‘আমার মনে হলো, যুদ্ধ করা আমার কাজ নয়।’।। ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমানের সাক্ষাৎকার-১ম পর্ব

ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান। বরিশালের কৃতি সন্তান। বহু ভাষাবিদ, আরবি ভাষা ও অভিধান শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ, লেখক, অধ্যাপক। শখের বশে লেখেন কবিতাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন প্রায় তিন যুগ। ২০১৮-তে অবসর নিলেও, মেটেনি তার অধ্যাপনার তৃষ্ণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মডার্ন ভাষা ইন্সটিটিউটে খণ্ডকালীন অধ্যাপকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, জ্ঞানপিপাসু মানুষদের জন্য খুলেছেন একটি নিজস্ব পাঠদানকেন্দ্র, যেখানে সব বয়সের মানুষ আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং কোরান-হাদিস নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে।

তার লিখিত ‘আল-মু’জামুল ওয়াফি’ আজ বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত ও ব্যবহৃত আরবি-বাংলা অভিধান। অথচ, এই অভিধানের পাণ্ডুলিপি নিয়ে দিনের পর দিন তাকে হাঁটতে হয়েছে রাস্তায় রাস্তায়। লেখালেখির শুরুর পথটা বন্ধুর হলেও, জীবনের সঠিক সময়ে সঠিক ডিসিশনটা নিতে কখনই ভুল করেন নি তিনি। অধ্যবসায় ও কর্মনিষ্ঠতায় এ যুগের আদর্শ হতে পারেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, খুব কাছ থেকে দেখেছেন যুদ্ধ। প্রায় তিন যুগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের জীবন্ত অংশ তিনি।

পরিশ্রম, সাধনা আর অধ্যাপনা—এই তিন নিয়ে তার জীবন। অবসর সময়েও এই তিনটি মূলনীতি নিয়েই সুখে আছেন নিভৃতিচারী এই আলেম মনীষী। ফাতেহ২৪-এর পক্ষ থেকে এক দীর্ঘ সাক্ষাতকারে, নীলক্ষেতে তার নিজস্ব পাঠদানকেন্দ্রে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম এই নিভৃতচারী আলেমের। হাসি-আড্ডায় বেরিয়ে এসেছে দারুণ সব কথা। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রথম পর্ব। 

জলুর রহমান: তো, কী মনে করে?

তুহিন:  হুজুর, মু’জামুল ওয়াফি-র লেখক আপনি, আপনার এই অভিধান তো বাঙলা অ্যাকাডেমির অভিধানের মত মাকবুল হয়ে গেছে সব মহলে। অনেকেরই আপনার ব্যাপারে অনেক আগ্রহ। আপনার অভিধান নিয়াও আগ্রহ আছে তাদের। এজন্যে আমরা আপনার জীবন আর অভিধান নিয়া একটা আলাপ করতে চাই।

ফজলুর রহমান: কোন পত্রিকার জন্য?

জামিল: ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডটকম, হুজুর।

ফজলুর রহমান: আচ্ছা! যে অভিধানের লেখক হিশাবে আমি পরিচিত, এটা সম্পর্কে একটা দুঃসংবাদ আছে। খুব রিসেন্টলি এইটা নকল করা হইছে। বাঙলাদেশে যা হয় আরকি। এতদিন শুনি নাই, এই রিসেন্ট শুনলাম। মানে হুবহু এই বই, কিন্তু আমার বই না! আজকাল তো করা যায় নাকি নানাভাবেই!

