কুরবানীর দার্শনিক মর্ম ও ব্যাখ্যা

শাহাদাত তৈয়ব

অনেকে মনে করেন, ‘ইসলামে ‘পশু কুরবানী’ পশু বধের মত একটা ঘৃণ্য কম্ম’। আবার কুরবানীর ঈদের দিনকে অবলা পশু হ্ত্যাদিবসও মনে করেন কেউ কেউ। সাম্প্রতিক সময়ে নানা গণমাধ্যমের কতিপয় উঠতি তারকাদের জবানে কুরবানী ঈদ নিয়ে ঘৃণা প্রকাশের প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও কুরবানী নিয়া নানান নেতিবাচক আলাপ আর আপত্তি কম হয় নাই। পশুর প্রতি তাদের দয়া মায়া রীতিমত উল্লেখ করার মত। যারা ‘শিক্ষিত’ হয়ে উঠছেন, বিশেষত সেকুলার-সুশীল-লিবারেল তাদের মধ্যে এমন মানবিক আবেগ বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত ও পরিস্থিতিতে দেখা যায়। অনেক সময় এই আবেগ নির্বিচার হয়ে ওঠে। আবেগ প্রকাশে তাদের বেগ ধরে রাখার অবস্থাও থাকে না।

তবে কুরবানী নিয়ে এ ধরনের আপত্তি একেবারেই নতুন কিছু না। অনেক পুরানা। একসময় এটা নিয়ে বহু বাহাস বিতর্ক হয়েছিল এ দেশের শরিয়তিদের সাথে মারফতি, বয়াতি এবং বাউল ও লালনপন্থীদের। কুরবানী সম্পর্কে মারফতি ও বাউলদের সবারই মোটামুটি অবস্থান হল, পশু জবাই করে প্রিয়বস্তুর কুরবানী হয় না।বরং নিছকই পশু হত্যা হয়। তাদের সিদ্ধান্ত হল, ‘বনের পশু নয়, মনের পশু’ কুরবানী করতে হবে। সেকুলারদের যে অংশ রাজনীতি করেন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক তৎপরতায় যুক্ত আছেন, তাদের মধ্যে কুরবানী নিয়ে বেশি আপত্তি দেখা যায়। এই শ্রেণির সেকুলাররা বাউল সুফি ও মারফতিদের এই অবস্থানকে বেশ সমর্থন দিয়ে যান।

আবার পাল্টা দৃশ্যও দেখা যায়। যেমন সেকুলার ও সেকুলার প্রভাবিত সবচেয়ে বড় অংশে কুরবানী রীতিমতো ‘উৎসব’ এর মতো। কুরবানী আসলে তাদের বাজারও চাঙ্গা হয়ে যায়। তাদের মধ্যে কুরবানীর গোস্ত বেশিদিন রেখে ‘ভোগ’ করার জন্য ফ্রিজ কেনার ধুম পড়ে যায়। শুধু সেকুলারই নয়, মধ্যবিত্তসহ একেবারে নির্বিশেষ সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেও এমন আলামত দেখা যায়। এছাড়া সমাজে ক্ষমতাবান ও কর্তৃত্বপরায়ণরা তো আছেই। তারা তো যথারীতি কুরবানীকে নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায় কারবারের স্বার্থে কাজে লাগায়। গ্রামেগঞ্জে গরিব মানুষদের মধ্যে কুরবানীর গোস্ত বিলি করে তারা প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু করে। মোটকথা কুরবানী নিয়ে বিচিত্ররকম নেতিবাচক চর্চা দেখা যায়।

কিন্তু কুরবানীর এসব চর্চার দিক থেকে যারা খোদ কুরবানীকে নিছক পশু হত্যা বলে চালায় দেন তাতে যেমন কুরবানী নাকচ হয়ে যায় না, আবার যারা ‘বনের পশু নয়, মনের পশুকে হত্যা করো’ বলে প্রচার করেন তাতে কুরবানীর অর্থ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়। এই বক্তব্যের মাধ্যমে দৃশ্যত কুরবানীর আমল বা প্রথার বিলুপ্তি হবে কিনা তা পরিষ্কার না। তবে ভাবে ইঙ্গিতে যে কুরবানীর চলমান জাহিরি আমল এর বিলুপ্তি কামনা করা হয় তা অনেকটাই বোঝা যায়।

পশু হত্যা, উৎসব, বনের পশু নয় মনের পশু ইত্যাদি প্রত্যয় ও প্রচারণাগুলো কুরবানীর আলোচনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ নিয়ে আলোচনায় ঢুকার আগে ইসলামে হাকিকতে কুরবানী কেমন ছিল এবং আছে, মানে মূলত কেমন করে আছে তার ঢাকনাটা কিছুটা খুলে দিলে আশা করি কুরবানী ব্যাপারটা ধরা পড়বে। মুশকিল হল, সাধারণভাবে ইসলামের যেকোনো বিষয়ে মানে বা তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা আমলের দিক থেকে ইসলামের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মানে বা তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে একজন আমলকারীর কাছে ইসলাম যে সার্বিকতা দাবি করে তার কিছুটা হলেও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু তাৎপর্য কি তা একধরনের যুক্তি পরম্পরায় প্রকাশ পায়। ইমান ও ‍যুক্তি আলাদা এবং অনেক সময় সাংঘর্ষিক বিধায় ঈমানিয়াত ও একিনের সাথে অন্যকিছু শর্ত হয়ে যাবার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যেটা ইসলামের মর্মের দিক থেকে যে যথেষ্ট অস্বস্তিকর সে বিষয়ে আগের দিনের বড় বড় জ্ঞানীগুনী পণ্ডিত ও হাস্তিজনরা বলে গেছেন। তারা তাফসির ও মানের মধ্যে একধরনের পার্থক্য করেছেন।

