দিল্লী সালতানাতের আটশো বছর, মুসলমানরা ভারতবর্ষকে কী দিয়েছে?

জুনায়েদ ইশতিয়াক ঃ

ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমন সাহাবীদের যুগে শুরু হলেও ব্যাপক শাসন ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে এর বহু পরে। ইতিহাসবিদরা বলেন, ১২০৬ খৃস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেকের হাত ধরে মামলুক সালতানাত প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে শক্তিশালী ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সূচনা ঘটে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে ২৪ জুলাই কুতুবুদ্দিন আইবেক দিল্লী জয় করেন। সে হিসেবে মুসলমানদের ভারত জয়ের আটশো বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। পরবর্তীতে মুসলমানরা শাসন ক্ষমতা হারায় ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা নানাভাবে হিন্দুদের প্রভাবশালী করে তুলে _ শান্ত ও উন্নত ভারতবর্ষ হয়ে ওঠে দরিদ্র, অস্থির ও সংঘর্ষমুখর। ইংরেজরা চলে গেলেও হিন্দু ও মুসলমানের সংঘর্ষ এখনো থামেনি।

মুসলমানদের হাতে শাসন ক্ষমতাও আর ফিরে আসেনি। মূল ভারতের ক্ষমতা তো হিন্দুদের হাতে গেছেই, পাশাপাশি অনেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দুদের হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেন।অন্যদিকে হিন্দুসহ অনেক সেকুলার মনে করেন, মুসলমানরা এ অঞ্চলের অভিবাসী। তারা এই অঞ্চলের মূল আদিবাসী নয়। ফলে তাদের বিতাড়িত করতে হবে। এখানে থাকতে চাইলে তাদের ছেড়ে দিতে হবে ধর্ম ও পরিচয়। এই প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবদান কী, কেন ও কীভাবে ইসলাম ও মুসলমানি সভ্যতা এই অঞ্চলের পালাবদল ঘটিয়েছিল, সেই আলোচনা করা তাই এখন জরুরী হয়ে পড়ছে।


কীভাবে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের শর্ত তৈরি হয়?

মুসলিম পূর্ব সময়ে ভারতবর্ষের শাসকেরা রাজনৈতিকভাবে শাসন করেছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্পূর্ণভাবে সনাতনী ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ভারতীয় সংস্কৃতি তার প্রভাবের মাধ্যমে এসব ভিনদেশী শাসকদের সম্পূর্ণ বদলে ভারতীয় করেই গড়ে তুলেছিল। এর কারণ ছিল এ সকল শাসকেরা সুসংজ্ঞায়িত কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তাই যখনই তারা ভারতের আধ্যাত্মিক আদর্শের সংস্পর্শে এসেছেন, তখনই কোনো দ্বিধা ছাড়াই একে আপন করে নিয়েছেন, হয়ে উঠেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একজন।

ভারতের আধ্যাত্মিক আদর্শের নানা রকম রুপ ছিল, নানা রকমের আদল ও বদল ছিল, ফলে এর মধ্য দিয়ে সামগ্রিক শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি করা কোনভাবে সম্ভব ছিলোনা। এ কারণে মুসলিম পূর্ব সময়ে একক কোন চিন্তা এখানে দানা বাঁধেনি।ফলে ঐক্য ও ব্যবস্থা তৈরি সম্ভব ছিলোনা।পাশাপাশি আধ্যাত্মিক আদর্শের সাথে পরিচয় থাকলেও আইন, আদালত, প্রশাসন ও জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাতেও খামতি ছিল। এসব কারণে পার্থিব ব্যবস্থা  গঠনে তাদের সামর্থ্য ছিল সীমিত। বরং  আধ্যাত্মিকতার সাথে পার্থিব জীবনের সম্পর্ক নির্ণয়ে ব্যর্থতা তাদের সামাজিক জীবনে এক রকম অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছিল।

পাশাপাশি সামাজিক জুলুম ও বৈষম্যের কোন ব্যাখ্যা ও সমাধান তাদের কাছে ছিলোনা।আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক সঙ্কটের সমাধান পেতোনা। ফলে জনপরিসরে সৃষ্টি হয়েছিল ব্যাপক অবিশ্বাস, অনাস্থা ও জড়তা। মুসলিম যোদ্ধা প্রজন্মের সামনে তাই তৎকালীন ভারতীয় শাসকরা টিকে থাকতে পারেননি।

মুসলিম শাসন কি ভারতবর্ষের জন্য ইতিবাচক ছিল? 

