
রাকিবুল হাসান:
মিয়ানমারের নির্বাচনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এতে এসব শরণার্থী মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নতুন নির্বাচন দাবি করেছে তারা।
বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গা যুবক খিন মংকে আনাদলু এজেন্সিকে বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, ভোটাধিকার একটি মৌলিক অধিকার। তবে মিয়ানমার সরকার আমাদের অধিকার অস্বীকার করছে। আমরা মিয়ানমারের নাগরিক। সুতরাং আমাদের অবশ্যই ভোটাধিকারের অধিকারী হতে হবে।’
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ১.১ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে রাষ্ট্রহীন মানুষ হিসাবে বসবাস করছে।
অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ২০১৫ সালের মিয়ানমার নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক-সমর্থিত ইউনিয়ন সংহতি ও উন্নয়ন দল (ইউএসডিপি) -এর বিরুদ্ধে একটি দুর্দান্ত জয় পেয়েছিল। তখন ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের অজুহাতে মিয়ানমারে বসবাসরত ১.৩ মিলিয়ন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ভোট প্রদানে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে রোহিঙ্গা জনগণ ২০১৫ সালের নির্বাচনে দে ফ্যাক্টো নেতা সু চিকে আন্তরিকভাবে সমর্থন দিয়েছিল এই আশায় যে, তিনি রোহিঙ্গাদের বৈধ অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখবেন। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রায় ৭৫০০০০ রোহিঙ্গা নৃশংস সামরিক ক্র্যাকডাউন থেকে পালিয়ে আসার পর তাদের আশায় গুড়েবালি পড়েছে।
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ভোটের দাবি
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ভোটের দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
রোহিঙ্গা যুব সমিতির (আরওয়াইএ) প্রতিষ্ঠাতা মাওং বলেছেন, ‘আমরা ভোট দিতে চাই; কিন্তু এনএলডি নেতৃত্বাধীন সরকার আমাদের বাদ দিয়ে চলেছে। আমাদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল এবং ১৯৩৩৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত আমরা সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলাম। জাতিসংঘের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল, যাতে কমপক্ষে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।’
শিবিরভিত্তিক রোহিঙ্গা নেতা মাঝি আনসার আলী আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, ‘তারা হতবাক। মানবাধিকার কর্মীদের দ্বারা বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দেশটির সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করছে। আমরা কখনও এ জাতীয় একপেশে নির্বাচন গ্রহণ করি না এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গ্রহণ করা উচিত নয়।’
নোজেমুল্লাহ গলা চড়িয়ে বলেছিলো, ‘আমি সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বার্মার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করছি।’
ইউকে ভিত্তিক রোহিঙ্গা অধিকার রক্ষাকারী বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের (বিএইচআরএন) নির্বাহী পরিচালক কায়া উইন নির্বাচনকে ‘অ-অংশগ্রহণমূলক’ এবং ‘অযৌক্তিক’ অভিহিত করে বলেছেন, ‘এ নির্বাচন কোনও মানদণ্ডে গৃহীত হতে পারে না। নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের ছাড় দেওয়া এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোট উপেক্ষা করার সিদ্ধান্তটি সাংঘর্ষিক।’
‘মৌলিক জালিয়াতি’
শুক্রবার এক বিবৃতিতে বার্মিজ রোহিঙ্গা সংস্থা ইউকে (ব্রুক) বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘রোববারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ছাড় দেওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দার অভাব রোহিঙ্গা জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আরও উত্সাহিত করবে।’
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সরকার এবং সংস্থাগুলি এই বৈষম্যমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বার্মা সরকার এবং সরকার নিযুক্ত ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন (ইউইসি) কে সহায়তা করে আসছে।’
ব্রুকের রাষ্ট্রপতি তুন খিন বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের হতাশাই আমাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার আর একটি অংশ।’
নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই নির্বাচনকে ‘মৌলিক জালিয়াতি’ বলে অভিহিত করেছে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে ৯৩টি দল অংশ নিলেও, অং সান সু চি’র দল- এনএলডি এবং প্রধান বিরোধী- ইউএসডিপি সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিবিসি ও সিএনএন জানিয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে অং সান সু চির ‘জনপ্রিয়তা’ বিবেচনায় তার দল এনএলডি আবারও ক্ষমতায় আসবে।
দেশটির ৫০ লাখ তরুণ ভোটার৷ ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এনএলডি সরকার সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ছাত্র আন্দোলন দমাতে শক্তি প্রয়োগ করেছিল৷ ফলে অল বার্মা ফেডারেশন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন আসন্ন নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে৷
সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এমন নির্বাচন আয়োজনের পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে মিয়ানমারের সংবিধান৷ এটি অগণতান্ত্রিকও বটে৷ শুধু ৭৫ শতাংশ আসন পূর্ণ হয় জনগণের ভোটে, বাকি আসন শুধু মনোনয়ন৷ ২০০৮ সালে এ সংবিধান গ্রহণ করা হয়৷ এ সংবিধানের আলোকেই ২০১৫ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল৷
তথ্যসূত্র: আনাদলু এজেন্সি
