
রাশেদুল ইসলাম:
৬-ই মার্চ। দিনটি ছিলো শনিবার। অধীর আগ্রহ নিয়ে বহু কষ্টে সকাল বেলা উপস্থিত হলাম ময়মনসিংহ আনজুমানে ঈদগাহ মাঠ প্রাঙ্গণে। ‘ইত্তেফাকুল উলামা’ বৃহত্তর মোমেনশাহী কর্তৃক আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘সীরাতুন্নবী সা. সম্মেলন’। এখনো পেন্ডেলের ভেতরে অনেক জায়গা খালি। একটু পরেই যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে, পা সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটাও পাওয়া যাবে না, এমনটা মাথায় রেখে প্রথম সারিতেই বসে পড়লাম সুবিধানুগ অবস্থানে। শায়খুল হাদিস আল্লামা মাহমুদুল হাসান দা.বা. আলোচনা করছিলেন। শ্রোতারা সবাই পিনপতন নিরবতায় হযরতের মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণ করছে। আমরা কোনো কথা বলছি না। চুপচাপ নীরবে শুনছি তাঁর আলোচনা। মিডিয়াগুলোও তাঁদের সব ক্যামেরা নামিয়ে শুধু মাইক্রোফোন রেখে দিয়েছে স্টেজের পাশে। কারণ সবাই জানে হুজুর ভিডিও করা শুধু পছন্দ করেননা তা-ই নয়, বরং রীতিমতো বিরোধী। বয়ান চলাকালে একজনকে শাসিয়েছেনও এ নিয়ে।
হযরতের আলোচনা শেষে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মাইকে ঘোষণা ভেসে এলো, আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন, লেখক-সাহিত্যিক, গবেষক, ইসলামী চিন্তাবিদ, দৈনিক আমার দেশ প্রত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক হযরত মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ সাহেব।
মনটা আনন্দে ভরে গেলো। তৃষিত হৃদয়ে এক আঁজলা শীতল পানির অনুভব করলাম। কতদিনের আশা হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করবো- এ সৌভাগ্য আর হয়ে ওঠেনা । আজ এতো সহজেই দেখা হবে, পেয়ে যাবো তাঁর সাক্ষাৎ, ধন্য হবো তাঁর নূরানী চেহারা দর্শনে, কল্পনাও করতে পারিনি। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির রিমিঝিমি! অবশ্য এমন একটা আশা ছিলো, যেহেতু সম্মেলনের পাশাপাশি ইসলামী বইমেলার আয়োজন রয়েছে , এরই সূত্র ধরে কিছু সংখ্যক ইসলামী লেখকও উপস্থিত থাকতে পারেন বইমেলাতে। আর তাতে মনমানসিকতার বিচারে হুজুরের উপস্থিতির সম্ভবনা একটু বেশিই। কিন্তু মাহফিল উপলক্ষে হুজুর আসবেন এটা জানা ছিলো না। আমার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলো সতীর্থ বন্ধু বুরহান উদ্দীন। দুজন পাশাপাশি বসেছি। আমি আনন্দের আতিশয্যে বুরহানকে বলেই ফেললাম, দোস্ত আমার আজকের সফর স্বার্থক। নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়লাম সেই কাঙ্ক্ষিত মুখখানা স্পষ্ট দেখার জন্যে। হুজুর আলোচনা করলেন সীরাত বিষয়ে। বরাবরই যেমন সুন্দর সাজানো গোছানো হয়ে থাকে তাঁর আলোচনা, আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরং আজ আরো চমৎকার আকর্ষণীয় লাগছিলো। প্রতিটি কথা হৃদয়পটে গেঁথে গেঁথে যাচ্ছিলো। কারণ হয়তোবা এটাই আজ সম্মুখে বসে সরাসরি হুজুরের মুখপানে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে শ্রবণ করছি তাঁর কথামালা।
