
নাইম বিন মাসউদ
প্রত্যেক মুসলমান, চাই তিনি আলেম হোন বা আবেদ, ইমাম হোন কিংবা মুসল্লি, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, প্রত্যেকে তার অবস্থান থেকে যেখানেই হোক এবং যেমনই হোক, তার প্রধান ও মৌলিক কর্তব্য হলো দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়া এবং রাসূলের আদর্শে জীবন গঠন করা। এর সাথে সাথে একে অন্যকে সহযোগিতা করা। পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। ইসলামের সৌন্দর্য সকল ধর্মালম্বীদের সম্মুখে সঠিক পন্থায় তুলে ধরা ও দ্বীনি হকের পথে দিকনির্দেশনা দেয়া।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইসলামের সৌন্দর্য প্রসারে প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব সমান। যিনি শুধুমাত্র একটি আয়াত জানেন তার দায়িত্ব এ একটি আয়াত অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়া। অন্যকে এ আয়াত শিক্ষা দেয়া। একজন ইমাম তার ইমামের অবস্থান থেকে এ চেষ্টা করবেন। একজন শিক্ষক তার শিক্ষকতার পেশায় থেকে প্রয়াস চালাবেন। একজন ব্যবসায়ী তার ব্যবসার পাশাপশি ইসলাম প্রসারে ব্রত হবেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা।
আল্লাহ তার দ্বীনকে সর্বহালতে সাহায্য করবেন।। এটি মহান আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা। নিশ্চয় আল্লাহ তার ওয়াদার খেলাফ করেন না।
কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,
يا أيها الذين آمنوا إن تنصر الله ينصركم و يثبت أقدامكم
হে ইমানদাররা, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে আল্লাও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদম অবিচল রাখবেন। সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত-৭।
এ আয়াতের আলোকে বুঝে আসে যারাই দীনের সাহায্যকারী হবেন খোদ আল্লাহ তায়ালা তাদের সাহায্যকারী হবেন। সকল কাজে স্বয়ং আল্লাহ তাদের রাহমানুয়ি করবেন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ইসলামের সৌন্দর্য ও সত্যতা প্রসারে কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখা দ্বীনি আবশ্যিক দায়িত্ব। এ মহান কাজে নিজের সবটুকু সামর্থ্য উৎসর্গ করা। বিশ্বের সর্বত্রে ইসলাম ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে চেষ্টা করা ঈমানি কর্তব্য।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য ইসলাম সহজ করেছেন। আবার ইসলাম প্রচার ও প্রসারে দায়িত্বও আসান করেছেন দ্বীনকে সাহায্য করার অনেক মাধ্যম ও অবলম্বন তৈ্রি করে দিয়েছেন। যার একটাকে অবলম্বন করে আমরা আল্লাহর আরো নৈকট্য হাসিল করতে পারি। যার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই আমরা মানুষকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসবো। রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক সমাজ বিনির্মাণ করবো।
কুরআন-হাদীসের আলোকে ইসলামের সৌন্দর্য প্রচারে কিছু মৌলিক মাধ্যম সম্পর্কে আজকের লেখা। যেনো আমরা নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আরো সম্যক অবগত হতে পারি। যেনো সম্মৃদ্ধ হতে পারি জ্ঞানের পরিসরে। অগ্রসর হতে পারি কর্মের ময়দানে।
দাওয়াত ইলাল্লাহ তথা অন্যকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা
ইসলামের সৌন্দর্য প্রসারে প্রাথমিক মাধ্যম হলো দাওয়াত দেয়া তথা অন্যকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
و من أحسن قولا ممن دعا إلي الله و عمل صالحا و قال إنني من المسلمين.
‘যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয় আমি মুসলমানদের একজন, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে?’ (সূরা ফুসসিলাত : ৩৩)।
আল্লাহ তায়ালা আরো এরশাদ করেন,
أدع إلي سبيل ربك بالحكمة و الموعظة الحسنة و جادلهم بالتي هي أحسن.
‘আপনি আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন হিকমতের মাধ্যমে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দসই পন্থায়।’ (সূরা নাহল : ১২৫)।
সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আলী (রা.) কে যুদ্ধে প্রেরণকালে বলেন, ‘একজন লোককেও যদি আল্লাহ তোমার মাধ্যমে হেদায়েত করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ (বোখারি ও মুসলিম)
ইসলামের প্রসার ও মানুষের নিকট সত্য পোঁছাতে দাওয়াতের বিশাল প্রভাব ও অবদানের কথা কারও অবিদিত নয়। আর এ দাওয়াত হতে হবে জ্ঞানের ভিত্তিতে।
আল্লাহ বলেন,
قل هذه سبيلي أدعو إلي الله علي بصيرة أنا و من اتبعني
‘(হে নবী আপনি) বলে দিন, এ আমার পথ। আল্লাহর দিকে বুঝেসুঝে দাওয়াত দিই আমি এবং আমার অনুসারীরা।’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)।
দাওয়াতের অনেক বিচিত্র মাধ্যম আছে। যেমন বক্তৃতা, শিক্ষাদান, গ্রন্থ রচনা, পত্রিকায় লেখালেখি ও মিডিয়া ইত্যাদি। মানুষকে আল্লাহর সরল পথে আহ্বানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করি।
সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ
দ্বীনের সাহায্যের অন্যতম মাধ্যম হলো মানুষকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা।
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
و لتكم منكم أمة يدعون إلي الخير يأمرون بالمعروف و ينهون عن المنكر.
