আসফাক: কবি ও শহীদ

মনযূরুল হক

আসফাকের কথা মনে আছে? তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভারতীয় মুসলিম, যাকে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিযোগে ফাঁসি দেয়া হয়।

তিনি কিন্তু ভালো উর্দু কবিতাও লিখতেন ‘ওয়ার্সি’ এবং ‘হযরত’ ছদ্মনামে । এবং এই সূত্রেই ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে শাহজাহানপুরে সভায় পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে পরিচিত হন, পরে তা বন্ধুতায় গড়ায় । মাঝেমধ্যে তিনি কবিতা লিখে বিসমিলকে দেখাতেন, বিসমিল তা সংশোধন করতেন। এভাবেই দুই কবির কবিতা এতোই পরিচিতি পায় যে, তাদের কবিতা ছাড়া ব্রিটিশ বিরোধী কনফারেন্স জমতোই না। আর দু’জনের ফাঁসিও হয় একই কারণে।

তিনি বুঝেছিলেন—অহিংসার নরম কথায় স্বাধীনতা আসবে না। তাই বিপ্লবের পথ ধরে প্রথমে বিখ্যাত কাকোরি ট্রেন ডাকাতিতে সম্পৃক্ত হন। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সরকারি অর্থ লুট করার এবং সেই টাকা সেই সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার যারা ভারতকে ৩০০ বছরের অধিককাল ধরে প্রতিনিয়ত লুট করছে।

ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের সাহস দেখে অবাক হয়েছিলো। ভাইসরয় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে নিয়োগ করে মামলাটি তদন্ত করার জন্যে। ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২৫ তারিখ সকালবেলা একই সাথে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল এবং অন্যান্য বিপ্লবীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তিনি অধরা রয়ে যান। পরে লুকিয়ে বিহারের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে দশ মাস কাজ করেন। চেয়েছিলেন বিদেশ গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করবেন এবং লালা হর দয়ালের সাথে সাক্ষাত নেবেন। এ-জন্য গোপনে দিল্লি যান; সেখানে এক পাঠান বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় গ্রেপ্তার হন।

তৎকালীন পুলিশ সুপার তাসাদ্দুক হোসেন পণ্ডিত রামপ্রসাদের বিরুদ্ধে তাকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করলে কিন্তু তিনি দৃঢ়চিত্তে বলেন—Khan Sahib, I know Pandit Ram Prasad better than you, he is not such a person as you say but even if you are right then I am also quite sure that as a Hindu, he will be much better than British India to whom you are serving like a servant.

জেলে থাকতে প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত করতেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে—বুধবার, ফাঁসির চারদিন আগে, দুজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা যেখানে তাকে নিঃসঙ্গ সেলে দেখতে আসেন। তখন তিনি নামাজে। একজন কর্মকর্তা বিড়বিড় করে বলেন— ‘আমি দেখতে চাই যখন এই ইঁদুরটিকে ঝোলানো হবে তখন তার বিশ্বাস কতটুকু থাকে।’ ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বাতাসের মতো মর্মর শব্দ করতে করতে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নামাজে ব্যত্যয় করলেন না।

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭ সোমবার, তাকে দুই স্তর উপরে বেদিতে নেওয়া হয়। শিকল-মুক্ত করা হলে তিনি ফাঁসির দড়ির কাছে যান এবং সেটিকে চুমু খেয়ে বলেন— আমার হাত কোনো মানুষ হত্যা করেনি। আল্লাহ্‌ আমাকে ন্যায়বিচার দেবেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়া ২ আগস্ট ২০০৪ সালে আসফাককে নিয়ে Daredevilry of sons of the soil শিরোনামে যেই ফিচার ছেপেছে, তার শুরুটা এমন— “La ilahi il Allah, Mohammed Ur Rasool Allah”… With these words Ashfaqullah laid down his life for his motherland.

১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর তার জন্ম হয় ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে। অর্থাৎ শাহাদাতের সময় তার বয়স হয়েছিলো মাত্র ২৭ । ছিলেন প্রসিদ্ধ সামরিক পরিবারের সন্তান । তার বেশ কয়েকজন আত্মীয় ব্রিটিশ ভারতের পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন।

উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ কারাগারের গেইটের নাম রাখা হয়—অমর শহিদ আসফাকউল্লাহ খান গেইট । ‘আসফাক কী আখিরি রাত’ শিরোনামে প্রখ্যাত হিন্দি কবি ‘অগ্নিবেশ শুক্লা’ একটি চমৎকার কবিতাও লিখেছেন ।

তবে আপনারা অনেকেই আমিরখানের ঐতিহাসিক ছবি ‘রঙ দে বাসন্তি’ দেখেছেন; যেখানে তিনি ও তার সহকর্মীদের সাহসিকতার কয়েকটি দৃষ্টান্ত চিত্রিত করা হয়েছে। তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন কুনাল কাপুর।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক