
হামমাদ রাগিব
মাদক ব্যবসায়ী র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত, ক্রসফায়ার করে অপরাধীকে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ধর্ষণ-মামলার আসামির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার, গলায় চিরকুট ঝুলানো—’ধর্ষণের কারণে আমার এই পরিণতি’—এই রকম খবর আমাদের দেশে প্রায় রোজই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে।
আবার ধর্ষণ মামলার বিচার না হতে হতে ক্ষোভ ও জিদ থেকে অজ্ঞাত লোক দ্বারা ধর্ষক-হত্যার একটা প্রবণতাও সম্প্রতি শুরু হয়েছে। পুরো এই প্রক্রিয়াগুলো বিচারের বাইরে করা হয়। আসামী তার ন্যায্য বিচার পাবার আগে, এমনকি গ্রেপ্তার হয়ে আদালতের কাঠগড়ায় যাওয়ার আগেই তাদেরকে হত্যা করে ফেলা হয়। এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ইসলাম কীভাবে দেখে, এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম রাজধানীর দুটো বিশেষায়িত মাদরাসার দুজন তরুণ মুফতির সঙ্গে।
মাদরাসা উমর ইবনুল খাত্তাবের সহকারী মুফতি মাওলানা জামিল বলেন, ‘যে কোনো বিচারব্যবস্থায় বিচারের আগে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বিষয়। অপরাধ প্রমাণিত হবার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘বিচ্ছিন্ন’ অংশ বা সমাজের কোনো উগ্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিচার করার চেষ্টা করা হলে তাতে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ে। ইসলাম একে কোনোভাবেই সমর্থন দেয় না। ইসলামি ব্যক্তিত্বরা ফতোয়া দিতে পারেন, ধর্মীয় বিষয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন, তবে সেটার প্রয়োগ বিচার বিভাগের মাধ্যমেই হতে হবে। নয়তো বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণেই বাংলাদেশে সশস্ত্র বামদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে, যা একপর্যায়ে চুরি-ডাকাতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। এক সময় তাঁদের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো ছিল। কিন্তু পরে তাঁরা ঠিক থাকেননি।
‘একইভাবে ইসলামি ইতিহাসে খারেজি ও শিয়ারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়েছিল। শিয়াদের একাংশ অর্থাৎ ইসমাইলিয়া শিয়ারা এতে প্রচণ্ড খ্যাতি অর্জন করে। একপর্যায়ে তাদের নাম হয়ে যায় বাতেনিয়াহ ও হাশিশিয়াহ। তারা জনমানবহীন অঞ্চলে দূর্গ করে মানুষের সম্পদ লুট করত। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করত। নেশাদ্রব্য মেশানো ছিল তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ কারণে তাদের নাম হয়ে যায় হাশিশিয়াহ। ইসলামি ইতিহাস সাক্ষী, তাদের মাধ্যমে ভালো কোনো কাজ হয়নি। তারা শেষপর্যন্ত ক্রুসেডারদের সাথে মিলে যায়। এ কারণেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জামাআতের সাথে থাকতে বলেছেন। বিচার বহির্ভূত হত্যা জামাআতের নীতির পরিপন্থী। তাই আমরা এর বিরোধিতা করি।
‘বিচার বহির্ভূত হত্যার অর্থ কী? একটা সমাজে ছিনতাই, মাদক বা অপরাধ বেড়ে গেছে, ফলে এই অপরাধ দমন করতে অভিযুক্তদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া হত্যা করে ফেলা। এই হত্যা করার মধ্যে বিপদের কয়েকটা জায়গা আছে। প্রথমত, কাউকে বিচার ছাড়া হত্যা করার লাইসেন্স রাষ্ট্র বা ধর্ম দিতে পারে কি-না। দ্বিতীয়ত, ‘অপরাধী’কে যে লোকটা শায়েস্তা করছে, সে অচিহ্নিত থেকে যাচ্ছে। এইটাও আরেকটা অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেননা সে বৈধ প্রক্রিয়ায় কাজটা করছে না। এবং এর শেষমেষ পরিণাম হয়ে দাঁড়ায় সমাজে যে কেউ যে কাউকে হত্যা করার এক অবাধ লাইসেন্স নিয়ে নেয়। অতএব সমাজে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অবশ্যই সবাইকে বিচার-আচারের দিকটার পক্ষে দাঁড়ানো উচিত। বাছবিচার ছাড়া আইনের আওতার বাইরে এইভাবে চোখের বদলে চোখ, আর ধর্ষণের বদলে হত্যা অসভ্য সমাজে মানায়, কোনো সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র একে মেনে নিতে পারে না।’
রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামেয়া আবু বকরের মুফতি, লেখক ও গবেষক মাওলানা রেজাউল করীম আবরার পুরো ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেছেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি চলমান অপরাধ দমনে ইসলামের হুদুদ ব্যবস্থার অনুসরণের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন।
ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস টেনে মুফতি আবরার বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বের যুগকে আমরা বলি আইয়্যামে জাহিলিয়্যাত৷ সে যুগ ছিল অপরাধের স্বর্গ যুগ৷ প্রগতিশীলরা সে যুগের বর্বরতাকে মধ্য যুগের বর্বরতা বলেন৷ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় তেরো বছর অবস্থান করেন৷ সেখানে তিনি ইসলামি আইন বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি৷ মদিনায় মাত্র দশ বছরে তিনি ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করে শাসন পরিচালনা করেন৷ মাত্র দশ বছরে তিনি অপরাধের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনেন৷ বোঝা গেলো ইসলামি হদ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক বড় নিয়ামক৷
‘ইসলাম অপরাধের মাত্রা হিসাবে শাস্তি নির্ধারণ করেছে৷ সে শাস্তি প্রয়োগ সকলের ক্ষেত্রে সমান ছিল৷ বিশেষ ক্ষমতা বলে কেউ পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না৷ এজন্য ইসলামি খেলাফতের সময় পুরো রাজ্যে ধর্ষণ, খুনের মতো ঘটনা নাই বললেই চলে৷ কেউ করলে যথাযথভাবে কুরআনে বর্ণিত শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে৷ এতে সকলেই শিক্ষাগ্রহণ করা হয়েছে৷
‘বর্তমানের হদ নিয়ে কথা বললে অনেক কথা বলতে হবে৷ প্রথমত এ হদ অপরাধীর অন্তরে ভীতি সঞ্চার করতে পারে না৷ ফলে সে অপরাধে জড়াতে একটুও ভয় করে না৷ এ ছাড়া বিভিন্ন প্রভাবশালী মাধ্যম অথবা বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে পার পেয়ে যাওয়াও নিতান্তই কম নয়৷ ফলে মানুষের মাঝে দিনেরপর দিন অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে৷
‘আজকে পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা৷ মাদক পাচারকারী র্যাবের সাথে কথিত বন্ধুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে৷ প্রচলিত হদে একটি বড় ঘাপলার জায়গা হলো এখানে৷ মূল হোতারা থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ নিচের সারির কিছু লোককে মাঝে মাঝে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়৷
‘এ ছাড়া এমন বহু মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়, অপরাধ হিসাবে ইসলাম তাকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয়নি৷ মাদকের কথাই ধরুন৷ কেউ মাদক খেলে অথবা মাদক পাচার করলে ইসলাম তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি৷ কিন্তু আমরা দেখি এমন অনেককে ক্রসফায়ার করে হত্যা করা হয়৷ আবার কয়েকজনের খুনি দিনেরপর দিন কারাগারে আপিলের নামে পড়ে থাকে! হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না৷ কেউ ঘুষ দিয়ে অথবা রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বেরও হয়ে যায়!
কিন্তু ইসলামের বিধান হলো, কারও হত্যাকাণ্ডের বিষয় প্রমাণিত হয়ে গেলে এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা দিয়তের উপর সন্তুষ্ট না হলে সাথে সাথে জনসমক্ষে তাকে হত্যা করা হবে৷ যাতে তার শাস্তি দেখে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে৷
‘আমি হলফ করে বলতে পারি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসলামি হুদূদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই৷ ইসলামি হুদুদ বাস্তবায়ন হলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ সকল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে৷’