তুহিন: তাই নাকি? কী বিপদ! আচ্ছা হুজুর, আমরা শুরু থেকে শুরু করি একটু, এই প্রসঙ্গে আমরা আবার আসব।

ফজলুর রহমান: জি।

তুহিন: হুজুর, আমরা আপনার ছোটবেলার লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা এইসব ব্যাপারে কিছু স্মৃতি জানতে চাই। মানে ব্যাপারটা যদিও খুব ক্লিশে, কিন্তু আপনার এইসব ব্যাপারে অনেকেরই আগ্রহ আছে মনে হয়।

ফজলুর রহমান: সংক্ষেপে বলি, বিস্তারিত এই বইতে আছে (‘জীবনের কিছু কথা’। হুজুরের নতুন বই, আত্মজৈবনিক)। আমি প্রথমে পড়ি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে…

তুহিন: গ্রামেই?

ফজলুর রহমান: হ্যাঁ, গ্রামেই। ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়ে আমি মাদ্রাসায় ভর্তি হই। আমার আব্বা মাদ্রাসার সুপার ছিলেন, তার মাদ্রাসায়ই ভর্তি হইলাম।

তুহিন: এইটা কি কওমি মাদ্রাসা ছিলো?

ফজলুর রহমান: না, আলিয়া মাদ্রাসা। তো, প্রথম দুই ক্লাশ, আমার আব্বা ভাবলেন যে, দুই বছরে পড়ার কোন মানে নাই। আমার যা মেধা, তাতে আমি আরো আগেই শেষ করতে পারব। তাই আব্বা আমারে তিন মাস পরে বললেন যে, পুরা বইটা আমার সামনে পড়। তাইলে পরের ক্লাশে উঠিয়ে দিই। তো আমি প্রথম দুই ক্লাশ এক বছরে পড়লাম….

জামিল: মানে, সিক্স আর সেভেন?

ফজলুর রহমান: হাহা। তখন তো আর সিক্স-সেভেন ছিলো না, তখন ছিলো অন্যরকম; আলিম তখন ছিলো চার বছরে….

তুহিন: এটা কত সালের কথা?

ফজলুর রহমান: এইটা হলো ১৯৫৭। তো দাখেল ছিলো চার বছরের, আমি তিন বছর পড়ে দাখেল দিয়েছি। তারপরে আলেম চার বছরে, আমাদের সময়। তারপরে ফাজেল দুই বছর, কামেল দুই বছর। তো, প্রথমে তো আব্বার মাদ্রাসায় ছিলাম, পরে আব্বার কর্মস্থল চেঞ্জ হইলে, আমিও অন্য মাদ্রাসায় যাই। সর্বশেষ, ছারছিনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসা, আলিয়ার মধ্যে বিখ্যাত মাদ্রাসা, এইখানে এসে আমি দাখিল পরীক্ষা দিই। দাখিল, আলিম, ফাজিল—এই তিন পরীক্ষা এখান থেকে দিই। ১৯৬০ সালে দাখিল, ১৯৬৪ তে আলিম। দাখিল আর আলিমে বোর্ডের মধ্যে এলেভেন্থ হইলাম। ফাজিলে থার্ড হইলাম। আর কামিলে আমাদের সময় প্লেস ডিক্লেয়ার করা হইতো না। তো, ফাজিল পাশ করে আমি কামিল পড়ার জন্য ঢাকা আলিয়ায় চলে আসি। এবং এখানে এসে ফার্স্ট ইয়ার শেষ করে কলেজে ভর্তি হই। তার মানে, তখন ফাজিল পড়ে কলেজে ভর্তি হইতে হইতো। আর এখন আলিম পড়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তার মানে কতবছর বেশি পড়া লাগছে, বোঝ!

আচ্ছা, ফাজিলে যারা বাঙলা-ইংরেজি নিত, তারাই শুধু কলেজে পড়তে পারতো। সেই সুযোগটা আমি নিই কামিল সেকেন্ড ইয়ারে। ঢাকা আলিয়ার হোস্টেলে থাকতাম, পাশেই শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ, এখন তো বিখ্যাত, আপনারা চেনেন মনে হয়। তো সেখানে ইন্টার পড়লাম। কামিল সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা দিয়ে, পরের বছর দিলাম ইন্টারমিডিয়েট। তার মানে, দাখিল ১৯৬০, আলিম ১৯৬৪, ফাজিল ১৯৬৬, কামিল ১৯৬৮, আর ৬৯’ এ, গণঅভ্যুত্থানের বছর ইন্টারমিডিয়েট দিলাম। ওই যে, একবছর আগালাম, তাই ৭০’এরটা শেষ হইলো ৬৯’ এ। তো, শেখ বোরহানুদ্দীনে, সকল বিভাগের মধ্যে, আমি একাই ফার্স্ট ডিভিশন পাইছিলাম। তখন ছিলো ডিভিশন সিস্টেম। আমি একাই ফার্স্ট ডিভিশন পাইলাম, আর্টস থেকে। তারপরে, ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। ভর্তি হইছিলাম প্রথমে পলিটিকাল সাইন্সে…

তুহিন: হাহাহা! হুজুর তাইলে রাষ্ট্রনীতির ছাত্র….

ফজলুর রহমান: হাহাহা!

জামিল: এইখানে একটা প্রশ্ন করি। আপনার আব্বা তো একজন আলেম ছিলেন, মানে আলিয়া মাদ্রাসার আলেম ছিলেন…

ফজলুর রহমান: কোলকাতা আলিয়ার টাইটেল পাশ, এবং মুফতি আমীমুল এহসান (রহ.)-র ক্লাশমেট…

জামিল: আচ্ছা আচ্ছা! আচ্ছা, তো, আলেম ফ্যামিলি হিশাবে, পরবর্তীতে যে কলেজে বা ভার্সিটিতে পড়া, এই ব্যাপারে রেস্ট্রিকশন ছিলো না? মানে আমাদের ট্রাডিশনাল আলেম পরিবারের যে প্রথা আরকি….

তুহিন: মানে, কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ার ব্যাপারে যে বাধা দেওয়ার ব্যাপারটা আরকি…

জামিল: হ্যাঁ। তো এইক্ষেত্রে, আপনাদের ফ্যামিলিতে শিক্ষাগত ব্যাপারে কোন আলাদা দৃষ্টিভঙ্গী ছিলো কিনা?

ফজলুর রহমান: এটা আসলে, আমি আরেকটু গোড়ায় যাই। ক্লাশ ফাইভ পড়ে একটা ব্যাপার সামনে আসলো যে, আমি কি স্কুলে পড়ব না মাদ্রাসায়? রান্নাঘরে বসে আব্বা আর আম্মার এই কথাবার্তা হচ্ছিলো। তো, এইটাই সবাই ভাবছিলো যে, আমার এলাকার ভালো হাই স্কুল যেইটা ঐটাতেই যাব, পড়ব; তো আমার আব্বা চট করে বললেন কী, তুমি মলুহার মাদ্রাসায় ভর্তি হও। তা আমার আর স্কুলে যাওয়া হলো না। তো মাদ্রাসায় চলে গেলাম।

এখন, মাদ্রাসা শেষ করে, তা ইংরাজি লাইনেও তো একটু পড়তে হবে! মাদ্রাসায় তো কামিল শেষই করলাম, কওমি মাদ্রাসা তো না, আলিয়া! তাইলে কামেল তো পড়লামই, এবার ঐ লাইন। তা কোথায় পড়ব? ঐ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি!

তুহিন: আচ্ছা! আগে পলিটিকাল সাইন্স নেওয়ার ইতিহাসটা একটু কন, হাহাহা!

ফজলুর রহমান: হাহাহা! আচ্ছা, পলিটিকাল সাইন্স নেওয়ার কারণ হলো, ভার্সিটিতে পলিটিকাল সাইন্স পড়তে গেলে, ইন্টারে থাকা লাগে সিভিক্স, পৌরনীতি আরকি! তো ইন্টারে পৌরনীতির দুইটি বিষয়েই আমি ফার্স্ট ডিভিশন পাইলাম, দুই পেপারেই, বেশ ভালো রেজাল্ট! তো, আমি ইসলামিক স্টাডিজ বা আরবি, এ তো পারিই; এই দুটোতেই আমার লেটার আছে। দুইটাতেই এইটি আপ, তো ভাবলাম, একটু জেনারেল পড়াশুনা করি। মানে তখনকার বয়স, বোঝোই তো, মানে মাদ্রাসায় তো পড়লামই, এখন একটু…

তুহিন: হ্যাঁ, এখন একটু অন্য কিছু, হাহা! এমনে, পলিটিক্স নিয়া আগ্রহও ছিলো মনে হয়….

