একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: রাজনীতিতে নতুন যুগের শুরু

আবু আব্দুল্লাহ

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন গণনা শুরু হয়ে গেছে। গুণে গুণে হিশেব করলে নির্বাচনের আর মাত্র ৩৩ দিন ১২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট বাকি। ২০১৪ সালের বহুল বিতর্কিত নির্বাচনের পরে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিলো, তাও কেটে গেছে অনেকটাই। প্রায় ১০ বছর পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে সারা দেশে ঘটে গেছে নজিরবিহীন দুটি ছাত্র আন্দোলন, যা দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে অনেকটাই প্রভাবিত করতে পেরেছে। তাছাড়া, নির্বাচনের আগে আগে জোটের রাজনীতিতে ঘটে গেছে নতুন এক মেরুকরণ, যার কথা কিছুদিন আগ পর্যন্তও কেউ ভাবতে পারেনি। সব মিলিয়ে, অনেকদিন পরে বাঙলাদেশে সত্যিকারের নির্বাচনী আমেজ দেখা যাচ্ছে, যা দেশ ও জাতির জন্য খুশির বিষয়।

অথচ, বছরের শুরুতেও কেউই নিশ্চিত ছিলো না, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো, তা কীভাবে নিরসন হবে। বিএনপি’র সেই নির্বাচন বয়কট সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো, নাকি ভুল—তা নিয়ে এখনও চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থা মোটেই বিএনপির পক্ষে ছিলো না। এক পর্যায়ে দলটির অস্তিত্ব নিয়েই কথাবার্তা হতো সারাদেশে, ‘ঈদের পর আন্দোলন’ চুটকি হিশাবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো সেসময়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং অন্যান্য ইস্যুতে বিএনপির অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামির অবস্থাও ছিলো তথৈবচ।

অন্যদিকে, ২০১৩ সালের ৫ মে-র ঘটনার পর কওমিভিত্তিক ইসলামি দলগুলোও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ চাপেই ছিলো বলতে হবে। শাহবাগ এবং হেফাজতকে কেন্দ্র করে দেশে যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভাজন, তার খেসারত দিতে হয়েছিলো পুরো দেশকে। কওমিকেন্দ্রিক ইসলামি দলগুলো কমবেশি সবাই-ই হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে একত্র হয়েছিলো সেসময়। ফলে, ভবিষ্যত রাজনীতির প্রেক্ষিতে, কীভাবে ইসলামি দলগুলো ৫ মে-র ক্ষত কাটিয়ে দেশের রাজনীতিতে কামব্যাক করে, সেটাও কওমিসহ অন্যান্য মহলে ছিলো বেশ গুরুতর প্রশ্ন।

সে সময়ের প্রেক্ষাপটে কেউ ভাবতে পারে নাই যে, সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এরকম একটা নির্বাচনী আমেজ দেশে তৈরি হবে। বিশেষত, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পরেও, বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না—তা নিয়ে এক ধরণের সংশয় ছিলোই। এমনকি, সব দলের সাথে ইসির সংলাপ শুরু করার পর থেকে ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্তও বিএনপির সাথে কোনরকম শৈথিল্য দেখায় নি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৫ বছরের জেল, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন, ইসির সংলাপে বিএনপির ইভিএম ও সেনা-মোতায়েন সম্পর্কীত দাবি নাকচ, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ‘গায়েবি মামলা’, ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির প্রধান দুই দফা—খালেদাসহ দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, যে দাবির প্রেক্ষিতে ১৪’র নির্বাচন বর্জন করেছিলো বিএনপি, সেসব মেনে না নেওয়া—এসবই মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা। কিন্তু নভেম্বরের গোড়ার দিকে হঠাত সরকার থেকে ঐক্যফ্রন্টের প্রতি সংলাপের আহ্বান, দু’দফা সংলাপ এবং সর্বশেষ বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের দাবি অনুযায়ী ভোটগ্রহণ ও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় পেছানো—এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও নানা দাবি-দাওয়া অব্যাহত আছে, তবে এসব ঘটনা নির্বাচনের ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছে।

এবারের নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক যুগ পর বিএনপি নির্বাচনে আসছে, নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ডান-বাম-ইসলামিসহ প্রায় সবগুলো ফ্রন্ট। আবার নির্বাচন হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই। অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে জোটের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

