
রাকিবুল হাসান নাঈম:
দীর্ঘ নাটকিয়তা এবং অপেক্ষার পর খুলে দেয়া হলো দখিনের দুয়ার। মহা আড়ম্বরে উদ্বোধন হয়ে গেলো পদ্মাসেতুর। ইতোমধ্যে জনসাধারণের জন্যও উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে সেতুটি। এর মধ্যে দিয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত হয়ে গেলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা। আগে যে পথ ফেরির মাধ্যমে পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেতো, এখন সেটি পার হওয়া যাবে মাত্র সাত মিনিটে। ২১টি জেলা হলো- খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী।
পদ্মা সেতু প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, সেতু নির্মাণে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, ৩৫ বছরে সুদসহ ৩৬ হাজার কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণের অর্থ বার্ষিক ১ শতাংশ হারে সুদসহ ৩৫ বছরে ১৪০ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। নকশা প্রণয়নের সময় নেওয়া ২১১ কোটি টাকার বিপরীতে পরিশোধ করতে হবে ৩৪০ কোটি টাকা। লোন রিপেমেন্ট শিডিউল অনুযায়ী প্রথম বছরেই ৫৯৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আবার কোনও কোনও বছর পরিশোধ করতে হবে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা পর্যন্ত।
পদ্মাসেতুর উদ্বোধনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ইসলামপন্থীদের মাঝে। যদিও সমাাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্লাসটাই বেশি দেখা গেছে। উল্লাসের সবচে বড় কারণ—এই সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার অবসান। পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ কাড়বে, গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা। এ সেতু দিয়ে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে এশিয়ান হাইওয়েতে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘোরার পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান।
ইসলামপন্থীদের প্রশংসা
গতকাল সামাজিক যোগযোগমাধ্যম জুড়ে ইসলামপন্থীদের যারাই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, অধিকাংশই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের উচ্ছ্বাসের মূল জায়গা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে। জামাতে ইসলামের আমির ড. শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘যুগ-যুগ ধরে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে যাতায়াত ও যোগাযোগে সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে আসছিলেন। এমনকি মাঝে-মধ্যে ঢাকার উদ্দেশ্যে জরুরী চিকিৎসা নিতে আসা লোকদের কারো কারো মৃত্যু ফেরীঘাটেই হয়েছে। চিন্তা করলে যা খুবই হৃদয় বিদারক। আজ তাদের সে কষ্টের অনেকখানিই অবসান হলো। মহান রবের দরবারে এজন্য শুকরিয়া আদায় করছি, আলহামদুলিল্লাহ।’
তবে তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন, যেন যানবাহনে উচ্চ হারের টোল যেন তাদের পুনর্বিবেচনায় স্থান পায়।
প্রশংসা না করলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিখ্যাত বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। তিনি লিখেছেন, ‘ফেরি পারাপারের ভোগান্তি দূর হোক। যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্মোচিত হোক এক অপার সম্ভাবনার দিগন্ত। অর্থনীতিতে যোগ হোক নতুন মাত্রা।’
যোগাযোগ ব্যবস্থার যন্ত্রণার কথা লাঘবের জন্য শুকরিয়া আদায় করেছেন বিশিষ্ট দাঈ ও সমাজসেবক শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি লিখেছেন, ‘পদ্মা সেতু আমাদের সম্পদ, দেশের অমূল্য সম্পদ। ফেরিঘাটে যে কত শত ঘন্টা অপেক্ষার যন্ত্রণা সয়েছি— তার কোনো হিসেব নেই। গর্ব কিংবা অহংকার নয়, আল্লাহর নিকট অসংখ্য শুকরিয়া জানাই।’
বিখ্যাত ওয়ায়েজ মাওলানা আবদুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ লিখেছেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ সংশিষ্ট সবাইকে আল্লাহ তায়ালা উত্তম বিনিময় দান করুন। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাত আর বর্ষার উত্তাল পদ্মা পারাপারের দুর্বিষহ স্মৃতি যাদের আছে তারাই উপলব্ধি করবেন পদ্মা সেতু কতটা আনন্দের!’
