আজন্ম সলজ্জ সাধ (১)

কাজী মাহবুবুর রহমান

জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ায় থাকাকালীন আমাদের ভিক্ষাবৃত্তির কথা তো আপনাদেরকে বলছিই। আমি আর কাজী তাপস মহামতি গৌতম বুদ্ধের যেই মহান আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নেমেছিলাম, একপর্যায়ে নানান উত্তাপের মুখে তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। এরপর কিছুদিন অবসর ছিলাম। বেকার-দিনে একান্ত কিছু করার না থাকলে আমরা সাহিত্য করতাম। কাজী তাপসের তখন পরীক্ষার চাপ। মুহাম্মদপুর স্টেট কলেজের পিছনে যেই বেঙ্গলি মিডিয়াম স্কুলটা ছিল, ওইটাতে সম্ভবত ওদের রেজিস্ট্রেশন করা হইছিল। আমি বড়লোক মানুষ। সরকারি পরীক্ষার ঝামেলায় কখনো যাওয়া হয় নাই।

যাই হোক, অবসরে সাহিত্যচর্চা করতেছিলাম। এই এক জিনিস আর কয়দিন ভাল্লাগে! তাপস আমাদের রুমে আসা কমায়া দিল। মানজুর মাঝেমইধ্যে আইসা উঁকি দেয়। হুজাইফা ভাইর লগে দেখা হয় দিনে একবার। এশার নামাজের পর তিনি লাইব্রেরিতে বসতেন। সব দিন এশারের পরের সুন্নত দুই রাকাত পড়তেন কিনা এই বিতর্কে না যাই।

আমাদের ক্লাসের সবাই পড়াশুনা করে। আমারে টাইম দেওয়ার মতো কেউ নাই। তবু করুণা করে মাঝেমধ্যে শামসু আমারে কিছু টাইম দিত। আর দিত শায়েখ আহমদ। কিছু দিন পর এই শালাও আদনান ইবরাহিম, এডওয়ার্ড সাইদ আর খলিল জিবরানদের নিয়া ব্যস্ত হয়া গেল। ওর আবার নানান কেরদানি ছিল। আমি কইতাম, কাহলিল জিবরান। বইপত্রে এমনই লেখা। বড় হয়া জানলাম, আরবি উচ্চারণ হবে খলিল জিবরান। আরও বড় হয়া আহমদের লগে আলাপ করার পর জানলাম, শব্দটা জিবরান না হয়া জুবরান হবে। উদাহরণ হিসেবে ও ‘আর রাইদ’ অভিধানের (জীবনেও পড়ি নাই, খালি দেখছিলাম) লেখক জুবরান মাসউদের নাম বলল। আহমদ যখন এইগুলা নিয়া ব্যস্ত হয়া পড়ল, তখন আমি আরও একলা হয়া গেলাম। তখন শুরু হইল এশার নামাজের পর ছাদে আড্ডা মারার দিন। সাহিত্যফাহিত্য হইলে হালকা পাত্তা পাইতাম, কিন্তু খেলাধুলার আলাপে গেলে আর সুবিধা করতে পারতাম না। আল আমিন করত বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। হাম্মাদ, উসামা, নাদিম আর ছোট আহমদ ওরা করত বার্সেলোনা। আমি একলা গরিব মাইনষের মতো রিয়াল মাদ্রিদ করি। তাও রেগুলার খেলা দেখি না বইলা জোরেশোরে কিছু বলতেও পারি না।

এমন দুর্দশার দিনে নতুন প্রকল্প হাতে নিলাম। সেই প্রকল্পে ভিক্ষাবৃত্তির মত লাঞ্ছনা নাই। ক্লান্তি নাই। মানুষের হাতে-পায়ে ধরা নাই। আছে প্রচুর রোমান্টিসিজম আর কম্পিটিশন। প্রকল্পটা হইল, কাগজের বিমান বানাইয়া মাদ্রাসার ছাদ থেকে উড়ায়া দেওয়া। সামনের দিকে ফেললে হুজুরদের মাথায় পড়তে পারে। উত্তরদিকে খৃস্টানদের কবরস্থান। ওইদিকে ফেললে কাগজের বিমানকে তারা তালেবান-হামলা ভেবে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার দায়ে মামলা দিয়া বসবেন। দক্ষিণের এক ব্যাটা আমাদের সমান উঁচু বিল্ডিং উঠায়া বসছে। বিমান ফেলার জো নাই। সবশেষ একটা দিকই খোলা আছে, সেইটা হইল পূর্বদিক। সেইদিকে টিনশেড বস্তি। বস্তির বুড়া খালা অত্যন্ত প্রতাপশালী গলার অধিকারী। তার ধমকে সুদূর তিনতলা থেকেও আমাদের শফিউদ্দিন সাব একদিন হিদায়া শরিফের ক্লাসে থমকে গিয়ে নিচু গলায় বলেছিলেন, কে ধমক দেয়!

এইদিকে বিমান ফেলতে হইলে অনেক প্রফেশনাল হইতে হবে। কোনরকম দুর্বলতা করা যাবে না। বস্তির ওই পাশেই ছিল ঝিল। বদ পোলাপান আদর কইরা কৃষ্ণনদ ডাকত। সেই নদীর উপর ছোট ছোট তিনটা ব্রিজ ছিল। একটা ব্রিজে রাতের বেলা লাল এবং নীল বাতি জ্বলত। ওইদিকে তাকায়া তখন আমাদের গরিবের বিদেশ টাইপ ফিল আসত। শেষমেশ এইটাই কথা হইল, বিমান আমরা এইদিকেই ফেলব, তবে খালার বস্তি অতিক্রম করে বিমান ফেলব ডিরেক্ট ঝিলের পানিতে।

আমি তুমুল উদ্যমে বিমান মারা শুরু করলাম। কোনো কোনো বিমান একটা নিবিড় আর্টিস্টিক ফিল নিয়া বাতাসের ঢেউয়ে ঢেউয়ে সাতার কাটতে কাটতে পরম মমতায় ঝিলের পানি স্পর্শ করত। আমি আবেগপ্রবণ মানুষ। নিজের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তখন আমার বুক হু হু করত। নিজেকে তখন মনে হত শামসুর রাহমান—আমার সৃষ্টি আজ উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়…

লেখক : গল্পকার

আগের সংবাদ‘মুমিন বিল্লাহ’ হওয়ার তিন শর্ত
পরবর্তি সংবাদতারাদের পথ ।। মাজিদা রিফা