নির্বাচনকে সামনে রেখে, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে ৭ দফা দাবিতে সম্প্রতি গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, বিএনপি এবং যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ে, ড. কামালের নেতৃত্বে গঠিত হয় এই নতুন জোট। শেষ মুহূর্তে জোট থেকে বাদ পড়ে বি চৌধুরীর বিকল্পধারা। ঐক্যফ্রন্ট দেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঐক্যফ্রন্টের প্রায় সকল শরিকই কোন না কোনভাবে আওয়ামি বা বাম ধারার রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিএনপির সাথে তাদের জোট বাঁধার ব্যাপারটি এত সহজ ছিলো না অবশ্যই। মূল প্রশ্নটিই ছিলো বিএনপির অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামি এবং অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সাথে কামাল হোসেনরা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় জোটে যাবেন তা নিয়ে। আবার কামাল হোসেনদের সাথে একই জোটে থাকা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিলো ২০ দলেও; বিশেষত ইসলামি দলগুলোর মধ্যে। বিকল্পধারাকে বাদ রেখেই ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণার মধ্য দিয়ে জামাত প্রশ্নে নিজেদের নীতিগত অবস্থান অনেকটা পরিষ্কার করে দেয় জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্ট। এই বোঝাপড়ার পথ সহজ ছিলো না অবশ্যই। এর ফলে, বহুদিন ধরে বিএনপির সাথে দেশের সেক্যুলার ও সুশীল সমাজের যে বিরোধী অবস্থান, তাতে রাতারাতি পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন বিএনপির জন্য কী ফল বয়ে আনবে, তা ভবিষ্যত বলবে। কিন্তু আপাতত এই পরিবর্তনকে বিএনপির জন্য কল্যাণকরই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিএনপির রাজনীতি গত কয়েকবছর ধরেই কূটনীতি-নির্ভর। মাঠের আন্দোলন থেকে আর কিছুই পাওয়ার নেই জেনেই বিএনপির এই অবস্থান। নির্বাচনের বছরে এসে এর সাথে যোগ হয়েছে বেশ কয়েকটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। খালেদা জিয়ার রায়ের পরেও বিএনপি নেতা-কর্মীরা কোন সহিংস আন্দোলনে যাননি, তারেক জিয়ার রায়ের পরেও না। আবার, সরকারের বেশকিছু ভুল পদক্ষেপও বিএনপির পক্ষে গেছে। কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে বিএনপি-জামাতকে দোষারোপ দলগুলোর জন্য শাপে বর হয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। এ দুটি আন্দোলনে সরকারের অবস্থান এবং সারাদেশের মানুষের রেসপন্স বদলে দিয়েছে অনেক হিশাব নিকাশ। নির্বাচনের কিছুদিন আগে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামাত প্রার্থী দেওয়া সত্ত্বেও বিএনপি প্রার্থী আরিফুলের বিজয়ও বিএনপির মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে।

দু একদিনের মধ্যেই বিএনপি দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। তার আগে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ পুরাতন ২০ দলীয় জোট আর নবগঠিত ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সফলভাবে আসন বন্টনজনিত প্রশ্নের মীমাংসা করা। খবরে প্রকাশ, নতুন-পুরাতন জোট মিলে মোট ৯০ আসনের দাবি জানিয়েছে বিএনপির কাছে, কিন্তু বিএনপি ছাড়তে চায় ৫০ আসন। অন্যদিকে, দুই জোটের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় বিএনপিরই হেভিওয়েট কোন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দী। ফলে, আসন সমঝোতার বিষয়টা সহজে নিষ্পত্তি হবে না বলেই মনে হয়। ইতিমধ্যে, বিদেশে বসে স্কাইপির মাধ্যমে তারেক জিয়ার দলীয় প্রার্থীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ এবং জবাবে সরকারের স্কাইপি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনার লাভের অংশটুকু আখেরে বিএনপির পক্ষে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। পাবলিক সিম্প্যাথি এবারের নির্বাচনে বিএনপির সবচাইতে বড় পুঁজি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আর সরকারের পক্ষ থেকে নমনীয় ভাব বজায় থাকলে, এবারের নির্বাচনে বিএনপির কামব্যাক ফাইট হবে দেখার মত।

আওয়ামী লীগ ও মহাজোট, হেফাজতের সাথে সন্ধি

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্যেও এবারের নির্বাচন বেশ চ্যালেঞ্জিং। পরপর দুটি ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশের তরুণদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে অনেকাংশেই। তারপরেও আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি কোন শৈথিল্য দেখায়নি। খালেদা-তারেকের রায় দেওয়া হয়েছে নির্বাচনের আগে আগেই, তাছাড়া বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট-বামজোটের পক্ষ থেকে আসা নির্বাচনকালীন সরকার, বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন এসব ব্যাপারও গ্রাহ্য করেনি তারা। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে ভালো খেল দেখিয়েছে কওমি মাদ্রাসার সনদের প্রশ্নে। ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে দেশের সেক্যুলার ও সুশীল সমাজের একটা বড় অংশের সমর্থন পেয়ে যখন বিএনপি উৎফুল্ল, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগ কওমি সনদের স্বীকৃতির ঘোষণা দেয়। এর ফলে হেফাজত ও কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে সমঝোতা করে তারা, যা প্রচলিত রাজনীতির ডান-বাম বা সেক্যুলার-অসেক্যুলারের হিশাব বদলে দ্যায়। এই নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রায় ৭০ টি ইসলামি দলের ৬৩ টাই আছে মহাজোটের সাথে, এর মধ্যে আবার আছে বিশ দলীয় জোট ভেঙে বেরিয়ে আসা ঐক্যজোট এবং খেলাফত মজলিস।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত তেমন কোন শৈথিল্য দেখানো হয়নি। বরং, সমস্ত পরিস্থিতি বিবেচনায়, দলীয় সরকারের অধীনে, সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়েই নির্বাচনে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার এবং সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে ইসির সিদ্ধান্তও তাদের পক্ষেই গেছে। তবে ২০১৪’র চে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। পাঁচ বছরে দেশে-বিদেশে পালটে গেছে অনেক কিছুই। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করে আওয়ামী লীগ, তাই এখন দেখার বিষয়।

বামজোট: দরকার নতুন চিন্তা, তরুণ নেতৃত্ব

গত জুলাই মাসে পল্টনের মুক্তি ভবনে গঠিত হয় বাম গণতান্ত্রিক জোট। ৮ টি বাম দল মিলে এই জোট গঠিত হয়। ৯০-এর পর থেকে এদেশে বাম দলগুলো ভোটের রাজনীতিতে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। বেড়েছে জনবিচ্ছিন্নতা, কমেছে রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রভাব। ক্ষমতাসীন সরকারের বর্তমান মেয়াদে বাম দলগুলো নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিশেষত, দুটি ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাম দলগুলোর নেতাকর্মী এবং দেশের সেক্যুলার সুশীল সমাজের অনেকেই নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সাথে বাম ছাত্র দলগুলো সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এ অবস্থার ভেতরেই গঠিত হয় বামদের এই জোট।

এই জোটে আছে জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলনও। বাম রাজনীতির যে পুরাতন ধারা, চিন্তা এবং আদর্শ, তা থেকে বেরিয়ে বাম রাজনীতিতে নতুন ধরণের রাজনৈতিক চর্চার সূচনা সাকির হাত ধরে ঘটবে বলে অনেকে মনে করছেন। মৌলবাদী ও আইডিয়ালিস্টিক, পরাজিত ও গণবিচ্ছিন্ন বাম রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে সাকি ভাবতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন। মাঠের রাজনীতিও ভালোই বোঝেন সাকি; ভাঙা হাত নিয়ে, বামজোটের প্রবল সমালোচনার মুখেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জন্মসভায় গিয়ে সাকি সেটা প্রমান করেছেন। তার দলের ঘোষিত  ‘জাতীয় সনদ’ বেশ আলোচিত হয়েছে।

বামজোট নির্বাচনে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যদিও সরকারের সাথে তাদের আলাপ ফলপ্রসূ হয়নি, তবু ‘আন্দোলনের অংশ হিশেবেই’ তারা নির্বাচনে যাবেন বলে জানান। উল্লেখ্য, বিএনপির মত বাম দলগুলোও ২০১৪-র নির্বাচন বর্জন করেছিলো। নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে নতুন চিন্তা ও তরুণ নেতৃত্বই পারে বামদের আবার গণমানুষের সাথে একাত্ম করতে। বিগত বরিশাল সিটি নির্বাচনে মনীষা চক্রবর্তীর জনপ্রিয়তা দেখে এমনটাই মনে হয়েছে।