বিখ্যাত ওয়ায়েজ মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহ বলেছেন, ‘দলমতের উর্ধ্বে গিয়ে আমার মন্তব্য— পদ্মাসেতু দক্ষিণ জনপদের জন্য বিশাল এক নেয়ামত। এই জনপদে বসবাসকারী আমরা। আমরা জানি এই সেতু আমাদের জন্য কতটা স্বস্তির। পদ্মাসেতু নিয়ে দেশীয় প্রত্যেকেই বড়াই করতে পারে। কারণ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের এক টাকা হলেও এই সেতুতে আছে। অতএব, পদ্মাসেতু রুপায়নে আমিও মালিকানার গর্বিত অংশীদার এবং আপনিও, আমরা সবাই। বাকি পদ্মাসেতু সংশ্লিষ্ট পারিপার্শ্বিক আলোচনা তথা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাচা-গানা নিয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য করছি না। শুধু এতটুকু বলি, ভাত গরম। বিলাই বেজার হয়ে যাবে।’ তিনিও টোল কমানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার দক্ষিণবঙ্গের গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, পিরোজপুর, বরিশালের পাঁচ সহস্রাধিক আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, ইমাম-খতিব, মাদ্রাসার মুহতামিম ও তালেবুল ইলমসহ ধর্মপ্রিয় মানুষ গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় জমায়েত হন। এ সময় উপস্থিত সকলে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে মোনাজাত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের মুফতি রুহুল আমিনের সন্তান মাওলানা উসামা আমিন বলেছেন, ‘পদ্মা সেতুর জন্য দেশের আলেম-ওলামাদের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। পদ্মা সেতু ঘোষণার শুরু থেকেই আলেম-ওলামাদের দোয়া, ভোররাতের চোখের পানি ও সহযোগিতা ছিল। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া বহু বাধা-বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলো।’
ইসলামপন্থীদের সমালোচনা
পদ্মা সেতুকে ঘিরে শুধু উচ্ছ্বাস নয়, সঙ্গে কিছু বিষয়ে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন আলেম লেখক ও সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। ফাতেহকে তিনি বলেন:
পদ্মা সেতু দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগের জন্য এই সেতু দরকার ছিলো। কিন্তু এই সেতুকে ঘিরে যে হৈচৈ চলছে, তার প্রেক্ষিতে তিনটি কথা বলতে চাই।
এক. এই পদ্মাসেতু করার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। ব্যয়বহুল এই সেতুটি করার জন্য আগের অনেক রাজনৈতিক দলই পরিকল্পনা করেছে, কিন্তু সাহস করতে পারেনি। আ.লীগ সাহস করেছে। কিন্তু সেতুর কাজের শুরুতেই দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক সরে গেছে। শুধু এটাই না। পরেও আরও অনেক খরচ বেড়ে গেছে প্রকল্পের। সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এইযে অভিযোগ, এটা খতিয়ে দেখতে হবে। খতিয়ে দেখাটা দেশের জন্য আবশ্যক।
দুই. এই সেতুর নির্মাণে একটি রাজনৈতিক দল যেভাবে নিজেদেরকে ফলাও করছে, কেমন যেন তারা তাদের আগের সব অবৈধ কর্মকে এটা দিয়ে বৈধ করছে। সামনেও এটা দিয়ে বৈধতা চালানোর চেষ্টা করবে। এটা নিয়ে আমি শঙ্কিত।
তিন. বিভিন্ন দেশ এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ঋণের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা তার প্রমাণ। বাংলাদেশ যেভাবে একের পর এক ঋণ করে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এটা নিয়েও আমি শঙ্কিত। এই এক পদ্মা সেতু করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সব জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। মেগা প্রকল্পের জন্য সরকার যে বিশাল বাজেট রাখছে, জনগণের জীবনমান উন্মনয়নের জন্য তা রাখা হচ্ছে না। দিনশেষে ভোগান্তি পোহাচ্ছে জনগণ। আমি বলছি না পদ্মা সেতুর দরকার নেই। পদ্মা সেতুর দরকার আছে। কিন্তু এ বিষয়গুলোর দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
পদ্মা সেতু দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা সহজ করেছে। কিন্তু জীবন কী সহজ করেছে? তরুণ চিন্তক আলেম ও লেখক মনযূরুল হক বলেন, ‘পদ্মা সেতু না হলেও বাড়ি যেতাম, হয়েছে এখনও যাব। সেতু হয়েছে বলে জীবন খুব উন্নত হয়েছে, তা যেন কেউ ধারনা না করে। ২০১৩ সালে কর্মজীবি হিসেবে ঢুকলাম। এর মধ্যে দেশে ফ্লাইওভারের বন্যা বয়ে গেলো, মেট্রোরেলের অদৃশ্য ঝিকিঝিকি বাজতে থাকল, বিদ্যুতে ছেয়ে গেলো বাড়ির কাঠের ঘরটা পর্যন্ত। কিন্তু জীবনের উন্নয়নের কোনও নাগাল পেলাম না। বিয়ে করলাম, দুটি ছেলে হলো, বাবা রিটায়ারমেন্টে গেলেন। সংসার বাড়ল বেতন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু খরচের দৌড়ে সংসার পিছে পড়ে রইল সেই আগের চেয়েও পেছনে। ১৩ সালে যেই বেতন পেতাম, এই ৯ বছরে তা বেড়েছে ৪ গুণের বেশি। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম কোনওটার বেড়েছে, ৬ গুণ, কোনওটার ১০ গুণ। ৫ কেজি পেঁয়াজ ১ হাজার টাকায়ও কিনে খাওয়া লাগল। তেলের কথা বাদ। ট্যাক্সের টাকা দিয়ে সেতু হলো, আবার সেইটা পুরানোর জন্যে বেশি ভাড়া দিয়ে, টোল দিয়ে শোধ দিতে হবে। আগামী কয়েক যুগে সেই ঋণের শোধন দিতে দিতে দেশে আরও অনেক উন্নয়ন হবে। আমার আয় যখন এখনের আরও ৩ গুণ বাড়বে, তত দিনে জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে ৬ গুণ।’
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পদ্মা সেতুর উৎসব, উত্তরাঞ্চলে বন্যা। রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের চোখ একয়দিন বন্যার দিক থেকে বেশি ছিল পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আয়োজনের দিকে। কিন্তু আলেমগণ উৎসবে না গিয়ে ব্যস্ত আছেন বন্যার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার কাজে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম তারা চষে বেড়াচ্ছেন বন্যার্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে। মানুষই যে সবচে বড়, সবচে মহান, এই কথাটুকু এবার সত্যি করে তুলছেন আলেমগণ।
