বাংলাদেশের মানুষ এখনো ব্যাপকভাবে কুসংস্কারে বিশ্বাস করে কেন?

ওমর ফারুক

কুসংস্কার সমাজের একটি ব্যাধি। এটি সামাজিক ও মানসিক দুটিই হতে পারে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিকভাবে প্রচলিত অনেক কুসংস্কার রয়েছে, যা শিক্ষিত-সমাজও দূরে ঠেলে দিতে পারছে না। একমাত্র মানসিক দ্বন্দ্ব বা দ্বিধা থেকেই কুসংস্কারের উৎপত্তি।

আমাদের দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী নানাবিধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। আমাদের দেশে লোডশেডিংয়ে যত মোমবাতি জ্বলে, তারচেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে মোমবাতি জ্বলে মন্দির মসজিদ গির্জা প্যাগোডা ফকির-দরবেশ আউলিয়াদের মাজারে। এই মানত করা মোমবাতির আলোতে মনের কুসংস্কারের অন্ধকার আরো গাঢ় হয়। আমরা এগিয়ে চলি অন্ধকারের দিকে। বিশাল বটবৃক্ষকে কুদরতি নিদর্শন মনে করা ও গায়েবি মসজিদে বিশ্বাস ও মাজার দরবারে দান বিপদ দূর করবে, এমন আরও অনেক কিছু বলা যেতে পারে কুসংস্কার নিয়ে।

তবে সম্প্রতি ময়মনসিংহের চেচুয়া বিলের ‘অলৌকিক’ পানি পান করে রোগ ভালো হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি সারাদেশে আলোচনা ও সমালোচনা জন্ম দিয়েছে। রোগ ভাল হওয়ার আশায় নোংরা ও কাদাযুক্ত পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে শিশুসহ কয়েকশ নারী-পুরুষ। এখনো দেশে এ বিপুল সংখ্যক মানুষের কুসংস্কারের বিশ্বাসকে সহজে নিতে পারছেন না দেশের শিক্ষিত-সমাজের মানুষ।

মানুষের মাঝে এ কুসংস্কারের রহস্য কী? কেনইবা মানুষ ব্যতিক্রম কিছুকেই সহজে বিশ্বাস করে নেয়। কুসংস্কারই বা কাকে বলে? ধর্মে কুসংস্কারের অবস্থান কী, এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন দেশের একজন আলেম কবিরাজ ও মুহাদ্দিস নুরুল হক এবং ধর্মবিষয়ক লেখক ও খতীব সেলিম হুসাইন আজাদী।

মুহাদ্দিস নুরুল হক ফাতেহ২৪ কে বলেন, কুসংস্কার বলা হয়, যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসকে; সেটি হতে পারে ধর্মের নামে, সামাজিকতার নামে, মতবাদ ও শাস্ত্রের নামে। দীর্ঘদিন ঐশী বার্তার জ্ঞান ও নবী-রাসুলদের সংস্পর্শ না পাওয়ায় আরব জাতির মাঝেও এ কুসংস্কার কাজ করতো। রাসুল (সা.) জাহেলি যুগের সব কুপ্রথার বিদায়ঘণ্টা বাজিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘জাহেলি যুগের সব কুপ্রথা আমার পায়ের নিচে নিক্ষেপ করা হলো।’

এ কুসংস্কারের কারণ কী? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কুসংস্কারের প্রধান কারণ হলো অজ্ঞতা। অজ্ঞতার কারণে মানুষ এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে থাকে। এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে। কিছু কিছু মানুষ এ বিশ্বাসের কারণে হয়তো তার মনের আশা পূরণ হতে দেখে। ফলে এর ব্যাপকতাও বেড়ে যায়। তবে কিছু আশা ও প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার কারণ হচ্ছে আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ বলেছেন, বান্দা আমার প্রতি যে ধারণা করে, আমিও তার প্রতি এমন আচরণ করি।’

ইসলামে এসব কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের অবস্থান কী, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামের প্রথম কথাই হলো ‘ইকরা’ বা তুমি পড়ো। অজ্ঞতাকে দূর করা গেলে কুসংস্কার নির্মূল করা সম্ভব। ইসলামে অশুভ বলতে কিছু নেই। সৃষ্টির কোনো কিছুই অশুভ নয়। কোরআন বলেছে ‘হে আমার রব, তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করোনি।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তির ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো।’ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো কিছুকে অশুভ, অপয়া মনে করা শিরক।’ ইসলামের এসব শিক্ষা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাহলে এসব কুসংস্কার দূর করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করলেই হবে না, সাথে মানসিক চিন্তাভবনারও পরিবর্তন ও প্রসার ঘটাতে হবে। কারণ অনেক কুসংস্কার যেহেতু সামাজিকভাবে উৎপন্ন, যা যুগ যুগ ধরে প্রবহমাণ; ফলে তা আমাদের পরিবার ও শিক্ষার মাধ্যমেই মনের মধ্যে গভীর রেখা ফেলে। তাও দূর করতে হবে শিক্ষা ও সামাজিকতা দিয়ে।’

এ বিষয়ে মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় কলাম লেখক মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী বলেন, ‘মানুষ স্বভাবগতভাবেই হুজুগ ও গুজবে বিশ্বাসী। একটি শ্রেণি অলৌকিক কিছু বলে ধোঁকা দিয়ে থাকে আরেক শ্রেণির মানুষ ধোঁকায় পড়ে। যুগ যুগ ধরে এটিই চলে আসছে। কৃত্রিম কিছু সৃষ্টি করেও সহজ সরল মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এসব থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে বিশেষ করে মুসলিমদের ইসলামের সীমারেখার ভেতর থেকেই জীবন পরিচালনা করতে হবে। আলেম -উলামা ও বুজুর্গ মানুষদেরও সংস্পর্শে গিয়ে এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করা সম্ভব।’