ রয়েছে। একই দেহে স্ত্রী ও পুরুষ চিহ্নযুক্ত অথবা এই উভয় চিহ্নবিযুক্ত মানুষটি হলো হিজড়া। সবচেয়ে ভালো হয়, আমরা যদি তাকে ‘লিঙ্গ প্রতিবন্ধী’ বলি। সব মানুষই নিখুঁত নয়, কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কেউ চোখে কম দেখে, কেউ কানে শোনেই না, কেউ কথা বলতে পারে না, কারো বুদ্ধি কম। এদের আমরা প্রতিবন্ধী বলি। হিজড়ারাও এক ধরনের প্রতিবন্ধী, তারা লিঙ্গপ্রতিবন্ধী। তবে এর মধ্যেও আমরা হিজড়াদের নারী-পুরুষ ভেদ করতে পারি।

বাংলাদেশ সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১২ সাল থেকে হিজড়াশিশুদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। বাংলাদেশ আইন কমিশন সুপারিশকৃত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন ২০১৪’ প্রণয়ন করেছে। জাতীয় সংসদেও তা গুরুত্ব পেয়েছে। এ আইনের ৪ নম্বর ধারা ও উপধারায় লিঙ্গ প্রতিবন্ধীদের জন্ম, পরিবার, উত্তরাধিকার বিষয়ে বৈষম্য বিলোপ করার কথা উল্লিখিত হয়েছে। সংবিধানের ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদেও সব নাগরিকের সমতা, সমান সুযোগ ও সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের বিধানাবলি লিপিবদ্ধ রয়েছে।

ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী একজন হিজড়া হয়তো পুরুষ হবেন বা নারী। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী বানিয়ে তাদের জন্য আইন করার কি সুযোগ আছে? মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘ইসলাম হিজরাদেরকে নারী-পুরুষ হিসেবে অধিকার দেয়ার কথা বলেছে সাম্যের জন্য, অধিকার সুনিশ্চিতের জন্য। কিন্তু তারা তো আর পূর্ণ পুরুষ অথবা পূর্ণ নারী নয়। নারী-পুরুষের অনেক কাজই তারা করতে সক্ষম নয়। সমাজও তাদেরকে স্পেস দেয় না। তারা প্রতিবন্ধী। তাই তাদের অধিকারের জন্য যদি আইন করা হয়, তাতে খারাপ কিছু দেখছি না। তবে আইন ইসলাম বিরোধী হওয়া যাবে না।’

বর্তমানে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লোভে অনেক সুস্থ মানুষও হিজড়া সেজে থাকে। ক’বছর বাংলাদেশ সরকারের একটি চাকরিতে হিজড়া কোটা থাকায় অনেক তরুণ-যুবক হিজড়া হিসেবে নিজেদের নাম লেখায়। কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হওয়ায় তাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তারা সবাই সুস্থ। ইদানীং আরেকটি ঘটনা সংক্রমণ হচ্ছে, আর তা হলো, অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল তরুণ-যুবকদের অস্ত্রোপচার করে লিঙ্গ কর্তন করে দিচ্ছে। অনেককে ওষুধ খাইয়েও হিজড়া বানানোর চেষ্টা চলছে। এদের অধিকাংশেই সমকামিতা এবং বিকৃত যৌনচর্চার সাথে জড়িত।

আরজে কিবরিয়ার সঞ্চালনায় রেডিও এবিসিতে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’ শিরোনামে একটি লেট নাইট শো হতো। মাসের শেষ রোববার আমন্ত্রণ জানানো হতো হিজড়াদের। শোতে হিজড়াদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। তাদের দাবি—বাংলাদেশে হিজড়াদের নব্বই শতাংশই কৃত্রিম। তারা মূলত হিজড়া নয়। সুবিধা নেবার জন্য হিজড়া সেজেছে। এক সমকামী হিজড়া বলেছিলো, সমকামিতার প্রতি অসক্তি থেকেই সে হিজড়ার দলে যোগ দিয়েছিলো। কারণ হিজড়ার দলে সমকামিতা খুব সহজলভ্য। লিঙ্গ কেটে হিজড়া হওয়া এক তরুণের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রতিবেদকের। তরুণের স্বীকারোক্তি—নারীদের মতো সাজতে তার ভালো লাগতো। সমকামিতার প্রতি সে ছিল আসক্ত। তবে সে লিঙ্গ কাটতে চায়নি। কিন্তু হিজড়া দলের নেতার চাপে এবং টাকা কালেকশনের সুবিধার্থে সে লিঙ্গ কাটতে বাধ্য হয়েছে। তার আরও অনেকেই নেতাদের চাপে বাধ্য হয় লিঙ্গ কাটতে। এটা সার্জারি করতে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার মতো লাগে।

যৌনবিকৃতির প্রচলিত এই ধারার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ। তিনি বলেন, বুখারী শরিফে আছে-আমাদের নবী সা. ওইসব পুরুষের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং ওই সব নারীর ওপরও অভিশাপ করেছেন, যারা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করে। যারা নারীদের সদৃশ হতে চায়,তাদের ওপর অভিশাপ। যারা বিকৃত করতে চায়, তাদের ওপর চূড়ান্ত অভিশাপ। এরচে মহাপাপ আর নেই। আমি নিজেও শুনেছি—হিজড়া সেজে বিকৃত যৌবচর্চা করে অনেকে। এমনকি ধর্ষণও করে। এদের কাছে কেউ নিরাপদ না। তাই সরকারের উচিত—তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। যারা লিঙ্গ বিকৃত করছে, ভণ্ডামি করছে, তাদেরকে পরীক্ষা করে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা। অধিকার লিঙ্গ প্রতিবন্ধীদের জন্য, কৃত্রিম হিজড়াদের জন্য নয়।

আগের সংবাদ‘যৌন পরিচয় নিয়ে সংশয়’ : যে কারণে পশ্চিমা চিন্তায় বিপর্যয়
পরবর্তি সংবাদপ্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে সমকামিতার আইন