ইসলামপন্থী দলগুলোর নতুন অভিজ্ঞতা

এই নির্বাচন দেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। দেশের প্রধান পাঁচটি ইসলামি দলই এবার সম্পূর্ণ নতুন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। প্রায় ৭০ টি দল এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, এদের মধ্যে ৬৩ টি দলই আছে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের সাথে। ৫ টি বিশদলীয় জোটের সাথে এবং ২ টি দল স্বতন্ত্র।

জামায়াতে ইসলামি প্রায় এক যুগ পরে নির্বাচন করছে, তাও আবার তাদের ৬৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী মার্কা ছাড়া। দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, বাতিল হয়েছে মার্কাও। মাঠের আন্দোলন আর রাজনীতির লড়াইয়ে সর্বস্বান্ত দলটি এবারের নির্বাচনে প্রথমে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবলেও, পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়েই তারা এবারের নির্বাচনে লড়বে। বিএনপির সাথে ৩০ আসনে তাদের সমঝোতার কথাও শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে কওমিভিত্তিক ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঘটে গেছে ব্যাপক রাজনৈতিক মেরুকরণ। রোহিঙ্গা ইস্যু, তাবলিগ ইস্যু এবং কওমি সনদ ইস্যুতে হেফাজতে ইসলাম ও কওমি নেতৃত্বের সাথে যেভাবেই হোক একটা সমঝোতা করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। ফলে, এবারের নির্বাচনে কওমিভিত্তিক প্রধান চারটি দলের দুইটিই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে আছে সরকারের সাথে। এই দুটি দলই আবার ২০ দল ছেড়ে মহাজোটের নৌকায় উঠেছে। এর মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোট ২০১৬ সালেই ২০ দল ত্যাগ করে। আর খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান) গত বছর এরশাদের নেতৃত্বে গঠিত ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’-এ যোগ দেয়। অপর বড় দল জমিয়ত ভেঙে গেলেও ২০ দলের সাথেই আছে। ২০ দলে আছে খেলাফত মজলিসের অন্য অংশটিও (মাওলানা ইসহাক)। ইসলামি আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলন স্বতন্ত্র নির্বাচন করবে বলেই শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে ইসলামি আন্দোলন তিনশো আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বলে আলোচনার কেন্দ্রে আছে।

ইসলামপন্থী নিবন্ধিত দল মোট ১০ টি। এর মধ্যে ৬ টি আওয়ামী লীগ এবং ২ টি বিএনপির সাথে আছে। বাকি ২ টি স্বতন্ত্র। হেফাজতের সাথে আওয়ামী লীগের সমঝোতা, কওমি সনদ, শোকরানা মাহফিল—সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছিলো এবার বেশ কয়েকজন আলেম সাংসদকেই হয়ত দেখা যাবে সংসদে। কয়েকদিন আগেও এ সংক্রান্ত আলোচনা ছিল তুঙ্গে। তবে নির্বাচনের মাঠের হিশাব আবেগে চলে না। আলোচনায় থাকা অনেক আলেমই নমিনেশন পাননি। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচন করতে চাইলেও, নমিনেশন পাননি। তাছাড়া, সরকারের সাথে এমন এক মুহূর্তে এমনভাবে আলেমদের ঐক্য হয়েছে, যা মেনে নিতে পারেনি কওমির তরুণ প্রজন্ম। তাদের মনে প্রশ্ন ছিলো, জিজ্ঞাসা ছিলো, যার কোন সদুত্তর তারা পাননি। ফলে, প্রবীন আলেমদের কেউই এই নির্বাচনী দৌড়ে তরুণদের আন্তরিকভাবে পাশে পাচ্ছেন না। আবার, দেশের ইসলামি দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত ও ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে, দেশের প্রধান দুটি দলের কোনটিতেই তারা একচ্ছত্র গুরুত্ব পাচ্ছেন না। তারপরেও, এবারের নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর ভূমিকার উপরে জয় পরাজয় অনেকটাই নির্ভর করবে।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাঙলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দল। এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক মোড়ের সূচনা করবে, একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক