পটিয়ার মাদরাসাগুলোতে জাতীয় সঙ্গীতের নির্দেশনা : আইন পরিপন্থি ও বাড়াবাড়ি বললেন আল হাইয়ার নেতৃবৃন্দ

ওমর ফারুক :

চট্টগ্রামের পটিয়ার সাতটি কওমি মাদরাসায় উপজেলা প্রশাসন থেকে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া ও অ্যাসেম্বলির ব্যবস্থা গ্রহণসহ যে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটি কওমি স্বীকৃতির আইন পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছে আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া। একে প্রশাসনের বাড়াবাড়ি বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।

বোর্ডের একাধিক নেতৃবৃন্দ ফাতেহ২৪ জানিয়েছেন তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি বিষয়ে যে আইন করা হয়েছে তা এ নির্দেশনা বিরোধী। আল হাইয়াতুল উলইয়ার নেতৃবৃন্দ পটিয়ার বোর্ড ও মাদরাসাগুলোকে বিষয়টি দ্রুত আল হাইয়াতুল উলইয়ার কাছে লিখিতভাবে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

পটিয়া উপজেলা প্রশাসনের জারিকৃত নির্দেশনা বিষয়ে আল হাইয়াতুল উলইয়ার কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। আমাদের কাছে এসব বিষয়ে অভিযোগ আসলে আমরা সরকারের সঙ্গে কথা বলবো।

আল হাইয়াতুল উলইয়ার  সদস্য ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সহসভাপতি মুফতী মো: ওয়াক্কাস বলেন, আমার মনে হয় বিষয়টি বোগাস ও প্রশাসনের বাড়াবাড়ি। কওমি গেজেটে কোথাও লেখা নেই সরকার কওমি মাদরাসাগুলোর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে। এসব বিষয়ে তাদের কাছে নির্দেশনা গেলে আল হাইয়াতুল উলইয়াকে  জানোনো উচিত। পটিয়া মাদরাসাও ছোট মাদরাসা নয়। তারা কেন এখনো বিষয়টি জানায়নি।

‘এটা জানানো তাদের দায়িত্ব। কওমি স্বীকৃতি আইনে কোথাও লেখা নেই কওমি মাদরাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে কিংবা জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে। এটি কওমী স্বীকৃতির আইন পরিপন্থি।’

এ বিষয়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সদস্য ও জামিয়া শায়েখ যাকারিয়া মাদরাসার পরিচালক মুফতি মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না আমার কাছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন থেকে নির্দেশনা দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণও আমরা দেখছি না। কারণ, আমাদের হাইয়াতুল উলইয়ার সঙ্গে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতর জড়িত। সেখানে এমন কোনো চুক্তি আমাদের স্বীকৃতির মধ্যে নেই। এমন অনাকাঙ্খিত কাজ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিবে বলে আমি মনে করি না। সেখানে আলোচনাও হয়েছে এসব বিষয়ে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। আমাদের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকবে ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন নিবেদনও থাকবে না।

এ নির্দেশনার সঙ্গে কি কওমি স্বীকৃতির বিষয়টি জড়িত রয়েছে, এ বিষয়ে তিনি বলেন, হ্যাঁ জড়িত। থাকতে পারে। কওমি মাদরাসার শিক্ষানীতি ও আইন আলাদা। এসব প্রতিষ্ঠানে যেমন তেমন কিছু চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে সরকারের আছে বলে মনে হয় না। এবং করবে তাও আমি বিশ্বাস করি না। পটিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও আল হাইয়াতুল উলয়ার অন্যতম সদস্য মাওলানা আব্দুল হালিম বোখারি এটি গ্রহণ না করলে বাস্তবায়ন করাও সম্ভব না বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

উল্লেখ্য, গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার বরাত দিয়ে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সকল কওমি মাদরাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত পাঠ, অ্যাসেম্বলী করাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠের এক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হাবিবুল হাসান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি সরকারি নির্দেশনামা উপজেলার ৭টি কওমি মাদরাসায় পাঠানাে হয়।

নির্দেশনামায় উলে­খ রয়েছে। ১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন (বন্ধ ব্যতীত) জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২) জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩) প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের অ্যাসেম্বলির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ৪) শ্রেণি কক্ষে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানাের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নির্দেশনামায় এসব নির্দেশানাবলি যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তাও কার্যালয়কে জানাতে অনুরােধ করা হয়।

এরআগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘কওমি মাদ্রাসা সমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীনে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল ২০১৮ জাতীয় সংসদে পাস হয়। কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিসমূহকে ভিত্তি ধরেই এ স্বীকৃতির আইন হয়। তবে হঠাৎ করে জাতীয় সঙ্গীত ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিষয়ক নির্দেশনা কওমি অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।