হুজুর বয়ান গুছিয়ে আনছেন। বয়ান শেষ হতে না হতেই বুরহানকে ডেকে নিয়ে চলে গেলাম স্টেজের পেছনে। উদ্দেশ্য আমার এতদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা। হুজুরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করা, কিছু কথা বলা। আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্টেজের প্রবেশপথে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর লক্ষ্য করলাম হুজুর ধীর পদক্ষেপে নেমে আসছেন স্টেজ থেকে। সাদা লেবাস, নূরানী চেহারা, কিছু কাঁচা কিছু পাকা অবিশ্বাস্য সুন্দর দাড়ি। হাতে গা থেকে খোলা কোট এবং ইত্তেফাকের দেওয়া ‘সীরাত স্মরক’। অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি সেই নূরানী চেহারার দিকে। হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে আসছেন সামনের দিকে, যেমন হাসিমুখ লক্ষ্য করা যায় তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে।
অনেকেই সালাম বিনিময়, মুসাফাহা, হাল-পুরসি করছে। আমি আরও দু’এক পা আগে বেড়ে সালাম বিনিময়, মুসাফাহা শেষে হুজুরের তড়িগড়ি দেখে শুধু এতটুকু বলতে পারলাম, ‘হুজুর কেমন আছেন?’ তিনি হাসিমুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি’ বলে হাঁটতে লাগলেন। আমিও সুযোগের আশায় পিছু হাঁটতে লাগলাম। ভাবলাম হয়তো সামনের মসজিদে বসে ক্লান্তিভাব দূর করবেন। একটু জিরিয়ে নিবেন। ওখানেই বলা যাবে আমার ভিতরে জমে থাকা কথাগুলো। আরেকটু কাছে গিয়ে কোট ও স্মারকটা নেওয়ার জন্য দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, হুজুর আমাকে দেন, আমি নিয়ে যাই! হুজুর কোমলস্বরে বললেন, না থাক আমার কাছেই থাক।
এখন হুজুরের সাথে সাথে হাঁটছি, বুরহান পেছনে পেছনে। ওর তেমনটা জানাশুনা নেই হুজুর সম্পর্কে। তবে আজকের বয়ানে সেও মুগ্ধ হয়ে গেছে, ভক্ত হয়ে গেছে হুজুরের। আমি হাঁটছি আর ভিতরে কথাগুলোকে কল্পনায় সাজিয়ে নিচ্ছি কিভাবে বলবো। মনের ভেতরে কথাগুলো একটার পর একটা সারিবদ্ধ হচ্ছে যেন এখনই বেরিয়ে পড়বে একের পর এক। এরকম গোছালোভাবে:
‘যেদিন থেকে আপনার লেখা পড়ছি তখন থেকেই আমার হৃদয়ে একটা অজানা-অচেনা ভালোলাগা ও আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে আপনার প্রতি, আপনার লেখার প্রতি। আমার ছোট্ট হৃদয়ে আলাদা একটা শ্রদ্ধানিবেদিত জায়গা হয়ে গেছে আপনার জন্য। আর এ জায়গাটা কী পরিমাণ, কতটুকু তা বলে বুঝানো সম্ভব না! সেই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থেকেই প্রবল আগ্রহ জেগেছে আপনাকে দেখার। আপনার সাথে কথা বলা ও সাক্ষাৎ করার। বহুবার দেখেছি এবং কথাও শুনেছি আপনার। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছু বলতে পারিনি বা বললেও আপনি শুনতে পাননি, আপনাকে শুনাতে পারিনি!
