বাঙলাভাষার প্রথম নারী সিরাত রচয়িতা

তুহিন খান

বিশ শতকের গোড়ার কথা। চন্দ্রদ্বীপের এক বনেদি বাড়ি ‘ফ্লোরা হাউজ’। গভীর রাত, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু বাড়ির বড় মেয়েটি একমনে বসে কিছু লিখে চলেছেন। দু বছর আগেও তিনি নিয়মিতই এ বাড়িতে থাকতেন; কিন্তু এখন কি আর তা সম্ভব! ১৯১৪ সালে তিনি বউ হয়ে চলে যান ঢাকার আরেক বনেদি পরিবারে, ২৬ বছর বয়সে! সেকালে, সেই বিশ শতকের গোড়ায়, ২৬ বছর বয়সে বিয়ের কথা ভাবা যায়! তবে আমাদের এই নতুন বউটির বয়স বেশি হলে হবে কী, এই বয়স কেবল হাওয়া-বাতাস খেয়ে খেয়ে বাড়েনি। সে যুগে মেয়েদের পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিলো একেবারেই সীমিত; একদম ছিল না বললেও ভুল বলা হবে না বোধহয়। কিন্তু আমাদের এই বধূটি বাপের বাড়িতে বসেই শিখেছিলেন উর্দু ও ফার্সিভাষা। প্রচণ্ড জ্ঞানপিপাসু এই বধূটি বিয়ের আগেই টুকটাক লিখতে শুরু করেন। বিয়ে তার হয়েছে মোটে দুই বছর; কিন্তু জ্ঞানপিপাসা আর লেখার আগ্রহ একটুও কমেনি; বরং পণ্ডিত জামাই পেয়ে তা বেড়ে গেছে আরো শতগুণ; বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায়ই, জামাইয়ের কাছে ইংরেজিও শিখে ফেলেছেন তিনি।

বধূটির নুন-মশলার গন্ধমাখা কাঁকনপরা হাত নির্লিপ্তভাবে লিখে চলেছে। তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু উর্দু-ফার্সি-ইংরেজি বই; তিনি আরবি জানেন না, বৈরী জগত-সংসারের নানান কাজের ফাঁকে শিখতে পারেননি, নইলে আরবি বইও থাকতো হয়তো! এসব বই তাকে জোগাড় করে দিয়েছেন ছোট দেওর মৌলবি আবুল বতুল মুহম্মদ নূরুল হক। ছেলেটা তাকে অনেক সাহায্য করেছে; সে-কথা লিখে, তার নামের পাশে লিখলেন আশীর্বাদবাক্য— ‘তালা ওমরহু’ (তিনি দীর্ঘজীবী হোন)। এভাবে ১৯১৬ সালে, অক্টোবরের গভীর রাতে, চন্দ্রদ্বীপের বনেদি বাড়ি ‘ফ্লোরা হাউস’-এ বসে, বধূটি লিখে শেষ করলেন তার জীবনের প্রথম বইটির ভূমিকা, যে বইটি পরবর্তীতে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে নারীলিখিত প্রথম সিরাতগ্রন্থ বা নবীর জীবনী হিশেবে, যে বইয়ের প্রশংসা করে চিঠি লিখবেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ! বইটির নাম ‘স্বর্গের জ্যোতিঃ’, বাঙলাভাষায় কোনো নারীর লেখা প্রথম সিরাতের বই। আর বধূটির নাম বেগম সারা তয়ফুর (১৮৮৮-১৯৭১), বাঙলাভাষার প্রথম নারী সিরাতলেখিকা।

তার আসল নাম নূরুন নেসা সারা খাতুন। যদিও, সিরাত-গবেষক নাসির হেলাল তার ‘বাংলা ভাষায় সিরাত চর্চা’ শীর্ষক রচনায় তার আসল নাম লিখেছেন হুরায়ূন্নিসা সারা খাতুন। সারা খাতুনের জন্ম ১৮৮৮ সালে, বরিশাল শহরে। তার বাবা মজহার হোসেন নূর আহম্মদের আদিবাড়ি ছিল ঢাকার নওয়াবগঞ্জ থানার নয়াবাড়িতে। তার মা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বড় বোন। অর্থাৎ, সম্পর্কে সারা খাতুন ছিলেন শেরে বাংলার ভাগ্নি।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা। পড়াশোনা আর লেখালেখিতে তার ছিল সীমাহীন আগ্রহ। বেশ অল্প সময়েই তার লেখা সে সময়ের বিখ্যাত পত্রিকা ‘সওগাত’, ‘নব-নূর’ ইত্যাদিতে প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯১৪ সালে, ২৬ বছর বয়সে, তার বিয়ে হয় লেখক, ঐতিহাসিক, পুরাতাত্ত্বিক এবং বাঙলায় নারীশিক্ষার অন্যতম অগ্রপথিক, ‘Glimpses of old Dhaka’ বইয়ের লেখক সৈয়দ মোহাম্মদ তয়ফুরের সাথে। নূরুন নেসা সারা খাতুন থেকে তিনি হয়ে যান বেগম সারা তয়ফুর। সৈয়দ তয়ফুর ছিলেন তৎকালীন ঢাকার সুশীল সমাজের অন্যতম সদস্য। ‘Dacca’ থেকে ‘Dhaka’—বানানে এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিলেন তিনি। বিদ্বান ও পণ্ডিত জামাইয়ের সাহচর্যে সারার শেখার আগ্রহ শত গুণে বেড়ে যায়। রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়ির শত ব্যস্ততা ও বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি বিয়ের মাত্র ২ বছরের মধ্যেই জামাইয়ের কাছে ইংরেজি শিক্ষার পাঠ নেন। সেই শিক্ষা তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন তার প্রথম বইয়েই, সলজ্জ কৃতজ্ঞতায় বইয়ের ভূমিকায় স্বীকার করেছেন জামাইয়ের ঋণ।

বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯১৬ সালের ১লা অক্টোবর, তিনি লিখে শেষ করেন তার প্রথম বই ‘স্বর্গের জ্যোতিঃ’, যেটি ১৯১৭ সালে বরিশাল থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে, ১৯৬৩ সালে, বইটি বাঙলা একাডেমি থেকে পুনরায় প্রকাশিত হয়। একাডেমির এই সংস্করণের আগেই বইটি যে ব্যাপকজনপ্রিয়তা পেয়েছিল, এর প্রমান এই যে, সেই একাডেমি সংস্করণটি ছিল বইটার পঞ্চম মুদ্রণ, এর আগে এই বইয়ের কমপক্ষে চারটি মুদ্রণ শেষ হয়েছিল। একাডেমি-সংস্করণের ভূমিকায় সৈয়দ আলী আহসান লিখেছিলেন—‘…যে সমস্ত মুসলিম মহিলা সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্য-সাধনায় সমুজ্জ্বল কীর্ত্তি স্থাপন করেছেন, সাহিত্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিরূপণে তাদের সাহিত্যকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্যক পরিচয় হওয়া প্রয়োজন।’ ৭০ পৃষ্ঠার সেই সংক্ষিপ্ত বইটি ‘বালকবালিকাগণের’ উপযোগী করে লেখা হলেও, গুণে-মানে তা ছিল যে কোনো রসোত্তীর্ণ রচনার সমকক্ষ। আর সেজন্যেই, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং পত্র লিখে প্রশংসা করেছিলেন বইটির। যে সাতজনমাত্র মুসলিম নারীকে রবীন্দ্রনাথ পত্র লিখেছিলেন, সারা তয়ফুর তাদের মধ্যে অন্যতম। মৌলবী মুজিবুর রহমান সম্পাদিত ‘The Mussalman’ পত্রিকার ১৯৫৮ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত সংখ্যা এবং পরপর আরো কয়েকটি সংখ্যায়, বইটির যে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, সেখানে এই বই সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিঠির এই অংশ মূদ্রিত হয়—‘আপনার ‘স্বর্গের জ্যোতিঃ’ গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া আনন্দিত হইলাম, ইহার ভাষা ও রচনা সুন্দর হইয়াছে। বাংলা ভাষায় এরূপ গ্রন্থের অভাব ছিল, আপনি তাহা দূর করিয়াছেন। ‘পাঠক সমাবেশ’ থেকে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’র তেইশতম খণ্ডে এই চিঠি স্থান পেয়েছে। কাব্যিক গদ্যে লেখা সেই বইটি বাঙলাসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারীকর্তৃক লিখিত সিরাতগ্রন্থ।

সারা তয়ফুরের সাহিত্যজীবন ছিল সমৃদ্ধ। ঢাকার সাহিত্যসমাজে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ৷ ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা’, ‘আল ইসলাম’, ‘সওগাত’, ‘নূর-নামা’ ইত্যাদি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। বেগম সুফিয়া কামালসহ অনেক নারী তৎকালীন যেসব মুসলিম নারীর লেখালেখি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, বেগম সারা তয়ফুর ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘সওগাত’ পত্রিকার ১৩৩৩ সালের ভাদ্র সংখ্যায় মোহাম্মদ আব্দুল হাকীম বিক্রমপুরীর লেখা ‘বঙ্গ সাহিত্যে মুসলমান মহিলা’ শীর্ষক রচনায় সারা তয়ফুরের নাম গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছিল। বেগম রোকেয়ার পরে যে নারীরা তৎকালীন সমাজে প্রচলিত নানান অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, সারা তয়ফুর ছিলেন তাদের অন্যতম। বিয়ের পরে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম আরো বেড়ে যায়। ১৯২২ সালে তিনি লীলা নাগ-প্রতিষ্ঠিত ‘দীপালী সংঘ’-এর সদস্য হয়েছিলেন, তিনি এ সংঘের ‘শিল্প মেলা’-র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একই সময়ে তিনি বেগম রোকেয়া পরিচালিত ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এ সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। ১৯৩৯ সালে, মুসলিম মহিলাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, বেগম সারা তয়ফুরের নেতৃত্বেই মুসলিম মহিলারা ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ইমামতিতে, কার্জন হলের পশ্চিমের মাঠে এই নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন যুগপৎ লেখিকা ও সমাজসেবিকা। সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার অবদানের জন্য দেশবিভাগের কিছু পূর্বে ইংরেজ সরকার তাকে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ উপাধিতে ভূষিত করে।

তয়ফুর দম্পতির ছিল তিন মেয়ে—লুলু বিলকিস বানু, লায়লা আর্জুমান্দ বানু এবং মালেকা বানু। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সুশিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে সক্রিয়। এদের মধ্যে লায়লা আর্জুমান্দ বানু ছিলেন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী, ১৯৩৯ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে, প্রথম মুসলিম নারী কণ্ঠশিল্পী হিশাবে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-র ঢাকা বেতারে সংগীত পরিবেশন করেন।

বেগম সারা তয়ফুর ছিলেন সেই গুটিকয় মুসলিম নারীর অন্যতম, যারা বৃটিশ শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত মুসলিম সমাজের নারীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পুনর্জাগরণে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন৷ বেগম সারা তয়ফুর ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।