বিএনপির ভবিষ্যত, ভবিষ্যতের বিএনপি

ইমরান চৌধুরী ঃ 

মনে হচ্ছে যেন, বিভিন্ন গোষ্ঠী থেকে বিএনপির নেতৃত্ব হস্তগত করারও চেষ্টা চলছে। হিসাবটা যেন এমন, বেগম জিয়া ও তাঁর পরিবার রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হলে এতো বড় ও স্থায়ী কর্মীবলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই বেগমোত্তর জমানায় টিকে থাকার চেষ্টা করা। এহেন সম্ভাব্যতার প্রেক্ষাপটে পুনর্বাসনের নামে বিএনপিকে কব্জায় নেয়ার বহুমুখী তৎপরতা চলমান।

আর এর সাথে কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না থেকে শুরু করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পর্যন্ত অনেকেই আছেন বলে মালুম হয়। সময় গড়াতে থাকলে বিএনপির এমন আরো স্বয়ংবর প্রত্যাশীর দেখা মিলবে। তবে কথা হচ্ছে, উল্লেখিত কেউই বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বেচ্ছাধীন শক্তির অধিকারী নন। এরা সকলেই কারো আনুকূল্যের উপর নির্ভরশীল, এবং সেই সূত্রে কারো না কারো দম দেয়া পুতুল।

বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠী কখনো বিলুপ্ত হবে না। যেমন হবে না আওয়ামী লীগের। এই ধারাবাহিকতা কংগ্রেস, মুসলিম লীগের সময় থেকে চলে আসা। এদের নেতৃত্বে বিবর্তন এসেছে, বদল এসেছে, এমনকি নামধামও বদলেছে। কিন্তু বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানের এই মেরুকরণ থেকেই গেছে।

স্বাধীনতার পর সিরাজুল আলম খান, আসম আবদুর রবদের মতো অতীত ভুলে যাওয়া ইউরোপীয় মার্ক্সের মরণোত্তর বাঙ্গালী মুসলিম ঔরসজাত ছাত্ররা তা ধরতে পারেননি বলে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ছত্রধর জাসদ করে ব্যর্থ হয়েছেন।

অপরদিকে, জেনারেল জিয়াউর রহমান এই ভুল করেননি। রাজনীতি নামার শুরুতেই তিনি বিশেষভাবে মধ্য-ডানপন্থীদের নেতৃত্ব নেয়ার কর্মসূচী নেন। তখনকার পরিস্থিতিতে ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজনীতিতে আরো শক্তি অর্জন করতে তিনি টেনে নেন মাওলানা ভাসানীর অনুসারী চীনপন্থি কমিউনিস্টদের। এতে করে, জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটির একটি ‘বামের ডানে, এবং ডানের বামে’ ভাবমূর্তি গড়ে উঠলেও এটা বলা যায় যে, বিগত শতকের চল্লিশের দশকের পর প্রথম তিনিই ফলপ্রসূভাবে বাংলার সমাজের মধ্য-ডানপন্থী অংশটিকে রাউন্ড আপ করেন, এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে তার স্থায়িত্ব দেন।

অপরদিকে, মধ্য-বামপন্থী গোষ্ঠীর সকলেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের নয়। এদের সূত্রপাত মূলত শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর আবুল হাশিমের সমর্থক কুসুম কুসুম সমাজবাদী ঘরানার তরুণ মুসলিম লীগারদের দ্বারা, যারা মধ্য-ডানপন্থীদের মতোই পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, কিন্তু ১৯৪৭ সালে নতুন দেশে নিজেদের জায়গা হারিয়ে ফেলেছিলেন সস্তা রাজনীতির শিকার হয়ে।

এই গোষ্ঠীটি বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতার পথে হেঁটেছে। আর পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পর কমিউনিস্টদের পুনর্বাসন বা আশ্রয়ের জন্য এই গোষ্ঠীর প্রধান সংগঠন আওয়ামী লীগ ছিলো সবচেয়ে ভোগ্য সফট টার্গেট। এদের সাথে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায় থেকেই আগত কংগ্রেস সমর্থক বা কংগ্রেস ভাবাপণ্ণ রাজনীতিবিদরা (যেমন, আবুল মনসুর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর প্রমুখ) এসে মধ্য-বামপন্থী গোষ্ঠীর সামগ্রিক মনস্তত্ত্বে একটি স্বতন্ত্র আকৃতি দেন।

মধ্য-ডানপন্থী গোষ্ঠীটি বারবার বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন আকারে সংগঠিত হয়েছে। অপর গোষ্ঠীটি এখনো আওয়ামী লীগ হিসেবেই থেকেছে। এর নেতৃত্বের বিবর্তন বলতে, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এখন শেখ মুজিবের কন্যা হাসিনা ওয়াজেদ যে আকারে গোষ্ঠীটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাতে পুরানো আওয়ামী লীগ, আর অনুপ্রবিষ্টদের একটি সাইনবোর্ড বা মনস্তাত্ত্বিক সেতুবন্ধ হিসেবে তিনি নিজেকে দৃঢ় রেখেছেন। এজন্যই তিনি নিজেকে ধর্মপরায়ণা হিসেবে যেমন তুলে ধরেন, তেমনি ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবেও নিজেকে প্রক্ষিপ্ত করতে সচেষ্ট থাকেন। যদিও হালে তাঁকে ঘিরে সৃষ্ট কাল্টের চাদরে এই মেরুকরণ আবৃত রয়ে আছে।

জিয়াউর রহমানের বিধবার পরিচিতিতে রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া আরো নিবিড়ভাবে স্বীয় নেতৃত্ব সুসংহত করতে পেরেছেন। তাঁর দলেও কমিউনিস্ট, মুসলিম লীগার রাজনীতিবিদদের মেরুকরণ আছে। তবে তিনি দৃশ্যত দুই উপদলের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। আর এটাই বিগত শতাব্দীর শেষে জামায়াতে ইসলামী ও মাদ্রাসা কেন্দ্রিক কিছু দলকে তাঁর দিকে টেনে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তা সত্ত্বেও নিশ্চয়ই তিনি দুই উপদলেরই আশ্রয়স্থল। আর এভাবেই তিনি সব ধরে রেখেছিলেন।

যাহোক, যা ব্যক্ত করতে চাই তা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি থাকছে না, এমনটা যদি ধরেও নেই, তথাপি বাংলার সমাজে মধ্য ডান আর মধ্য ডানের রাজনৈতিক মেরুকরণ থাকছেই। এর অন্যথার সুযোগ কম। সেই সর্বহারা পার্টি, গণবাহিনী, জেএমবি থেকে হালের আইএস, বা হিজবুত তাহরীর প্রভৃতির মতো নানা কর্মকাণ্ড, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার প্রসারণের সূত্রে পিউরিটান ধর্মীয় দর্শন সালাফিবাদকে বাংলায় টেনে আনার মাধ্যমে এদেশে কট্টরপন্থী ও একমুখী আদর্শ কায়েমের বহু চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি।

ফলে এখন সম্ভবত, সংশ্লিষ্ট মহলে এহেন বার্তাই ছড়িয়েছে যে, এদেশে রাজনৈতিকভাবে যদি কিছু করতে হয়, তাহলে এই দুই গোষ্ঠীকে ঘিরেই করতে হবে। কারণ এরাই বাংলাদেশের জনগণের সবচেয়ে বড় অংশের মনস্তত্ত্বকে পরিচালিত করে আসছে বিগত সাত দশক ধরে। তবে এই মনস্তত্ত্বের সূত্র আরো প্রাচীনে নিহিত। এটা বাংলায় ইসলামের আবির্ভাবের প্রকৃতির ইতিহাসের সাথে জড়িত। বলা বাহুল্য, এদেশে ইসলাম তলোয়ার আনেনি। এদেশে ইসলাম এসেছিলো অনেক নম্র ও মানবীয় সুরতে, যা বর্ণবাদে নিষ্পেষিত বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণ হিন্দুদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলো। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এদেশের আজকের মানুষ ওই মানুষদেরই আওলাদ-আসহাব।

আমার চিত্তাকর্ষক লাগছে এই দেখে যে, বিএনপির দুর্দশার সুযোগে কোন কোন মহল এখনই সুদূরপ্রসারীভাবে নিজেকে সংগঠিত করতে শুরু করেছে বাংলাদেশের মধ্য-ডানপন্থী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব হস্তগত করতে। বলা বাহুল্য, কাল আওয়ামী লীগের কোন বিপদ হলেও একই তৎপরতা ও প্রবণতা দেখা যাবে…!