তাফসির যেসব উসুল অনুসরণ করে, মানে তা সবসময় করে না। শব্দের গভীর অর্থ ও রূপককে আশ্রয় করে এক ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় মানে বা তাৎপর্য অনুসন্ধান। এবং মানের ক্ষেত্রে এসেন্সিয়ালাইজ কিংবা কোনো একটা মানেকে মূল বলে স্থির করে ফেলার অবস্থা তৈরি হতে পারে। যেন কুরবানীর একটা মর্ম আছে আর সেই মর্মের দিকটাই আসল, কিন্তু দৃশ্যমানভাবে ব্যবহারিক আমলের যে ধরন সেটা বুঝি আসল বা ধর্তব্য না। যেখানে মানে করতে গিয়ে যেন দৃশ্যমান আমল আর মর্মসহ পুরো অখণ্ড ব্যাপারটা ব্যাহত না হয় সেদিকে সতর্ক করেছেন আগের কালের আলেমরা। তবে সাধারণভাবে এটা সমস্যা না। তখনই এটা বিপদের হবে যখন ইসলাম পালন করতে গিয়ে এই মানে ব্যাপারটা শর্ত হয়ে ওঠে—সাথে সাথে ইসলামের সার্বিকতার ব্যাপারটা হারায়ে যায়। প্রাসঙ্গিক কারণে তাফসির সংক্রান্ত এ বিষয়টি মনে রেখে এই লেখায় তাফসির ও মানের দিক থেকে কোরবানির আলোচনা করার কোশেশ করা হয়েছে।

কুরবানী কি, এটি খোদ ‘ কুরবানী’ শব্দের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলামের মৌলিক পিলারগুলোর সাথে কুরবানীর ধারণা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। যেমন ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ। ‘আমি’ এবং তার সর্বপ্রকার রূপ ও প্রকাশকে আল্লাহর কাছে সজ্ঞানে জেনে বুঝে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দেয়া বলতে এই আত্মসমর্পণ বুঝায়। আর কুরবান শব্দের মানে হল নৈকট্য হাসেল করা। মানে এই ‘আমি’কে বিসর্জন দেয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে আল্লাহর নিকটে বা কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার ক্রমাগত প্রচেষ্টা হল কুরবানী।

শুধু মনেপ্রাণে নিজেকে সমর্পণ করলাম বললেই তাতে ইসলাম সন্তুষ্ট হয় না। মনে প্রাণে ইসলাম মানলাম, ইসলামের সব নির্দেশ পালন করলাম, কিন্তু তারপরও ইসলাম সন্তুষ্ট নয়। কারণ ইতিমধ্যে যে মুমিন সাধারণ মানুষ থেকে ইমানের পথে এসেছেন তিনি তো এরইমধ্যে ইহজাগতিক সবকিছুর উপর মালিকানার বৈশিষ্ট্য ও শর্ত লালন করে এসেছেন। যেখানে তার ‘আমি’র মোহ পুরাপুরি রয়েছে। তা তো তিনি বাদ দেননি। কাজে এরকম সম্পত্তিতে ‘আমি’ বলবত রেখে শুধু আত্মসমর্পণ কথাটার কোন মানে হয় না। সমস্ত জৈবিক সম্পর্ক ত্যাগ ও দুনিয়াদারির সার্বিক বিষয় আশয়ের নজরানা দেয়ার মধ্য দিয়েই ইসলামের স্বার্থকতা নিরূপিত হয়।

এরসাথে ইসলামে শাহাদাহ বা স্বাক্ষ্যের সম্পর্কও জড়িত। আত্মসমর্পণকে পূর্ণতা দেয়ার মূল তরিকা হল কুরবানী। এটা শুরু হয়েছে ‘কালিমা’র মধ্য দিয়ে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র (আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই) মধ্য দিয়ে। তাওহীদের মধ্য দিয়ে। যেটা ইসলামের মৌলিক অবস্থান। যেখানে শুরুতেই মানব ইতিহাসের সকলপ্রকার ইলাহকে (ইলাহ মানে উপাস্য। কোরআনের ভাষায় মানুষ ও তার প্রবৃত্তিও উপাস্য, এভাবে সবধরনের মূর্ত, অমূর্ত বিদ্যমান এবং সম্ভাব্য সব উপাস্যকেই বুঝানো হয়েছে।) নাকচ করা হয়েছে। শিরক (যা আল্লাহর তা নিজের (সিস্টেমেটিকও হতে পারে) বলে দাবি করা। একইসাথে জেনে বা নে জেনে কোনো ব্যক্তি বা কোনো সিস্টেমের মধ্য দিয়ে একই এপ্রোচ প্রকাশ পাওয়া) এবং এর সমস্ত শর্তকে অস্বীকার করা হয়েছে।

মানুষের তৈরি আকার সাকার-মূর্ত বিমূর্ত, মনের-বনের অর্থাৎ সকল ধরনের ইলাহকেই নাকচ করা হয়েছে। এ কালিমা কবুল করার মধ্য দিয়ে ইমানের ঘটনা ঘটে প্রাথমিকভাবে। এখান থেকে কুরবানী শুরু। যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কুরবানী। এরপর পরিপূর্ণভাবে আসে ইসলাম। সেখানে একজন মুসলিম মুসলিম হয়ে ওঠেন তার ব্যক্তি বা ‘আমি’র সবরকম প্রকাশকে, ইচ্ছাকে ত্যাগ করে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে।

মোটকথা এখানে নফসকে জবাই করে দিতে হয় তাকে। এরপর তার সাক্ষ্য দিতে হয়। যেটাকে শাহাদাহ বলা হয়। যেমন, সালাত, রমজান, জাকাত ইত্যাদি। সালাত মানে ব্যক্তির নফসকে, আমিকে আগুনে নিক্ষেপ করা। আগুনে পুড়িয়ে ফেলা। রমজান মানেও তাই। আগুনে পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলা। তাহলে কি অঙ্গার করবে একজন মুসলিম? তার সকল আমি পুড়ে নিঃশেষ করে- সে যে আমি শূন্য, পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী তারই সাক্ষ্য দিতে হবে।

