গুজব : তথ্যের শূন্যস্থান

শরীফ মুহাম্মদ:

গুজব। এ শব্দটি বা বিষয়টি এখন বহুল আলোচিত। বিশেষ করে দেশে কোনো সঙ্কটপূর্ণ, আন্দোলন বা উত্তেজনাপূর্ণ সময় এলে এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শেষের দিকে এ শব্দটি খুব আলোচিত হয়েছে।

গুজব  অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় ক্ষতিকর ব্যাপার। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে তথ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় বা মানুষ মনে করতে থাকে যে, সব কথা প্রকাশ্যে আসছে না, তখনই সন্দেহ সৃষ্টি হয় ও গুজব ছড়াতে থাকে। এ জন্য গুজব  বন্ধ করার একটি বড় উপায় হচ্ছে তথ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ চলতে দেওয়া। কারণ, গুজব তথ্যের শূন্যস্থান পূরণ করে।

আমরা দেখেছি, ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে গুজব শব্দটি সামনে এসেছে। তখন সরকারি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঝিগাতলার হত্যা ও চোখ উপড়ে ফেলার বিষটি প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে সব ঘটনাকেই গুজব বলেছে। বলা হয়েছে, কিছুই ঘটেনি। অথচ সেখানে অনেক ধরণের হতাহতের সংবাদ মূল ধারার গণমাধ্যমেও চলে এসেছে। তখনও বলা হচ্ছিল এসব গুজব। ফলে গুজবকে প্রতিরোধের জন্য বা গুজব সঙ্কটকে মোকাবেলার জন্য যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলো শেষ পর্যন্ত গুজবে পরিণত হয়েছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থাও যদি গুজবের মতো হয়ে যায়, তাহলে এ সঙ্কট আরও বাড়তে থাকে।এজন্য গুজব প্রতিরোধের সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো সত্য ঘটনা সামনে আনা।

আরেকটি বিষয় হলো, গুজব বলে অনেক সময় সঠিক তথ্যকেও চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে যখন কেউ  কাজ করে বা রাস্তায় থাকে, তখন তাদের পক্ষেও নানা রকম গুজব ছড়াতে থাকে। গুজবের শিকার হলে উভয়েই এর শিকার হয়। এজন্য  এসব গুজবের ভিডিও অডিও যখন প্রকাশ হতে থাকে, তখন একে গুজব বলে আর থামানো যায় না। তখন গুজবটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন বলা যায়, যারা তথ্যের কোনো একটি অংশকে গুজব বলেছে তারাই এ গুজবকে প্রতিষ্ঠিত বা চালু করার ক্ষেত্রে বড় রকমের ভূমিকা রেখেছে। এটা অনেকটা মিথ্যাবাদী রাখালের মতো। যে বলছে, বাঘ আসছে, বাঘ আসছে। এরপর যখন আসলেই বাঘ চলে আসলো, তখন মানুষ আর তার কথা বিশ্বাস করে না।

এজন্য মানুষকে গুজব থেকে বিরত রাখা বা গুজবকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যাদের হাতে আছে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে গুজব কথাটাকে ততোটুকুই বলা, যতোটুকু বললে সত্যটুকু স্বীকার করা হয়। যদি সমস্ত ঘটনাকেই গুজব বলা হয় আর এর অভিও ভিডিও কোন প্রামাণ্য মানুষের সামনে থাকে,তখন মানুষ কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা এর যাচাই করতে পারে না। তখন সবটাকেই মানুষ সত্য মনে করে।

এজন্য গত ৪,৫ ও ৬ তারিখের ছাত্র আন্দোলনের সময় যে গুজবগুলো সামনে এসেছে, তার দায়ভার যদি যারা গুজব ছড়িয়েছে শুধু তাদেরকে দেওয়া হয় তাহলে ভুল হবে। বরং যারা এটাকে গুজব বলেছে, তাদেরও পুরো বিষয়টাকে ভাগ ভাগ করে এ অংশটা গুজব, বাকি কিছু ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, এভাবে বলা দরকার ছিল। এটা না বলাটাও গুজব নামক বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

শেষ কথা হচ্ছে, সঙ্কটকালে মিডিয়ার সাধারণ তথ্য প্রবাহ অবাধে এবং যে কোনো ধরণের সেন্সরশীপ থেকে মুক্তভাবে চলতে দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হলে গুজব বন্ধ করা কঠিন হবে। কারণ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ সুযোগ সুবিধার সময়। নানা ধরণের তথ্য সংগ্রহের একটি কৌতূহল মানুষের মাঝে কাজ করতেই থাকে। ফলে যে তথ্যটাই আসুক, সেটা অপতথ্য হোক বা গুজব জাতীয় কিছু হোক, মানুষ সেটাকেই প্রথমে লুফে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং অনেকে বিভ্রান্ত হতেও থাকে।

আর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যদি কোনো কিছুকে গুজব বলা হয়, তাহলে সেটা যেন নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করে বলা হয় যে, ওই অংশটা গুজব। তারা যদি পুরো ঘটনাকেই গুজব বলে, তাহলে যেহেতু ঘটনাগুলোর বড় একটি অংশের অনেক প্রামাণ্য মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে, তাই মানুষ প্রচারিত সব তথ্য বা গুজবকেই সত্য মনে করতে থাকবে। এখানে যারা প্রভাবিত হয়, তাদের দায়টা বড় নয়।

শ্রুতিলিখন: ওমর ফারুক

আগের সংবাদতেল মওজুদের দিক দিয়ে বিশ্বের ৬ষ্ঠ দেশ হতে যাচ্ছে পাকিস্তান!
পরবর্তি সংবাদইরানের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞায় ‘গভীর হতাশা’ রাশিয়ার