রেকর্ড মূদ্রাস্ফীতি : ঝুঁকিতে ইসলামি প্রকাশনাগুলো

রাকিবুল হাসান নাঈম:

দেশে কয়েকদিন আগে মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড ভেঙেছে। তার প্রভাব পড়েছে বাজারের প্রতিটি পণ্যে। উর্ধ্বমূল্যের এই বাজারে এবার বেশ ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের ইসলামি প্রকাশনাগুলোও। প্রকাশকরা বলছেন, কাগজের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ইসলামি প্রকাশনা বই ছাপা বন্ধ করে দেয়ার কথা ভাবছে। যারা ঝুঁকি নিয়ে অর্থ লগ্নি করে বই প্রকাশ করছেন, পাঠকের নাগালে বইয়ের দাম রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

কাগজের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ

ইসলামি প্রকাশনা ঝুঁকির মুখে পড়ার সবচে বড় কারণ—কাগজের দাম বেড়ে যাওয়া। কাগজের দাম হুট করেই বেড়ে গেছে এমন না। বরং এটা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দেশজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাজারে যেমন আগুন জ্বলছে, তেমনি সর্বশেষ স্লটে বাড়ানো হয়েছে অতিরিক্ত দাম। যেটা বহন করে বই প্রকাশ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব না।

এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ পাবলিকেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ খান ফাতেহকে বলেন, ‘বর্তমান ইসলামি প্রকাশনাগুলো নিতান্তই নাজুক অবস্থায় আছে৷ বেশ কয়েকজন প্রকাশক বই আনবেন না বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। কী আর করা! কাগজ, প্রেস, বাঁধাইখানা সব জায়গাতে দাম বেড়েছে। আমি উমাইয়া খেলাফতের ৮০ গ্রাম অফসেট কাগজ কিনতাম ১৬০০ টাকা করে। এখন সেটা ৩০০০ টাকা। পুরো ডবল বেড়ে গেছে। এদিকে ধর্মঘট করে দাম বাড়িয়েছে বাঁধাইখানার মালিকরা।’

নাশাত পাবলিকেশনের কর্ণধার মাওলানা আহসান ইলয়াস ফাতেহকে বলেন, ‘কাগজের দাম বেড়েছে অনেক। যে কাগজটা আমি কিনতাম ১৪০০ টাকা করে, সেটা সেদিন কিনলাম ২৫০০ টাকা করে।’

ইত্তেহাদ প্রকাশনীর কর্ণধার মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘গত ৫-৬ মাসের হিসাব ধরলে কাগজের দাম বেড়েছে ৬০% থেকে ৭০%। গত দেড় বছরের হিসাব ধরলে হবে দ্বিগুণ। মানে কাগজের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।’

ইতোমধ্যে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন এক বিবৃতিতে নতুন বই প্রকাশ না করার কথা জানিয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেছে, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট সকল উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স নতুন বই প্রকাশের সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করছে। পুরাতন সকল বই এবং ইতোমধ্যে ছাপাখানায় প্রকাশের অপেক্ষমান থাকা বইগুলো যথারীতি প্রকাশ হবে।

নতুন বইয়ের দাম বাড়ছে

কাগজের উর্ধ্বমূল্যের এই বাজারে যারা নতুন বই আনছেন, দাম ম্যানেজ করতে তারা নতুন করে ভাবছেন। পাঠকদের দিকে তাকিয়ে দাম বাড়ানো যায় না, আবার বাজারের দিকে তাকালে দাম না বাড়িয়েও পারা যায় না। তবে সমন্বয় করে দাম রাখার কথা বলছেন সবাই।

রাহনুমা প্রকাশনী সম্প্রতি তাফসিরে উসমানির অনুবাদ প্রকাশ করেছে। ৩ খণ্ডের বিশাল এই তাফসিরটি প্রি-অর্ডার মূল্য রাখা হচ্ছে তিন হাজার টাকা। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, কাগজের দাম, ছাপা ও বাঁধাইয়ের দাম বেড়ে যাবার কারণে দামটা একটু বেশিই রাখতে হয়েছে। নয়ত সাধারণ বাজারে বইটির দাম আরও কম হতো।

সম্প্রতি ‘অগ্রন্থিত আল মাহমুদ’ নামে নতুন একটি বই বাজারে এনেছে নাশাত পাবলিকেশন। দামটা কিভাবে নির্ধারণ করেছেন জানতে চাইলে কর্ণধার আহসান ইলিয়াস বলেন, ‘দাম বাড়ার কারণে অনেকে বই না ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি নেইনি। তবে স্বীকার করতেই হবে, কাগজের বাজারে দামবৃদ্ধি নতুন বইয়ের দামেও প্রভাব ফেলবে। আমি মূলত দাম না বাড়ানোর ট্রাই করি। আগে যে মূল্যে বইটি পেতো পাঠক, এখন সে দামেই পাবে। দাম বাড়ার কারণে যে খরচ বেড়েছে, সেটা নিজের পকেট থেকে দিচ্ছি।’

ইত্তেহাদের কর্ণধার মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘কাগজের দাম ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। রমজানে যে বইগুলো আমরা প্রকাশ করেছি, তখন যদি কাগজের দাম ২৫-৩০% বেড়ে থাকে, আমরা বইয়ের দাম বাড়িয়েছি ১০%। এভাবেই ম্যানেজ করতে হয়। দাম না বাড়িয়ে আমরা পারি না। আমরা ভাবছি, বই আমব বাজারে৷ দামটা সেভাবেই নির্ধারণ হবে। একটু তো বাড়বেই।

বই বিক্রি কমেছে

দেশে মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। ফলে মানুষ সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। কমেছে শখের বই কেনার আগ্রহ। এমনই মনে করছেন মুহাম্মদ পাবলিকেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদের বই সাধারণত প্রথমেই কয়েক মুদ্রণ চলে যায়। কিন্তু এত চড়া মূল্যে কাগজ কিনে ‘চার খলিফার ইতিহাস’ বইটি বাজারে আনলাম ঈদের আগে। এখনও বইটির প্রথম মুদ্রণের সিংহভাগই রয়ে গেছে।’

এই প্রকাশক আরও বলেন, ‘বইটি প্রকাশ করতে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এমন আরেকটি বই যদি বের করি, তখনও আটকে থাকবে বই। দুইটা বইয়ে যদি ১৫ লাখ টাকা লগ্নি করে বসে থাকতে হয়, বই বিক্রি না হয়, তাহলে কতদিন এভাবে বসে থাকা যাবে। অফিসের খরচাদি প্রতিমাসে ২ লাখ টাকার উপর। স্টাফদের বেতন আছে। বই বিক্রি না হলে এসব আসবে কীভাবে?’

সূত্রের মারফত জানা গেছে, বাংলাবাজারের ইসলামি প্রকাশনীগুলো এখন ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কয়েকটি প্রকাশনী তাদের কর্মীদের ছাটাই করেছে। বাকি থাকছে বেতন-ভাতা। অনেক প্রকাশক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কাগজের দাম না কমলে আর বই বের করবেন না। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বিকল্প কোনো ব্যবসায় মন দিবেন।

আগের সংবাদমুসলিম সভ্যতা নির্মাণ: কালোদের ভূমিকার অনুসন্ধান
পরবর্তি সংবাদ‘শুভংকরের ফাঁকি’ : বিতর্কের মুখে ইসলামি ব্যাংকিং