তাকে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের আজান মানে তাকে ঘোষণা দিতে হবে—‘আমি’ না, দুনিয়ার কোন স্বাধীন ব্যক্তি নয়, একমাত্র আল্লাহই বড়। আর কেউই নয়। কাউকেই সর্বমাননীয় স্তরে গিয়ে মান্য করা যায় না—এই সাক্ষ্যই দিতে হবে মনে প্রাণে প্রকাশ্যে। সর্বমান্য একমাত্র আল্লাহ। কারণ আল্লাহই সবার চেয়ে বড়। আল্লাহই মহান। সমস্ত বড়ত্ব আর ব্যক্তির প্রকাশকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে এ সাক্ষ্য দিতে হবে।

এ সাক্ষ্য যেমন একান্তে দিতে হবে, তেমনি সামাজিকভাবে দিতে হবে। একজন মুমিনকে প্রতি সালাতের আগে বলতে হয়—‘ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাত্বরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি হানিফা ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন’—মানে ‘আমি আকাশ ও জমিনের এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু থেকে ফিরে এসে শুধু তোমার দিকেই মুখ ফিরালাম। কেবলা করলাম। আর কোনো ইলাহ আমার কেবলা নয়- না নফসের না দুনিয়াদারির। এবং আমি মুশরিক বা শিরককারী নই।’

এরপর থাকে তাকবিরে তাহরিমা। তাকবির অর্থ-আল্লাহর মহানত্ব ঘোষণা করা, আর তাহরিমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। এর মানে আল্লাহর আগে কিংবা পরে আমি মানুষ বড় নই। এবং তার চেয়ে আর কেউ মহান নয়। বড় নয়। প্রধান নয়। অনুসরণীয় নয়। কেবলা নয়—সর্বান্তকরণে এ ঘোষণা এ বক্তব্য নিজের মধ্যে জারি করা। নিজের ভিতরে মজবুত ও সরল করে তোলা।

নামাজে দাঁড়ানো মাত্র জগতের সবকিছু হারাম করে দেয়া। না করে দেয়া। এখন শুধু আমিত্বত্যাগী আত্মসমর্পণকারী একজন বান্দা। এবাদত ও দাসত্বকারী। সালাতের এ অবস্থায় তাকে এমন একটি মুহূর্তের ভিতর দিয়ে যেতে হয় যেখানে শুধু সে এবং আল্লাহ। এর মধ্যে আর কেউ নেই। এমন বৈষয়কতামুক্ত নির্মোহ অবস্থা মানুষের জন্য আর কখনো কোনো অবস্থায় হয়ে ওঠা প্রায় কঠিন। এটি এক দুর্লভ মুহূর্ত। কিন্তু এ বিরল মুহূর্তই ইমানদার বারবার খুঁজে ফিরে। যেখানে বান্দার মধ্যে আল্লাহর মিরাজ তৈরি হয়। সালাতই মুমিনের বিস্ময়কর মিরাজ।

এরপর রুকুতে, সিজদায় একই সাক্ষ্য দিতে হয়। সর্বোপরি এ অভিজ্ঞতা যেমন মুমিনের একান্ত জগতে আসে তেমনি সেই মুমিনকেই এ অভিজ্ঞতা সামাজিকভাবেও দৃশ্যমান করে তুলতে হয়। যেটাকে কুরআনের ভাষায় জিকির বলা হয়। জিকিরের মধ্য দিয়ে মুমিনের ভিতর যেমন মিরাজ হয়, তেমনি সেই মিরাজের দাবি জমিনে সর্বোতভাবে ফুটায়ে (শাহাদাহ) তোলা যায়।

এভাবে হজ্জের ইহরাম (হারাম বা নিষিদ্ধ করে ফেলা)। এর মানেও নিষিদ্ধকরণ। তবে এতে অতিরিক্ত মানেটা আসে হজ্জের মত নতুন অবস্থার কারণে। হজ্জে ইহরাম করার পর থেকেই আগের অনেক কাজ হারাম বা নিষেধ হয়ে যায়। এতে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— হজ্জে ইচ্ছামত আপনি কোনো প্রাকৃতিক কিছু নষ্ট করতে পারবেন না। ধ্বংস করতে পারবেন না। একটা পিঁপড়াও আপনার খেয়াল খুশি মতো মারতে পারবেন না। একই অর্থে হারাম শরিফ (মক্কায় বায়তুল মুকাদ্দাস, কাবা ঘরসহ একটি নির্ধারিত সীমানাকে বুঝানো হয়)। হারাম এর সাধারণ অর্থ পবিত্র শুধু এ কারণেই হারাম বলা হয় ব্যাপারটা তা নয়, মূলত ওখানে প্রাণী হত্যা নিষেধ। খুন নিষেধ। হারাম। ইচ্ছা করে একটা উকুনও মারা যায় না। এর প্রতীকী তাৎপর্য খুবই গভীর। শুধু এটা পবিত্র কাবার আশপাশের ব্যাপারই নয়। বরং ইসলামের লক্ষ্য গোট জগতই এভাবে ‘হারাম’ অঙ্গন হয়ে যাওয়া। সেই কথাই কোরআনে নিহিত।

