
শরীফ মুহাম্মদ :
গত কয়েকদিন যাবত লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কুরবানীর পশুর চামড়ার দাম অনেক কম ধার্য করা হয়েছে৷ বিক্রিও হচ্ছে অত্যন্ত কম দামে। বেশ কয়েক বছর যাবতই এটা হচ্ছে। কোনো কোনো গণমাধ্যম একটা চার্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, গত দুই হাজার তেরো থেকে দুই হাজার আঠারো পর্যন্ত চামড়ার দাম যেভাবে কমেছে, তাতে প্রায় অর্ধেকের মত দাম এরই মধ্যে কমিয়ে ফেলা হয়েছে৷
আগে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ছিল ৮৫ থেক ৯০ টাকা৷ এখন তা হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা৷ এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি চিত্র৷ আমার কাছে এটাকে একটা ষড়যন্ত্রমূলক চিত্রও মনে হয়েছে ৷ আর বাস্তবতা হলো, বর্তমানে লিখিত এই অর্ধেক মূল্যের মধ্যেও এই অবনতিটা থেমে নেই। বরং পাল্লা দিয়ে এটা আরো অনেক নীচে নেমেছে বা নামানো হয়েছে।
কারণ আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার যেমন বাজার, অথবা চামড়াজাত পণ্যের যেমন বাজার সে হিসেবে বাংলাদেশে ক্রমাগত প্রতিবছর কাঁচা চামড়ার এই পরিমাণ মূল্য হ্রাস ঘটা, এটা আমার কাছে একরকম ষড়যন্ত্রমুলক ও ইচ্ছাকৃত একটা ব্যাপার বলে মনে হয়। এখান থেকে কয়েকটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে৷
প্রথমত দেখতে হবে, এই দেশে কুরবানীর সময় চামড়া বিক্রেতা কারা?প্রধানত মাদ্রাসাগুলোই কুরবানীর সময় কাঁচা চামড়ার প্রথম বিক্রেতা। মাদ্রাসায় গুরাবা ফান্ড অর্থাৎ গরিব ছেলেদের জন্য যে ফান্ড, সে ফাণ্ড চালানোর জন্য চামড়া কালেকশন করা হয়। মূল্য কমিয়ে এখানেই তাদেরকে ঠকানো হচ্ছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামের ব্যাপারে যে একচোখা পলিসি রয়েছে, সেটার একটা সূত্র ধরেও এই কাজটা করা হতে পারে।
আর দ্বিতীয় হলো, এতে করে চামড়া ব্যাবসায়ীদেরও বিরাট অনৈতিক লাভ যোগ হচ্ছে। ইসলামী শিক্ষাকে দমিয়ে রাখার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পলিসিও রক্ষা হলো, আবার তারা ব্যবসাতেও বিরাট একটা প্রফিট বা মুনাফা অর্জন করে নিতে পারল। একঢিলে দুটি শিকারের ব্যাপার।
আমি এর সঙ্গে আরেকটি কথা যুক্ত করতে চাই। এভাবে চামড়ার মূল্য ধার্য করার যে প্রথা আজ দেখছি, এটা আগে মোটেই ছিল না। মূল্যধার্যের এই ঘটনা বেশিদিন আগের না৷ সম্ভবত গত এক দশকের ঘটনা এটা হতে পারে। এর বেশি হবে না। এর আগে চামড়ার বাজার উন্মুক্ত ছিল। স্বাভাবিক নিয়মেই চামড়ার মূল্য ধার্য হত। বাজারে ডাক উঠতো। প্রকাশ্যে মূল্য হাঁকানো হতো এবং সেভাবেই মূল্য চুড়ান্ত হতো। সেজন্যই যে কোনো একটা বড় গরুর চামড়া দুই হাজার, আঠারশ, সর্বনিম্ন পনেরশ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হত খুব সহজেই৷ কিন্তু চামড়ার মূল্য ধার্য করে দিয়ে মূল্য কমিয়ে আনা, এটা গত কয়েক বছরের কারসাজি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা হলো, কওমি মাদরাসাগুলো অর্থাৎ যারা গরিব ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ ফান্ড পরিচালনা করে, চামড়া কালেকশন করে যারা গরিবদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তাদের পক্ষ হয়ে ট্যানারী ব্যবসায়ী ও চামড়ার প্রধান ব্যবসায়ীদেরকে একটি নিরাপদ ও ইনসাফের জায়গায় নিয়ে আসা এবং তাদেরকে সংযত করা অথবা এ ধরনের প্রতারণা ও ঠকানোর আয়োজন থেকে তাদেরকে বের করে আনার মতো বড় কোনো প্রভাবকশক্তি আলেমদের মধ্যে কিংবা আলেমদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে কেউ দৃশ্যমান নন বলে এরকম ঘটনা ঘটতে পারছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিটাকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দূর করার জন্য আলেমদের ভেতরে অথবা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভেতরে এরকম প্রভাবক কোনো মানুষ কিংবা সিদ্ধান্তশীল সহযোগী শক্তি দরকার৷ যদি তারা সবাই সক্রিয় হন তবে এরকম পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
এ প্রসঙ্গে আজ একটি ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে। সাহসী বীরপুরুষ আমাদের উস্তায হযরত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.-এর ঘটনা ছিল সেটি।
দুই হাজার চার কিংবা পাচ সালের কথা। আমি সেদিন লালবাগ মাদ্রাসায় উপস্থিত ছিলাম। জুমার নামাজের পর হুজুর দফতরে এসে বসেন। আমিও তার পেছনে পেছনে যাই। এমন সময় পোস্তার এক আড়তদার আসল। ভদ্রলোকের নাম সম্ভবত হাজী আব্দুল ওয়াহাব হবে। তিনি এসে হুজুরের হাতে একটা শিট দিলেন। ট্যানারী মালিক এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এটা তৈরী করা হয়েছে৷
সেখানে সকল আড়তদারদেরকে ট্যানারী মালিকদের পক্ষ থেকে একটি সিদ্ধান্তকৃত মূল্যের ভেতর চামড়া ক্রয় করতে বলা হয়েছে৷ এর বাইরে গেলে ট্যানারী মালিকগণ আড়তদারদের থেকে চামড়া কিনতে পারবেন না, এমনও বলা হয়েছে৷ এছাড়াও আরো কিছু দফা সেখানে ছিল। নিচে দুইজনের স্বাক্ষর ছিল দুই পাশে, ট্যানারী মালিক এসোসিয়েশন আর চামড়া ব্যবসায়ী এসোসিয়েশন এরকম দুটি নাম ছিল বলে মনে আছে।
যাদের স্বাক্ষর ছিল এমন একজনের নাম ছিল টিপু সুলতান । তার ফোন নাম্বার নিচে দেয়া ছিল ৷ আমিনী সাহেব তখন এমপি ছিলেন ৷ চারদলীয় জোটের ক্ষমতার সময়ের কথা। তিনি ওই লোককে ফোন করে খুব ভদ্রভাবেই বললেন , চামড়ার মূল্য তো এমন ধার্য করা ছিল না। করলেন, বেশ, এত কম ধার্য করলেন কেন?
ওই পাশের ভদ্রলোকের ভেতর হয়ত কিছু ড্যামকেয়ার ভাব ছিল। আমাদের যেমন ইচ্ছা আমরা করেছি, আপনি কথা বলার কে, এরকম৷ হুজুর তখন এক পর্যায়ে বললেন এটার সঙ্গে তো মাদ্রাসার অধিকার জড়িত। আর বাজারের নীতিও তো এইটা না। আমরা হাজার হাজার চামড়া কালেকশন করে বিক্রি করি৷ আপনারা এভাবে দাম কমিয়ে দিলে আমাদের গরিব ছেলেদেরকে ধোকা দেয়া হবে, প্রতারণা করা হবে, এটা আপনারা কেন করবেন ? এক পর্যায়ে ওই ভদ্রলোক ফোন রেখে দেন ৷ হুজুর তখন পুনরায় ফোন করে তাকে ধমক দেয়া শুরু করেন।
এবং আমার মনে আছে, হুজুর খুবই জোরালো ভাষায় তাকে ধমক দিচ্ছিলেন। এবং এক পর্যায়ে বললেন, তোমরা কীভাবে চামড়ার দাম কমাও, এটা আমরা দেখবো এবং প্রয়োজন হলে তোমার ট্যানারি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
এরপর আমিনী সাহেব লালবাগের তরুণ শিক্ষকদের বললেন, তোমরা ঢাকার মুহতামিম সাহেবদেরকে ডাকো, বড় আলেমদেরকে ডাকো, আমরা আসরের পরে মিটিং এ বসবো। এবং আমরা একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসার মুহতামিমরা চলে আসলেন।
ওই সময়টা এমন, যখন সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। তখন অনলাইন পত্রিকার যুগও ছিলোনা। তাৎক্ষণিকভাবে টিভি সাংবাদিকদের ডাকা হল। মুহতামিম সাহেবরা মিটিং করে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। একটা প্রতিবাদী মিছিলও হয়ে গেলো লালবাগ এলাকায়। বিষয়টি সাড়া পড়ে গেল। ওই লোক ওই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের ধরে মাফ চাইতে শুরু করলেন। আলেমরা সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে মাফ করা হবে। তবে এর জন্য তাকে পাল্টা নোটিশ ইস্যু করে মূল্য নির্ধারণ প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
এর ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পাল্টা নোটিশ আলেমদের হাতে এসে পৌঁছে। আলেমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। এবং ওই বছর নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি হয়নি। যথারীতি চামড়া নিলামে উঠেছে এবং নিলামের মাধ্যমে দাম নির্ধারিত হয়েছে।
এরপর কুরবানীর পর আলেমদের মধ্যে আরও বৈঠক হয়েছিল। ওই সময় একটা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। আলেমদের পক্ষ থেকে ট্যানারি বা চামড়া কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় কীভাবে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। একটা সমিতি গঠন করার প্রক্রিয়াও চলমান ছিল। তবে পরে সেটা আর আগায়নি।
তো আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, ব্যবসায়ীরা মূল্য নির্ধারণ নিয়ে যে কারসাজি করেছিল, আমিনী সাহেবের নেতৃত্বে আলেমদের তাৎক্ষণিক আন্দোলনে সেই অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হয়। এখনও তো কারসাজি চলছে। এই কারসাজি রুখে দেওয়ার জন্যেও আলেমদের পক্ষ থেকে জোরালো চাপ সৃষ্টি করা দরকার। আমিনী সাহেবের মত কোন প্রভাবশালী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও কৌশলী আলেমকে এর নেতৃত্ব দেওয়া দরকার। নয়তো এই সঙ্কটের কোন সহজ সমাধান নেই।
অনুলিখনঃ কাজী মাহবুব ও জুনায়েদ ইশতিয়াক।
