ফেসবুকের উপস্থিতি ধর্মীয় অঙ্গনে যেভাবে প্রভাব ফেলছে

হামমাদ রাগিব

ইন্টারনেটের কল্যাণে গত ১০ বছরে সামাজিক যোগাযোগের জন্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ফেসবুক যেমন জনপ্রিয়, তেম্নি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক ও অনলাইন-কেন্দ্রিক যোগাযোগকে ভিত্তি বানিয়ে বহির্বিশ্বে চলতি দশকের একদম শুরুর দিক থেকে বিভিন্ন আন্দোলন ও জনমত গড়ে ওঠার নজির থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা সর্বপ্রথম পরিলক্ষিত হয়েছিল দুহাজার তেরোতে শাহবাগের কথিত ‘গণজাগরণ’-এর মধ্য দিয়ে। শাহবাগি ব্লগারদের অনবরত ধর্মবিদ্বেষের সূত্র ধরে তারপর হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল নাস্তিক্যবাদ-বিরোধী দুর্বার আন্দোলন।

হেফাজতের উত্থান, আন্দোলন এবং শাপলা-ট্রাজেডির সময় থেকেই এ দেশের ধর্মীয় অঙ্গন তথা ঐতিহ্যবাদী ও ইসলামপন্থী লোকজন, বিশেষ করে কওমি ছাত্রদের মধ্যে ফেসবুক ও অনলাইন-যোগাযোগ তুমুল ব্যাপকতা লাভ করে। মাদরাসা-ছাত্রদের এই অবাধ অনলাইন-সম্পৃক্ততা একদিকে যেমন কল্যাণকর, অন্যদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিরও কারণ বটে।

কল্যাণকর দিকটা হলো, আগে মাদরাসা-ছাত্রদের যে একটা বিচ্ছিন্নতা ছিল সমাজের সঙ্গে, ফেসবুকে ব্যাপক উপস্থিতি ও সক্রিয়তার কারণে তা এই কয়েক বছরে কেটে গেছে। একই ঘরানার লোকজনের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগেও এসেছে ব্যাপক গতি। আগে এক মাদরাসার ছাত্রের সঙ্গে আরেক মাদরাসার ছাত্রের খুব একটা পরিচয় ছিল না। এখন রাজধানীর কোনো মাদারাসার ছাত্রের সঙ্গে সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে যাচ্ছে সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, কিংবা অন্য কোনো সুদূর অঞ্চলের মাদরাসা-ছাত্রের।

সাধারণ শিক্ষাধারার মানুষদের সঙ্গেও ঘটছে পরিচয় এবং হৃদ্যতামূলক সম্পর্কের সূত্রপাত। এতে সাধারণ শিক্ষাধারার লোকজনের ভুল ধারণা ভাঙছে। তাঁদের অনেকেই একসময় মাদরাসা-পড়ুয়াদের ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ মনে করতেন, মনে করতেন এরা দেশ ও জগত সম্পর্কে খুব একটা কিছু জানে না। এই ধারণা থেকে তাঁদের ভেতর একটা অবজ্ঞাও ছিল মাদরাসাওয়ালাদের প্রতি। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে সেটা কাটতে শুরু করেছে। মাদরাসা-ঘরানার অনেক প্রতিভাবানের জ্ঞান, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং চিন্তার উচ্চমার্গীয়তা দেখে তাঁদের অনেকে বিস্মিত হন।

অনলাইন ভিত্তিক এই সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ভালো কিছু উদ্যোগ গড়ে উঠছে। এর ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন বিষয়ে ফেসবুক-কেন্দ্রিক ভালো কিছু গ্রুপ তৈরি হয়েছে। ইসলামি বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। বই ও প্রবন্ধ লেখকের বাইরেও মিনি ব্লগের সূচনা ঘটছে। অনেকে লিখছেন। তাঁদের একটা পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে ধর্মীয় অঙ্গনের প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। অনলাইন মিডিয়াগুলো, বিশেষত ইসলামিক সাইটগুলো অনেকটা ফেসবুকের উপরেই টিকে আছে।

ট্র্যাডিশনাল রাজনৈতিক অ্যাকটিভিজমের বাইরে মাদরাসা-ঘরানার মধ্যে ফেসবুক-কেন্দ্রিক অ্যাকটিভিজম তৈরি হয়েছে। যারা যে-কোনো ইস্যুতে শক্ত জনমত তৈরি করতে সক্ষম। দেখা গেছে, এই গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে জাতীয় মিডিয়াগুলো তাদের প্রতিবেদনের ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। ধর্মীয় বক্তব্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। এভাবে জনপরিসরে ধর্মপ্রভাবিত বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে এই ফেসবুককে কেন্দ্র করেই।

তবে ফেসবুক-কেন্দ্রিক এই অ্যাক্টিভিটিতে ক্ষতিকর দিকও আছে অনেক। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ শিক্ষার্থী। ফেসবুকে অধিক মনযোগ এবং সহজেই সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের সুযোগ থাকার ফলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতির কারণে ধর্মীয় অঙ্গনের মৌলিক শিক্ষা থেকে তাঁরা ক্রমশ দূরে সরে পড়ছে।

তাছাড়া মতপ্রকাশের জায়গাটা সহজলভ্য হবার কারণে মুরব্বি ও নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে শিষ্টাচার-বহির্ভূত মন্তব্যের একটা প্রথা চালু হয়েছে। যার ফলে গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, যেটা এ অঙ্গনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, আগের তুলনায় তা অনেক গুণে কমে আসছে।

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ সাধারণ শিক্ষাধারার অশুভ অংশের সাথে দ্রুত পরিচিত হচ্ছে ও সম্পর্কে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিচ্যুতির ঘটনায় তাই ভিন্ন মাত্রা এসেছে। বিচ্যুতি সবসময় ছিল। তবে সাহায্যকারী ও অনুসরণীয় কেউ ছিল না। ফেসবুক সেই ধারার সূচনা করে দিয়েছে।

আগের সংবাদবহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত ক্যান্সার-চিকিৎসা-সেবা : ব্যয় ও দুর্ভোগে দিশেহারা ভুক্তভোগীরা
পরবর্তি সংবাদহজযাত্রীদের পাসপোর্টে নতুন নির্দেশনা