জাকাতের ক্ষেত্রেও কোরবানির ব্যাপার আছে। সেখানে সুরত ভিন্ন। জাকাতের মূল মানে হল, আত্মশুদ্ধি। আত্মোন্নতি। সম্পদের বৃদ্ধি না। সম্পদের শুদ্ধি। কিন্তু জাকাতের একটা মানে যেহেতু সমৃদ্ধি সেকারণে অনেকেই এর মানে নিছকই সম্পদের সমৃদ্ধি বুঝান। তবে সম্পত্তির শুদ্ধি কথাটা এ কারণেই বলা হয়, কারণ তাতে নফসের শুদ্ধি ঘটলে সম্পত্তিরও শুদ্ধি ঘটে, মানে সম্পত্তিতে মালিকানার নিরাকরণ ঘটিয়ে দেয়ার ক্রমাগত শর্ত তৈরি করে এ জাকাত। মোটকথা যেহেতু জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বিলিয়ে দিতে হয় যেখানে সরাসরি কুরবানীর মর্মার্থ নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। মূলত যে সম্পদের ওপর মালিকানা রয়েছে তার ওপরই কুরবানী প্রজোয্য হয়।

সেদিক থেকে মালিকানাধীন লালিত পালিত, যার সাথে মায়া জড়ানো সেরকম পোষ্য পশুকেই কুরবানী দিতে হয়। উল্লেখ্য, বনের পশুর ওপর কিন্তু ব্যক্তি মালিকানা হয় না। কাজে কুরবানী নিছক কোনো রীতিই নয়, এটি ইসলামের মৌলিক প্রস্তাবনা। যা না হলে ইসলাম সম্ভব না। এটার তাৎপর্য শুধু রাজনৈতিক নয়, একইসঙ্গে পরমার্থিক। রাজনৈতিক ও পরমার্থিক এ কারণে যে, হযরত মুহাম্মদ স. একটি ইনসাফপূর্ণ মানবেতিহাসের অভিমুখ তৈরি করে দিয়ে গেছেন এ কুরবানীর মাধ্যমে। এর সাথে জিহাদের সম্পর্ক ওতপ্রোত।

জিহাদ (ব্যক্তির নফস এবং সামস্টিক নফস। অর্থাৎ ব্যক্তি-নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের মধ্য দিয়েই কেবল সামস্টিক বা সামাজিক নফসের মোকাবেলা সম্ভব। কারণ সামাজিক নফস বলে একটা বিমূর্ত নফস খুবই গভীরভাবে সিস্টেমেটিক্যালি ক্রিয়াশীল রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি বা নফসের মোকাবেলা বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু এ সামাজিক নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ বা আরও বৃহত্তর অর্থে উম্মাহ গড়ে তোলার কথাটার কোনো মানে অর্থপূর্ণ হয় না।) যেমন অবিরাম ও সার্বক্ষণিক লড়াইয়ের সর্বাত্মক প্রক্রিয়া তেমনি কুরবানীও। ইমানি রূহানিয়্যাতে প্রাণিত হয়ে বৈষয়িকতা বিসর্জন দেয়া কিংবা বিষয় সম্পত্তির সার্বক্ষণিক ও ক্রমাগত কুরবানী দেয়ার মধ্য দিয়েই হযরত স. এর জারি করে দেয়া ইসলামের দিকে যাওয়া সম্ভব। ইদুল আজহার দিনে পশু কোরবানি পালনের মধ্য দিয়ে এ তাৎপর্য ও মর্মার্থ একজন মুমিন উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আইডিয়ালি কুরবানী ইমানদারের সমস্ত কর্মকাণ্ডেই প্রকাশিত হবে। এটাই ইসলাম বা আত্মসমর্পণ কথাটার স্বাভাবিক দাবি। দুই.  মনের পশু বলে ইসলামে কিছু নাই। পশুর সাথে তুলনা করার চলও ইসলামে খুব একটা নাই। এটা সত্য যে, কেউ খারাপ কিছু বা জঘন্য কাজ করলে আমরা অহরহ বলে থাকি পাশবিক আচরণ। মানে পশুর মত কাজ করেছে। জানোয়ারের মতো তার আচরণ। আসলে নীতি নৈতিকতার এরিয়া ইসলাম শুধু মানুষের মধ্যেই রেখেছে। প্রকৃতির আর কিছুর সাথে এর কোনো বিস্তার নেই। ইসলাম তাই মনে করে। কারণ, পশু কি করল কি করল না তার অযথা তুলনা টেনে আনা কোরআনের বিষয় না। কোরআনের বিষয় মানুষ ও মানুষকে কেন্দ্র করে বিশ্বজগত। পশু ধর্ষণ করে না, মানুষ করলেই ধর্ষণ হয়, মানে ধর্ষণ মানুষের মধ্যেই, মানুষই এটা করে। খুন, হত্যা, ছিনতাই, গিবত, মিথ্যা অপবাদ, জুলুম, অপহরণ, সম্পদ কুক্ষিগতকরণ ও মজুতকরণের মত জঘন্য অপরাধ মানুষ করে, পশু করে না। মানুষের তুলনা মানুষই। পশু না। তবে কুরআনে বিভ্রান্তদেরকে পশুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ পশু হল জীব মাত্র। কোরআন মানুষকে এরকম জীবমাত্র মনে করে না। নিছক প্রকৃতি মনে করে না। কোরআন মনে করে মানুষ প্রকৃতির হয়েও প্রাকৃতিক জীব সত্তার ঊর্ধ্বের। জীবের জীবনের চেয়েও মানুষের মধ্যে পরম সত্তার ফিতরত তুমুলভাবে রয়েছে। ফলে মানুষ যখন তার পরমার্থিক জীবন থেকে বিচ্যুত হতে চায় বা হয় তখন তাকে কোরআন এমন করেই পশু বা নিছক জীব বলে ধমক দেয়। এমনকি আরেক ধাপ এগিয়ে উল্টা তাকে বিভ্রান্ত বলে সাবধান করে দেয়।