ফজলুর রহমান: না না, পলিটিক্স নিয়া আগ্রহ ছিলো না। পলিটিক্স করার ব্যাপারে আমার আগ্রহটা একটু কম, সেইটা আবার আরেক জিনিশ।

জামিল: আচ্ছা, আচ্ছা!

ফজলুর রহমান: যাই হোক, তো বিষয়টা যেহেতু ভাল, আমার এই বিষয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডও ভাল, আমি ভর্তি হয়ে গেলাম। তো, তিন মাসের মধ্যে সাবজেক্ট চেঞ্জ করা লাগে।

তুহিন: হ্যাঁ, মাইগ্রেশন…..

ফজলুর রহমান: হ্যাঁ। তো, আমার আব্বা এই সাবজেক্ট নেওয়ায় খুব মন খারাপ করলেন।

তুহিন: হাহা, এইখানে আইসা আর স্বাধীনতা দেওয়া গেলো না….

ফজলুর রহমান: হাহাহা। এইটা আমি শুনছি আমার এক ফুফাতো ভাইয়ের কাছে। সে আমারে বললো যে, তুমি তো ঐখানে গেছ, মামা তো মন খারাপ করছে!

জামিল: আপনাকে কিছু বলে নাই?

ফজলুর রহমান: না, আমি তো ঢাকা। আমারে কিছু বলে নাই। তো এইটা শুনলাম। আর আমার নিজের মধ্যেও চিন্তা আসলো যে,আমি যেই কাজটা ভাল পারি, যেইটা ভাল বুঝি, সেইটাই যদি করি, তো আমার জন্য ভাল। এই বুদ্ধিটা যে তখন হইছিলো, এইটা আমার সৌভাগ্য। আমি যদি পলিটিকাল সাইন্সে থাকতাম, তাইলে টেনে মেনে একটা সেকেন্ড ক্লাশ পেতাম, ক্লাশে ফার্স্ট হইলেও। কারণ, পলিটিকাল সাইন্সে ফার্স্ট ক্লাশ তখন পায়ই না বলতে গেলে। আচ্ছা, তো আমি আরবিতে চলে আসলাম। তবে, তখন তো মূল অনার্সের সাবজেক্টের সাথে দুইটা বিষয় সাবসিডিয়ারি পড়তে হত, এখন তো সিলেবাস অন্যরকম। আমি সাবসিডিয়ারি রাখলাম দুইটা বিষয়, পলিটিকাল সাইন্স আর বাঙলা সাহিত্য।

তুহিন: সাহিত্যের প্রতি একটা আগ্রহ ছিলো….

ফজলুর রহমান: হ্যাঁ, সাহিত্যের প্রতি একটা আগ্রহ তো ছিলই, মাতৃভাষা চর্চা, বাঙলায় লেখা। এইজন্যে এখনও আমি, একটু লিখতে ভালোবাসি, ফেসবুকে যেহেতু একটা সুযোগ আছে…..

তুহিন: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ফলো করি আপনারে, রিকুও দিছিলাম, এক্সেপ্ট কইরেন।

ফজলুর রহমান: তাই নাকি? হাহা, আচ্ছা। তো ঐ দুটো সাবসিডিয়ারি রাখলাম। এর মধ্যে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। ১৯৭১। এই সময়ে আমি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। ঢাকা ভার্সিটিতে।

তুহিন: থাকেন কোথায় তখন?