ধর্মীয় চিন্তা, সামাজিক সঙ্কট ও বৈষম্যের কোন সাধারণ সমাধান তৎকালীন ভারতবর্ষে ছিলোনা। ভারত সভ্যতাগতভাবে পিছিয়েই ছিল। তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যে খৃস্টান ও মুসলিমরা যেভাবে সভ্যতাগত প্রগতি সৃষ্টি করেছিল, তার আলোড়ন ভারতেও এসে পৌঁছেছিল। ফলে এই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও প্রণোদনায় ভারতীয় সভ্যতায় নতুন পালাবদল জরুরী হয়ে উঠেছিল। মুসলিম শাসন এই পালাবদলেই সাহায্য করেছেন। স্পষ্ট ভূমিকা রেখেছেন।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ভারতবর্ষের যে ঐক্যবদ্ধ রুপ আমরা আজকে দেখতে পাই, সেটা মুসলিম শাসনের অবদান। ভারতের দশ দেবতার বিশ মতের বৈচিত্র্যে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য নির্মিত হওয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিলোনা। সেখানে দরকার ছিল নতুন রক্ত ও ধারা। মুসলমানদের আগমনে এই শর্ত পূরণ হয়েছিল।এতে একদিকে যেমন ঐক্যবোধ তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মূল্যবোধ।

এই ভৌগলিক ঐক্যবোধ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া ভারতবর্ষকে কল্পনা করাও সম্ভব ছিলোনা।

 অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মুসলিম শাসনের বৈশিষ্ট্য

ভৌগলিক ঐক্যবোধ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে চর্চা করা জরুরী, নয়তো এর স্থায়িত্ব থাকবেনা।  হুমকির মুখে পড়ে যাবে। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক মুসলিম শাসনের পতন যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চর্চাতেও এর স্পষ্ট প্রভাব ছিল। অন্যান্য অঞ্চলে মুসলমানরা যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পেরেছিল, ভারতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেটা সম্ভব হলেও ব্যক্তি পর্যায়ে সম্ভব হয়নি।

কেননা ভারতে মুসলিম শাসনের সাথেসাথে পার্সিয়ান ও তুর্কিস্তানি সংস্কৃতিও আমদানি হয়েছিল। স্থানীয় সংস্কৃতিও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ফলে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন টিকে থাকলেও একটা মিশ্রন তৈরি হয়ে গেছিল। যেখানে মৌলিকভাবে মুসলিম মূল্যবোধ ও সামরিক চেতনা বাকী থাকলেও তাতে নানারকম ভ্রান্তিও ঢুকে গিয়েছিল।

ইসলামের মূল যুগ ও অঞ্চলের সাথে দূরত্ব এই মিশ্রণ ও ভ্রান্তির বিস্তারে আরও সাহায্য করেছে। এসব পরবর্তীতে মুসলিম শাসন নানারকম বিপর্যয় ও বাঁধার মুখে পড়ে।

এসব কিছু বাদ দিলেও ভারতবর্ষে সাংস্কৃতিকধারার একটা পালাবদল ঘটেছিল। একদিকে ভারতীয় ভাষার সাথে যোগ হচ্ছিল মুসলিম শব্দ, চিন্তা ও রুপকল্প, অন্যদিকে সাহিত্যের কলা-কৌশলেও আসছিল পরিবর্তন। ভাষা-সাহিত্য-স্থাপত্যে মানবিক মূল্যবোধ ও প্রতিনিধিত্বে গুণগত এক পরিবর্তনও এসেছিল।

উর্দু ভাষার জন্ম ও ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক 

ভারতে মুসলমান ও সনাতন সংস্কৃতির পালাবদলের একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে উর্দু ভাষার জন্ম। তখনকার সময়ে রাজপুত এবং মুসলমান সৈন্যরা সম্রাজ্যের হয়ে একসাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিতেন। রাজপুতদের ভাষা ছিল হিন্দী, অন্যদিকে মুসলমান সৈন্যদের ভাষা ছিল প্রধানত তুর্কী ও ফার্সি। এছাড়া সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষাও ছিল ফার্সি। বছরের পর বছর ধরে এ ভাষাগুলোর মধ্যে নিয়মিত মিথস্ক্রিয়ার ফলে জন্ম নেয় উর্দু। যুদ্ধের ক্যাম্পে উৎপত্তি বলে একে তখন ‘ক্যাম্পের ভাষা’ বলা হত। এ ভাষার লেখার পদ্ধতি অনেকটা ফার্সির মতো, আর অনেকাংশে মিল আছে হিন্দীর সাথে। ব্রিটিশ শাসনামলে এসে এ ভাষার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। একসময় এটিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়া হয়। তখন থেকে এটি ভারতবর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষা।

উর্দু ভাষা সাধারণ ভাষা মাত্র নয়, ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ও সভ্যতার উজ্জ্বল দলীলও বটে।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদবিএনপির তৃণমূল নেতাদের ঢাকায় তলব
পরবর্তি সংবাদদুর্নীতিমুক্ত নতুন পাকিস্তান গড়ে তোলা হবে: ইমরান খান