মনের পশুকে কুরবানী দাও কথাটি বেশ ঘোরালো। জগতে ধ্বংস এবং সৃষ্টি যুগপতভাবে ঘটতেছে। এ ধ্বংস আমরাই করতেছি। আমরা মানে সৃষ্টি জগতের প্রতিটি বস্তু। প্রতিটি প্রকৃতি। প্রতিটি প্রাণ। প্রতিটি সৃষ্টি। প্রত্যেকেই অপরকে ভোগ করেই নিজের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। প্রাণীরা অন্য একটা প্রাণকে খেয়েই নিজের জীবন ধারণ করে। তিমি, হাঙ্গর আরেকটা প্রাণীকে খেয়েই বাঁচে। বোয়াল তার চেয়ে কম শক্তিশালী মাছ ও অন্যান্য জিনিস খেয়ে বাঁচে। পুঁটিও আরেকটা প্রাণ হত্যা করে বাঁচে। বৃক্ষ ও উদ্ভিদ রাজির ক্ষেত্রেও তাই। বাতাস আগুনকে প্রভাবিত করে, আগুনও তেমনি বাতাসকে প্রভাবিত করে। পানি করে বাতাসকে, বাতাস করে পানি ও অন্যান্য বস্তুকে। পদার্থের উন্মেষ কিংবা রাসায়নিক রূপান্তর এসবই একটি অপরটিকে প্রভাবিত করে। খর্ব করে। ব্যাহত করে মৌল প্রকৃতি। এভাবে অতি ক্ষুদ্র কণাও আরেকটা অণুর সম্ভাবনা ও অস্তিত্ব নষ্ট বা হস্তক্ষেপ করে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। একটা বস্তু আরেকটা বস্তুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এই দেখা অদেখা পুরা বস্তুবিশ্বের সবকিছু মিলে এক অবজেক্টিভ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল। মোটেও তা সরল নয়। কিন্তু প্রকৃতিতে প্রাণি জগতে এই ঘটনা দৃশ্য মনুষ্য আবেগের মানতে কষ্ট হলেও তাই সবচেয়ে মুখোমুখি নির্ভেজাল সত্য।

আবার উল্টা দিক থেকে দেখলে দেখা যাবে, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের টিকে থাকার কারণ ও শর্ত। কোনো একটি অণু পরমাণু এখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কেউ এখানে অদ্বিতীয় নয়। মানে ব্যাপারটা শুধু সরলরৈখিকভাবে ঘটে না। এর মধ্যে একটা জটিল আবর্তনশীল প্রাকৃতিক সম্পর্ক জারি রয়েছে—যেখানে ধ্বংস ও সৃষ্টি একসঙ্গে ঘটছে। এটা পরিষ্কার কোরআনে বলা আছে।

তবে নোকতা দিয়ে রাখার বিষয় হল—প্রকৃতির মধ্যে যে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়া সেটা আর মানুষের ইতিহাস বা মানুষ সম্পর্কিত কোরআনের সময়ের ধারণা এক নয়। মানুষের ক্ষেত্রে ধ্বংস-সৃষ্টির বয়ানেই শেষ নয়, সেখানে যোগ হয় আল্লাহর কাছে মানুষের ফিরে যাওয়ার ধারণা। প্রকৃতির সবই আল্লাহর কাছে ফিরে যায়। কিন্তু মনুষ্যের ক্ষেত্রে প্রকৃতি থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসূচক দিক রয়েছে, যা মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে দিয়েছে। প্রকৃতিতে এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রক্রিয়াকে একপ্রকার জুলুম মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই হল প্রকৃতি ও প্রাণের স্বতসিদ্ধ। কিংবা তাই প্রকৃতি।

আর মানুষ? একইভাবে মানুষও অসংখ্য প্রাণ ও প্রকৃতি প্রতি মুহূর্তে ধ্বংস করছে নির্বিচারে। অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া হত্যা করছে। অসংখ্য জীবাণু তার প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সে মেরে ফেলছে। আমাদের পায়ের তলায় পড়ে কত পিঁপড়া মারা যায়, কতো মশা মাছি পোকা মাকড় এমনিতেই পিশে মেরে ফেলি আমরা। মজা করেও আমাদের আনন্দের কাছেও বলি হয় কতো জীব, প্রাণ ও বস্তুবৈচিত্র্য তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে? আমাদের তৈরি সার কীটনাশকে আমরা আমাদের প্রয়োজনে কত প্রাণ হত্যা করি। তাই না! এগুলো কি প্রাণ নয়? প্রাণ যে ধারণ করে তাকেই তো প্রাণী বলে—তাইলে তো সবই প্রাণী। বৃক্ষ থেকে শুরু করে কতো কি আমরা মেরে ফেলি।

একমাত্র আমাদের জীবিকার কারণে মুরগির মতো একটি প্রাণি নিছক মনুষ্য জীবিকায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রকৃতিতে সে যে একসময় পাখি ছিল তা আর নাই। পাখি নামে তার আর আক্ষরিক পরিচয়ও বোধগম্য হয় না। শুধুই সে মানুষের খাবার ছাড়া যেন কিছুই নয়। ধানকে ধ্বংস করে আসা চাল থেকে শুরু করে আমাদের খাবারের প্রতিটি উপাদানই আমরা ভক্ষণের নামে কি এই প্রকৃতিনিচয়কে নষ্ট করি না? এখানে মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে জৈবিককতার দিক থেকে কোনো পার্থক্য তমিজ হয় না। বরং প্রকৃতির সব অংশ তো শুধু যতটুকু নিজের প্রয়োজনের জন্য না হলেই নয়, তাই সে ভোগ করে বা ধ্বংস করে। কিন্তু মানুষ তো ভয়াবহ জুলুম করে যাচ্ছে প্রকৃতির ওপর। বস্তু ও প্রাণের উপর। তাহলে মানুষ জীব-প্রাণ ও প্রকৃতি প্রজাতি থেকে কোন দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা?

মানুষের মনুষ্যত্ব, মানবিক আবেগ কিংবা তার প্রাকৃতিক ও পরমার্থিক নির্বিশেষে সর্বজনিন প্রেমভাব দিয়ে হয়ত তাকে আলাদা করা যায়। কিন্তু ইসলাম এ প্রেমকে অস্বীকার না করেও শুধু তাতেই সন্তুষ্ট না। কিংবা জীবন ও জগতপ্রেমকে ভিন্নভাবে নির্মাণ করে ইসলাম। ইসলাম মনে করে এ বিশ্বজগত মাত্রই প্রাণের জগত। কোরআনের মর্মের দিক থেকে বস্তুকে পর্যন্ত প্রাণময় বলা হয়েছে—যেখানে ধ্বংস ও সৃষ্টির আবর্তনশীল প্রাকৃতিক অবস্থা জারি রয়েছে। কিন্তু এ ধ্বংস বা বিনাশের মধ্য দিয়েই মানুষের পরম প্রকৃতি সাধিত হয় না।

শুধু সৃষ্টির প্রতি দয়া, প্রেমেই যে আধ্যাত্ম হয় তাতে ইসলামের খুব সন্তুষ্টি নাই। জীব হত্যা করলে, প্রাণনাশ করলে মানব হৃদয়ে যে মনুষ্য প্রেমের আকুলতা তৈরি হয়—যে মায়া দুলে ওঠে তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইসলাম শুধু তাতে খুব বেশি আন্দোলিত হবে না। কারণ জীব ও পশু হত্যায় মানবিক মায়ার আবেদন জাগিয়ে যে সাংস্কৃতিক বয়ান খাড়া হয় তাতে জীব ও প্রাণের ধারণা বিচ্ছিন্ন এবং অপরিচ্ছন্ন মোহাবিষ্ট এমনকি নিছক আধ্যাত্মপূর্ণ ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষের মধ্যে যে মনুষ্য সংবেদন তৈরি হয়, যে জীবোচিত প্রাকৃতিক আবেগের উদয় হয় এটা নিছক ধর্মীয় দিক থেকে পরমার্থিক হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

ইসলাম সেদিক থেকে অনেক বেশি ঐতিহাসিক ও সর্বজনীন। ইসলাম শুধু প্রেম ও বিচ্ছিন্ন পরমের সংবেদন তৈরি করে না, মানুষের হৃদয়ে দায় ও দেনার সর্বজনীন কুরবানীর সংবেদনা জাগিয়ে তোলে। মানুষের প্রকৃতিতে যে জীবোত্তীর্ণ ভাবসত্তা নিহিত আছে তাতে বিশ্ব প্রকৃতিকে লালন পালনের দায়বোধ তৈরি করে। ইসলামের প্রস্তাব হল, শুধু মানব জাতিই নয়, কুল মখলুকাত বা বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টিই মানুষের কাছে আমানত। যেমন আল্লাহর রবুবিয়াত বা লালন পালনের যে সিফাত বা গুণ রয়েছে, আল্লাহ তার নিজের এই গুণ মানুষের কাছে আমানত স্বরূপ দিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষ নিজেকে রব হিসেবে দাবি করতে পারবে না, কিন্তু এ প্রাণময় সমস্ত বিশ্বজগতের উপর রবের যে রবুবিয়াত বা লালন পালনের যেই পরমগুণ সেই লালন পালনের দায়িত্ব আমানত হিসেবে মানুষের উপর বর্তানো হয়েছে—এমনকি মানুষের ফিতরাতের মধ্যে তা নিহিত করে দেয়া হয়েছে। কাজে এ আমানতের ফলে কোনো মানুষের পক্ষে বিশ্বপ্রকৃতির উপর দাসত্ব-কর্তৃত্ব বিস্তার করার কোনো সুযোগ নাই।

নিছক প্রয়োজন ছাড়া বস্তুরাজির উপর অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো অধিকার নাই। কারণ বস্তুরও প্রাণ আছে। যেমন হযরত মুসা আ-কে যখন ফেরাউন বলল, তোমাদের রব কে। মুসা তার জবাবে বললেন, ‘আমাদের রব তিনিই, যিনি প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করে এর যথা প্রকৃতি ও আকৃতি দান করেন। এরপর তাতে এর পথনিদের্শক বা চালিকা শক্তি নিহিত করে দেন—‘রব্বুনাল্লাজি আ’ত্ব কুল্লা শাইয়িন খলক্বহু ছুমা হাদা’। (আয়াত-৫০, সূরা ত্বহা।)।

একারণে ইমানদারদেরকে প্রতিটি কাজ শুরুর আগে বিসমিল্লাহির রামানির রাহিম বলতে হয়। কাজ মানে স্বভাবতই প্রকৃতির কোন না কোন কিছুরই ব্যবহার বা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত হওয়াকেই বুঝায়। তো এ ব্যবহারে দেখা যাবে মানুষ অন্যকোনো বস্তু, জীব বা প্রাণকে নিজের কাজে-সুবিধায়-উপকারে ব্যবহার করছে—ভোগ করছে কিংবা হয়ত ধ্বংসও করছে। খেয়ে ফেলছে।

