
শামীম আনোয়ার:
সুবেদার শায়েস্তা খাঁ
সুবেদার শায়েস্তা খানকে চিনে না বাংলাদেশে এমন লোক খুব কমই আছে। আর শায়েস্তা খানের নাম শুনলেই আমাদের মাথায় চট করে যে কথাটি চলে আসে সেটা হল টাকায় আট মণ চাল। শায়েস্তা খান ছিলেন সম্রাট আলমগীরের মামা। তিনি দুই মেয়াদে বাংলার সুবেদারির দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমবার ১৬৬৪ থেকে ১৬৬৭৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আর দ্বিতীয়বার ১৬৭৯ থেকে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।
সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার কৃষি উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। ফলে দ্রব্যমূল্য হ্রাস পেলে ১ টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। আর একথাটি এখন কোন জিনিসের সস্তায় বিক্রির অবস্থা বুঝানোর জন্য একটা প্রবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অনেক অনলাইন শপ, কোম্পানিও তাদের সর্বোচ্চ ছাড়ের অফারকে প্রচারের সময় ‘শায়েস্তা খাঁর অফার’ এমন টাইটেল ব্যবহার করে থাকে। শায়েস্তা খানের সুদীর্ঘ শাসনকালে বাংলার লোকেরা সুখ-শান্তিতে ছিল। কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি হয়েছিল।
সমসাময়িক ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ারের বিবরণী থেকে শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য ও দ্রব্যমূল্যের সুলভতা সম্বন্ধে জানা যায়। এই সময়ে এক টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যেত। এই ঘটনা স্মরণীয় করার জন্য শায়েস্তা খান ঢাকা থেকে চলে যাওয়ার পূর্বে দুর্গের পশ্চিম তোরণ-দ্বার বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দেন এবং সেখানে লিখিত হয় যে, ভবিষ্যতে যে সুবাদারের আমলে টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যাবে, তিনি ব্যতীত আর কেউ যেন এই তোরণ দ্বার না খোলেন। এর ফলে এই তোরণ-দ্বার বহু বৎসর বন্ধ থাকে। নবাব সুজাউদ্দিন খানের সময়ে আবার টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যায়। তখন মহাসমারোহে দুর্গের পশ্চিম তোরণ-দ্বার খোলা হয়।
নবাব সুজাউদ্দিন খান
শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় ৮ মণ চালের ইতিহাস আমরা প্রায় সকলেই জানি।তবে বাংলার ইতিহাসে আরেকজন শাসক ছিলেন যার আমলেও ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত। তিনি হলেন নবাব সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭-৩৯খ্রিঃ)।তিনি নবাব মুর্শিদ কুলী খানের জামাতা ছিলেন।
সমসাময়িক ইতিহাস-লেখকরা নবাব সুজাউদ্দীনের শাসন-দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। সুজাউদ্দীন নিজে শাসনকার্যের সব কিছু তত্ত্বাবধান করতেন এবং প্রজাদের কল্যাণের জন্য চেষ্টা করতেন। তিনি সদাশয় ও উদার ছিলেন। তিনি পুরাতন বন্ধু-বান্ধব ও কর্মচারীদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন এবং তাঁদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতেন। নবাব সুজাউদ্দীন ছোট-বড় সকলকে সমান চোখে দেখতেন এবং সকলের প্রতি ন্যায়বিচার করতেন। গোলাম হোসেন তাবাতাবাই লিখেছেন যে, নবাব সুজাউদ্দীন নিরপেক্ষ বিচারে দরিদ্রতম প্রজা ও নিজের পুত্রের মধ্যে তারতম্য করতেন না। ভয়ার্ত প্রজা নির্বিঘ্নে তাঁর নিকট আশ্রয় নিতে পারত। প্রজারা মনে করত যে, তারা ন্যায়পরায়ণ নওশেরোয়ার রাজত্বে বাস করছে।
সুজাউদ্দীনের সুশাসনে প্রজারা সুখ শান্তিতে ছিল। তাঁর শাসনকালে জিনিসপত্র খুব সুলভ ছিল; এক টাকায় ৮ মণ চাউল পাওয়া যেতো। শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকার দুর্গের পশ্চিম তোরণ-দ্বার বন্ধ করা হয়েছিল। সুজাউদ্দীনের সময়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়।
তথ্যসূত্র :
বাংলার ইতিহাস, প্রফেসর আব্দুল করিম।
বাংলাদেশের ইতিহাস, ফোর ডক্টরস।