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছি আপনি দাঁড়িয়ে বা বসে বক্তব্য দিচ্ছেন, সমসাময়িক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন, সাহিত্য সেমিনারে সাহিত্য-সাংবাদিকতা নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করছেন, সময়ের চাহিদানুরূপ মিডিয়ার জগতে আমাদের অগ্রসর ও যথাযত ভূমিকা রাখার পথ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোকপাত করছেন। আমি শুধু দেখছি আর শুনছি, শুনছি আর দেখছি। আর আপনার হৃদয়কাড়া ভাষায় উদ্দীপ্ত হচ্ছি। এবং ভেতর থেকে আপনাকে সামনাসামনি দেখার, বাস্তবে কথা বলার, কাছাকাছি থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাওয়ার আগ্রহটা আরও প্রবল হয়েছে! আজ আপনাকে এতো কাছে থেকে দেখতে পেয়ে, কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।’
নাহ! আমার ধারণা ও আশা বাস্তবায়িত হলো না! হুজুর মসজিদে প্রবেশ করলেন না। হাঁটতে লাগলেন রাস্তার দিকে। রাস্তার সাথে গেটের পশ্চিম পাশে অস্থায়ী সীরাত স্মারক স্টোর। হুজুর কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ালেন এখানে। স্মারকে হাত বুলিয়ে কতৃপক্ষকে বললেন, ‘ঠিক আছে চলে যাচ্ছি,দোয়া করো সবাই।’
তাঁর বিদায়ী কথাটা যেন আমার দিলকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছিলো! হুজুরের বিরহে ব্যথিত দিলকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলাম না কোন মতেই। চলে যাচ্ছি বলেও হুজুর কার জন্য যেন আরেকটু দাঁড়ালেন। আমার কাছে মনে হলো আমার আগ্রহী দিলের না বলা সেই কথাগুলো শুনার জন্য হয়তো দাঁড়িয়েছেন।আমি যেন আরেকটু সুযোগ পেলাম। আরেকটু কাছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম, হুজুর ঢাকা থেকে কখন এসেছেন?
আমার ভিতরে একরকম ধুকপুকানি কাজ করছে। আসলে আমি শুধু শুধু ভয় করছি। তাঁর মাঝে ভয় করার মতো কিছুই নেই,নেই কোন গাম্ভীর্যের ছাপ। নূরানী চেহারার হাসিমাখা মুখে জবাব দিলেন, এইতো গত রাতে এসেছি।
অমি বললম, আজই ঢাকায় ফেরত যাবেন না দু একদিন থাকবেন এখানে ?
তিনি বললেন, না, আজ বিকালেই রওয়ানা হবো।
ভাবলাম মুখ ফুটেছে যখন, হৃদয়ের আড়ষ্টতা, ধুকপুকানি কমেছে যখন, হয়তো মনের কথাগুলো বলতে পারবো এখন। হৃদয়ে জমে থাকা ব্যথাগুলো হালকা করতে পারবো কিছুটা! না, হলো না। আমি ব্যর্থ হলাম! মনের কথাগুলো হৃদয়গহীনেই জমে থাকলো। প্রকাশ করতে পারলাম না হুজুরের সামনে। মুখ থেকে আর কোন কথা আসলো না শুধু এই একটি বাক্য ছাড়া, ‘দোয়া করবেন হুজুর!’
হুজুর ‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে পা বাড়ালেন রাস্তার দিকে। আমরা আরেকবার মুসাফাহার কাজটা সেরে নিলাম; বিদায়ী মুসাফাহা, আশীর্বাদী মুসাফাহা। গভীর মনোযোগে বিড়বিড় করে পাঠ করলাম মুসাফাহার দোয়া; যেমনটা বড়দের সাথে মুসাফাহা করার ক্ষেত্রে আমার সবসময় হয়ে থাকে। ভেতরটা একেবারে ছোট সংকোচিত হয়ে আসে। ভেতর থেকে অনুভব হলো আল্লাহ গফুরুর রাহিম যেন এখনই সগীরা গোনাহগুলো মাফ করে দিলেন।
হুজুর হাঁটছেন, গুটিগুটি কদম ফেলছেন রাস্তার দিকে। আমরা তাকিয়ে আছি হুজুরের দিকে চোখ ‘সরেনা’ দৃষ্টিতে; যেন হুজুরের চলার পদক্ষেপ গণণা করছি দুই দুই চারটি চোখে। আর মনের কোণে বারবার উঁকি দিচ্ছে সেই না বলা কথা। হৃদয়পিঠে চিনচিন করে অনুভূত হচ্ছ বলতে না পারার হাজারো ব্যথা। এতো কাছে থেকেও বলতে পারলাম না আমার ভিতরে জমানো কথা! আর কি পাবো কখনো এমন সুযোগ?বলতে পারবো মনের কথাগুলো?! যেন আবার সুযোগ আসে, বারবার আসে! যেন প্রাণখুলে বলতে পারি হৃদয়ের সব জমানো কথা! প্রশমিত হয় এই ব্যথিত মনের কথাগুলো বলতে না পারার ব্যথা!