কিন্তু বিসমিল্লাহ বলার সাথে এর সম্পর্ক বা তাৎপর্য কি। বিসমিল্লাহর মধ্যে আল্লাহর দুটি সিফাত বা গুণবাচক নাম—রাহমান ও রাহিম আছে। এবং এর আগে সরাসরি আল্লাহও আছে। প্রথমত, এ দুটি শব্দের একটি ধাতু বা শব্দমূল হল রেহম। যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল গর্ভ বা কোল। যেটির প্রতীকী তাৎপর্য অনেক গভীর ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রবুবিয়াত বা লালন পালনের রূপক হিসেবে এ রেহম বা গর্ভ। অর্থাৎ কাজ করতে গিয়ে যে বস্তু-প্রাণ-জীবের ব্যবহার হবে, প্রকৃতির খেদমত বা সেবা নেয়া দ্বিতীয়ত, কাজ করতে গিয়ে মানুষ যে জিনিসের ব্যবহার করে, ভোগ করে বা যে প্রাণ নাশ করে, যে জীব জবাই করে সে তো তার আমানতদার। মালিক না। তার কোনো অধিকার নাই তা ক্ষুণ্ন করার। কারণ এ মানুষ যে প্রাণ ধ্বংস করছে, তা পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা তার নেই কিংবা কখনো একটি প্রাণ সৃষ্টির ক্ষমতাও তার নাই। যা তার হক না। কিন্তু তাকে উপায়হীন হয়ে, বাধ্য হয়ে জবাই করতে হয়ে, ভোগ করতে হয়। (এখানে তথাকথিত নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ মোকাবেলা হয়ে যায়)। তার উপকারে ব্যবহার করে।

সেকারণে নিজের এই বাধ্যবাধকতা মনে রেখে পরম বিনয়াবনত হয়ে একজন ইমানদার তার আমানতদারিতা কতটুকু পালন করে সে বিষয়ে ভাবিত হয়ে কায়মনোবাক্যে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আল্লাহর অশেষ রহমত ও করুণার আশ্রয় প্রার্থনা করে। এবং নিজেকে পরম করুণাময়ের কাছে সমপর্ণ করে। শুধু রবুবিয়াতই নয়, আল্লাহর প্রতিটি সিফাত বা গুণই মানুষের কাছে আমানত। যেমন আল্লাহর একটি সিফাত হল তিনি পুরো বিশ্বজগতের মালিক। তো মানুষ মালিক নয়, কিন্তু মালিকানা জিনিসটা মানুষের কাছে আমানত। অর্থাৎ যেমন সম্পত্তি, আপন সন্তান, নিজের দেহ, মন-চিন্তা-ভাব মোটকথা সবকিছুরই মানুষ আমানতদার মাত্র। চাইলেই কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম ব্যক্তির মত ব্যবহার করা যাবে না। আধুনিক দর্শনে যেমন ‘চিন্তা নিজের বরাতে চিন্তা করে’ ‘মানুষই তার সকল কর্মের স্বাধীন সার্বভৌম কর্তা’, মানুষ (মানে পশ্চিমা মানুষ) কোনো আল্লাহ বা ঈশ্বর-গডের বরাতে চিন্তা করে না—এই ভাব চিন্তার স্থান ইসলামে নাই।তাই মানুষ কখনো এসবের মালিক বলে কর্তা বলে বিশ্বাস বা দাবি করতে পারে না।

যখনই মালিক বলে দাবি করবে তার মানে ওই মানুষ আমানতের খেয়ানত করল, এবং একইসঙ্গে আল্লাহর সাথে শিরক করল। আর শিরক হল ভয়াবহ জুলুম। কারণ মানুষ কখনো আল্লাহর গুণের অধিকারি বলে দাবি বা বিশ্বাস করতে পারে না। যদিও মানুষ ফিতরাতগতভাবে আল্লাহর সকলপ্রকার সিফাত ও গুণের খেলাফত বহন করে। সেইকারণে মানুষের সবচেয়ে বড় আমল হল, আল্লাহর সমস্ত সিফাতকে নিজের মধ্যে সর্বোচ্চভাবে বিকশিত করা। অল্প কথায় এটুকু বলা গেল। এ বিষয়টি বহু আলোচনার দাবি রাখে। যাইহোক, এই যে আমানত বা খেলাফত এটার সাথে উপরে আলোচিত কোরবানির সম্পর্ক সরাসরি।  কারণ এ আমানতের দায়িত্ব পালন কবুল করে নিলে প্রথমেই নিজের নফস বা আমিত্ব জবাই করে দিতে হয়। প্রশ্ন হল, ইমানের প্রকৃতিতে ফায়দা, ফলাফল বা যুক্তির বালাই গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বলা যায় যে, এ আমিত্ব শেষ করে দিলে ফায়দা কি? এই প্রশ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

তিন.

কোরবানি শুধু নবি ইবরাহিম আ. থেকেই শুরু হয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বের প্রথম মানব ও নবি হযরত আদম আ. থেকেই শুরু। আদম আ.-ই প্রথম কুরবানী শব্দটির ব্যবহার করেন। কোরআনে হযরত আদম আ. এর সময়ের কুরবানীর ঘটনা বর্ণনায় ‘ কুরবান’ শব্দটি দেখা যায়। ঘটনা হযরত আদম ও হাওয়া আ. এর ঔরসে প্রথম—প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা­—যমজ সন্তান জন্ম হত। ছেলে মেয়ে ছাড়া হযরত আদম আ. এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ছেলে মেয়ে অর্থাৎ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।

বিশেষ জরুরতের কারণে আদম আ. এর শরিয়তে আল্লাহর তরফ থেকে এ নির্দেশ জারি করা হয় যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যার জন্ম হবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। পরবর্তীতে জন্ম নেয়া পুত্রের জন্যে সম্পর্কে প্রথম গর্ভ থেকে জন্ম হওয়া কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে তাদের মধ্যে বিবাহ বৈধ। কিন্তু আল্লাহর ইশারায় আদম ও হাওয়া আ. এর কোলে যমজ পুত্র-কন্যা কাবিল ও খুবই সুন্দরী এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই কন্যা সন্তান হয় কাবিলের সহজাত সহোদরা বোন। আর হাবিলের সহজাত বোনটি তুলনামূলকভাবে সেরকম সুন্দর ছিল না। বিবাহের সময় হলে শরিআ অনুযায়ী হাবিলের সহজাত বোন কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল চরম অসন্তুষ্ট হয়। কাবিল এ নিয়ম মেনে নিতে রাজি হয় না। কাবিল যেকোনোভাবেই হোক সে তার সুন্দরী বোনকেই বিয়ে করবে। এতে করে এক পর্যায়ে সে ভাই হাবিলের বিরুদ্ধে লেগে পড়ে। কাবিল দাবি করল, তার সহজাত বোনকেই তার সাথে বিবাহ দিতে হবে। সে তার এ দাবিতে অটল থাকল।