ফজলুর রহমান: হলে থাকি, মুহসিন হলে। হাজী মোহাম্মদ মুহসীন হলে আমার অ্যালুট ছিলো। আমার এক মামা ছিলেন, চাচাতো মামা, একই বয়সী, উনি পিলখানা রাইফেলস কলেজের বাঙলার অধ্যাপক ছিলেন, এখন অবসরে গেছেন। তো উনিও কামেল পাশ। একসঙ্গে কামেল পড়েছি, একসঙ্গে ইন্টার দিয়েছি, একসঙ্গে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। আমি পলিটিকাল সাইন্স, উনি বাঙলা। পরে আমি আরবিতে চলে আসলাম, উনি আর চেঞ্জ করেন নাই। তো আমরা দুইজন একসাথে এক হলেই থাকি, পাশাপাশি রুমে। ওই বাঙলার অধ্যাপকেরা কী পড়ায় না পড়ায়, আমারও তো সাবসিডিয়ারি বাঙলা, একটু আগ্রহ আছে। তো ওর কাছ থেকে শুনি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। ৯ মাসের মধ্যে যারা যুদ্ধে যাওয়ার তো গেছে। আমাদের বন্ধু-বান্ধব, ক্লাশমেট অনেকেই গেছে। কিন্তু আমি যাই নাই। আমার মনে হইলো যে,—না, যুদ্ধ করা আমার কাজ না। এবং যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন এই যে মেজর জিয়ার ভাষণ, আমি শুনেছি নিজের কানে…

তুহিন: রেডিওতে?

ফজলুর রহমান: হুম্ম। ‘আমি মেজর জিয়া বলছি।’

জামিল: কোথায় ছিলেন তখন?

ফজলুর রহমান: গ্রামের বাড়িতে। ঘটনাচক্রে, আমি তখন গ্রামে। আমার আব্বা রান্নাঘরে বসে মনে হয় খাচ্ছেন….

জামিল: না, মানে কতদিন আগে যাইতে পারছিলেন?

ফজলুর রহমান: মানে , ওই স্বাধীনতা যুদ্ধের?

তুহিন: হ্যাঁ, ২৫ মার্চের পরেই তো গেছেন, নাকি?

ফজলুর রহমান: না, ২৫ মার্চের আগে গিয়েছিলাম। কী একটা কারণে যেন, ২৫ মার্চের আগেই গিয়েছিলাম। তো তারপরে আমার অন্যান্য আত্মীয়স্বজন, সবাই হেঁটে গেছে। মানে ২৫ মার্চের পরে তো লঞ্চ, বাস সব অন্যরকম। আমার মামাতো ভাই টাই, সবাই হেঁটে গেছে, কেউ ফরিদপুর পর্যন্ত, কেউ আরো বেশি। আমার ঐ হাঁটাটা আর লাগে নাই।

তুহিন: হাহা! আগেই চইলা গেছেন!

ফজলুর রহমান: হ্যাঁ, আমি আগেই কী কারণে যেন চলে গেছিলাম। তো আমার ঐসময় রেডিও শোনার খুব বাতিক ছিলো। আমার নিজের একটা রেডিও ছিলো, নিজের কেনা….

জামিল: আচ্ছা এইখানে একটু প্রশ্ন করি। আপনাদের সাথীরা যারা যুদ্ধে গেলো, কেউ রাজাকার কেউ মুক্তিযোদ্ধা, এদের কি কোন পূর্ব পরিচয় ছিলো ছাত্র বয়সে? মানে, তারা যে একেকজন একেকটা বাছলো, এর কারণ কী?