হযরত আদম আ. তার শরিয়ত মতো কাবিলের আবদার গ্রহণ করলেন না। কিন্তু তিনি হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিরোধ দূর করার উদ্দেশ্যে একটি ফয়সালা দিয়ে বললেন, তোমরা দুজনই আল্লাহর জন্যে নিজ নিজ কোরবানি পেশ কর। যার কুরবানী কবুল হবে, সে-ই ওই সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে পারবে। হযরত আদম আ. এর তাতে নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, যে হক এর উপর রয়েছে তার কুরবানীই গৃহীত হবে। সে সময় আল্লাহর তরফে কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি নিদর্শন ছিল, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীর জন্য পেশ করা বস্তুকে ভস্মিভূত করে অদৃশ্য হয়ে যেত। কুরবানীর জন্য পেশ করা যে বস্তু ওই অগ্নিশিখা ভস্মিভূত করত না, তা গ্রহণযোগ্য হতো না। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে তার সবচেয়ে প্রিয়তম দুম্বাটি কুরবানী হিসেবে পেশ করল। আর কাবিল করত কৃষি কাজ। সে কিছু শস্য-গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য দিল। অতঃপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কোরবানিটি ভস্মীভূত করে দিয়ে যায়। কিন্তু কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল তেমনই পড়ে রইল। এতে করে কাবিলের ভয়ঙ্কর ক্ষোভ তাঁতিয়ে ওঠে। এরপরের ঘটনা আপনারা জানেন। শেষ পর্যন্ত কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে।

কোরআন এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করে— ‘যারা বলে, আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন কোনো রসূলের প্রতি ইমান না আনি, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আমাদের নিকট এমন কোরবানি উপস্থিত না করবে, যা আগুন গ্রাস করে নেবে। হে নবি তুমি তাদের বলে দাও, ‘তোমাদের মাঝে আমার আগে অসংখ্য রসুল বহু নিদর্শন এবং তোমরা যা আবদার করেছ তা নিয়ে এসেছিলেন তখন কেন তাদের হত্যা করলে যদি তোমরা সত্যবাদী হয় থাক।’ সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৮৩। ‘আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কিছু কোরবানি নিবেদন করেছিল। তখন তাদের একজনেরই কোরবানি কবুল হয়েছিল। কিন্তু অপরজনের কোরবানি গ্রহণ করা হয়নি। সে (কাবিল) বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে (হাবিলকে) হত্যা করব। সে (হাবিল) বলল, আল্লাহ মুত্তাকি তথা তাক্বওয়া অনুসারীদের পক্ষ থেকেই তো কবুল করে নেন। যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে তোমার হাত প্রসারিত কর তবু আমি এর বদলে তোমাকে হত্যা করতে আমার হাত তোমার দিকে প্রসারিত করব না। কারণ আমি বিশ্বজগতের রব আল্লাহকে ভয় করি।’ আয়াত, ২৭-২৮, সূরা আল মায়িদা। কোরবানি মানে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

 

 

এছাড়া নুসুক, নাহর, জব্হ—এ তিনটি শব্দ দিয়েও কোরবানি বুঝানো হয়েছে। কুরবানী এবং নুসুক এর মানে কিন্তু ঠিক আক্ষরিক অর্থের মধ্যেই জবাই এর অর্থ নাই। তবে নাহর এবং জবহ মানে আক্ষরিক বা আভিধানিকভাবেই জবাই করা। হজ্জর সময় যে পশু কোরবানি করা হয় তাকে উদহিয়া বলা হয়। উদহিয়া মানে জবাই করা, উৎসর্গ করা। এ উদহিয়া থেকে আল আদহা মানে ইদুল আদহা। কোরবানি মানে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ। আর নুসুক মানে সকলপ্রকার ইবাদত, সাধনা বিশেষত স্পিরিচুয়াল বা মগ্ন সাধনাকে নুসুক বলে।

কিন্তু কোরআনে নুসুক বলতে কোরবানিই বুঝানো হয়েছে, যাতে নফসের ঊর্ধ্বে আল্লাহর মোকামকে কবুল করে নেয়ার বা ওই মোকামের সাথে মিলিত হবার মুতমায়িন কলব বা চির প্রশান্ত চিত্ত হাসিল হয়। এমনকি হযরত আদম এবং ইবরাহিম আ. এর সময়ই কোরবানির প্রথা ছিল তা নয়। কোরআনের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীর সব জাতির জন্যই আল্লাহর তরফে কোরবানির রীতি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কোরআন বলছে, অলি কুল্লি উম্মাতিন জাআলনা মানসাকাল লিয়াজকুরুস মাল্লহি আলা মা রজাকাহুম মিন বাহিমাতিল আনআমি— ‘এবং প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমরা কোরবানির একটি পদ্ধতি প্রচলন করেছি। যে প্রাণী তিনি তাদেরকে রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার ওপর তারা যেন তার নাম উচ্চারণ করে।’ আয়াত, ৩৪, সূরা হাজ্জ।

মিরপুর-১, ২২ নভেম্বর, ২০১১

আগের সংবাদক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আছেন ট্রাম্প?
পরবর্তি সংবাদকোরবানির গরুতে আকিকা দেওয়া যাবে?