ফজলুর রহমান: ব্যাপারটা আমার কাছে এরকম ছিলো তখন, যারা একটু আধুনিক লাইনের, তারা বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা। আর যারা একটু আরবি টারবি লাইনের, আলেম ওলামার সন্তান, তারা পাকিস্তানের পক্ষে। মানে, এক গ্রুপ বাঙলাদেশের স্বাধীনতা চায়, আরেক গ্রুপ পাকিস্তানরে এক রাখতে চায়, এই দুই গ্রুপ তো? তো যারা একটু আলেম উলামার ছেলেপেলে, আরবি লাইনের এরা মুক্তিযুদ্ধে কম গেছে। একেবারে যায় নাই তা না। গেছে, কম। আর যারা সেরকম না, তারা বেশি গেছে।

জামিল: কিন্তু, যারা হইছে যে, পাকিস্তানের পক্ষে গেছে, তারা কি সবাই জামায়াত বা ওইপন্থী ছিলো?

ফজলুর রহমান: উম্মম্মম্মম্মম্ম……

তুহিন: মানে এদের কোন দলীয় পরিচয় ছিলো কিনা আসলে?

জামিল: নাকি একটা আবেগ থেকে গেছে?

ফজলুর রহমান: যেটা ছিলো, সেসময় তো ইউনিভার্সিটিতে ইসলামি ছাত্র সংঘ ছিলো। এখন যেটা ছাত্র শিবির। তো, তাদের মূল দল জামায়াতে ইসলামি যেহেতু পাকিস্তানের পক্ষে তারাও পাকিস্তানের পক্ষে। এছাড়াও, যারা একটু দ্বীনদার, পরহেজগার, মুত্তাকি এরাও পাকিস্তানের পক্ষে ছিল মনে মনে, যুদ্ধে কম গেছে। আর যারা আধুনিক, ইংরেজি লাইনের, তারা বেশি গেছে। এটা একটা মোটাদাগে ভাগ। ওইদিকের কেউ যে রাজাকার হয় নাই, এদিকের কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয় নাই, এরকম না!

জামিল: যেমন সাজ্জাদ হোসাইনও তো….

তুহিন: হ্যাঁ, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, আলী আহসানের চাচাতো ভাই মনে হয়।

ফজলুর রহমান: তো আমি বাড়িতে ছিলাম, রেডিও শুনতাম। গণ্ডগোলের কথা তো শুনলাম। তা একদিন আমি বাইরে বসে রেডিও নিয়ে একটা আমগাছের নীচে—গাছটা আছে এখনও—রেডিও নিয়ে শুনতেছি, সকালবেলা। ২৭ মার্চ, সকাল ১০ টায়। ঘোষণা তো হইছে ২৬ মার্চ রাতে, সকালে আবার রিপিট হচ্ছে। তা আমি খালি ঘুরাই রেডিও, কোলকাতা শুনি, ঢাকা শুনি। তো ঘুরাইতে ঘুরাইতে চিটাগাং। আগে তো ওই গান টান শুনতাম, রাজশাহী শুনতাম, ঘুরাইতাম খালি। তো ঘুরাইতে ঘুরাইতে চিটাগাং গেছি, তখন শুনতেছি—’আমি মেজর জিয়া বলছি, বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’ এই যে ঘোষণাটা। তো আমি রেডিওটা রেখে দৌড় দিয়ে আব্বার কাছে চলে গেছি। বললাম আব্বা, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

জাস্ট এই ভাষায় বলছি। তবে, তখন তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, একটু বোধবুদ্ধি আছে…..

তুহিন: বয়স কত তখন?

ফজলুর রহমান: কত, এই তো তোমাদের মতই! তো কিছু তো বুঝি। একটা সচেতনতা তো আছে যে, দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে। তা আমি আব্বারে বললাম, আব্বা! এই যে যুদ্ধ, এখানে তো অনেক প্রাণহানি হবে, খুনাখুনি হবে! কিন্তু আমরা যেন কোন দলে না যাই। মানে না মুক্তিযুদ্ধে যাই, না রাজাকার হই। মানে এই যে দুই দল, এরা তো একে অপররে মারবে, এইটুক বুঝতে পারতেছি। তো আমরা যেন মারার মধ্যেও না যাই, মরার মধ্যেও না যাই।