অর্থ, আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহ্বান জানাবে কল্যানের
প্রতি, নির্দেশ দেবে সৎ কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)।
সামান্য ভেবে দেখুন, সমাজের চিত্র তখন কতই না সুন্দর হবে যদি সকল মুসলমান এ দায়িত্ব পালন করেন। দাওয়াত এ উম্মতের রক্ষাকবচ এবং সবার পরিত্রাণের তরী। যে এর গুরুত্ব¡ ও মর্যাদা বোঝে সে কখনও এতে ত্রুটি করে না।
শুজা বিন ওলিদ বলেন, ‘আমি সুফিয়ান সাওরির সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। আসা-যাওয়ার পথে কখনও তার জিহ্বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরতি থাকেনি।’
ইসলামের সাহায্যের অন্যতম মাধ্যম হলো অন্যের কাছে হাদিসের বাণী পৌঁছে দেয়া। আমি যেখানেই থাকি না কেন, বাসে হোক কিংবা রিক্সায়, আমার প্রথম দায়িত্ব হলো তার নিকট রাসূলের হাদিস পৌঁছে দেয়া। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
প্রত্যেকের উচিত, যা নিজে শেখে তার প্রচার এবং অন্যের কাছে পৌঁছাতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা। সুতরাং হে আমার প্রিয় পাঠক, আপনি যা শিখেছেন তা অল্প হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দিন। একটি আয়াত, একটি হাদিস, একটি মাসআলা, একটি বিধান এবং একটি সতর্কবার্তা হলেও পৌঁছে দিন।
উল্লেখ করা বিষয়ের শুদ্ধতা এবং প্রচারিত বিষয়ের বস্তুুনিষ্ঠতা যাচাই সাপেক্ষে এক্ষেত্রে আপনি কাজে লাগাতে পারেন আধুনিক প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমকেও। নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কাজে লাগিয়ে আপনি পৌঁছে যেতে পারেন বিচিত্র লোকের কাছে এবং তাদের উপকৃত করতে পারেন নিজের যা ইলম আছে তা দিয়ে।
নসীহত বা অন্যের কল্যাণ কামনা
দ্বীনের সাহায্যের আরেকটি মাধ্যম হলো অন্যের কল্যাণ কামনা করা।
রাসুল (সা.) বলেন,
الدين النصيحة.
‘দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা।’ আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, রাসুল, মুসলিম নেতারা ও তাদের সর্বসাধারণের জন্য।’
ইবনে মাসউদ (রা.) এক কিশোরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে তার সঙ্গীদের গান শোনাচ্ছিল। তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন, বললেন, ‘হে বৎস, তোমার যে চমৎকার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, তা যদি কোরআন পাঠে কাজে লাগাতে, তাহলে তুমি অনেক মর্যাদা লাভ করতে।’ এ মন্তব্য ছেলেটিকে প্রভাবিত করে। তার এ নসীহত ছেলেটির তওবার মাধ্যম হয়। ছেলেটি উত্তম তওবা করে। অবস্থা তার এতই উন্নত হয় যে, সে পরে একজন মোহাদ্দিস হয়ে যায়।
তালিম বা অন্যকে অজানা বিষয় শিক্ষা দেওয়া
ইসলামের সাহায্যের আরেক মাধ্যম হলো অন্যকে অজানা বিষয় জানানো। এটি সেসব কাজের অন্যতম যার ফায়দা সুদূর এবং যার কল্যাণ হবে ব্যাপক। উচিত হলো মানুষকে শেখানোর ব্যাপারটি উন্মুক্তভাবে হওয়া।
এ বিখ্যাত হাদিস সবাই জানে,
خيركم من تعلم القرآن و علمه.
অর্থ, তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তি উত্তম, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।
সুতরাং বিশেষভাবে সবার জন্য কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ, ফেরেশতারা এবং আসমান ও জমিনগুলোর অধিবাসীরা, এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও মাছেরা মানুষকে কল্যাণের জ্ঞান বিতরণকারীর জন্য দোয়া করে।’ (আবু উমামা বাহেলি সূত্রে তিরমিজি)।
অন্যের জন্য সহমর্মিতা ও সমবেদনার হাত বাড়িয়ে দিই
মুসলিম জাতি এখন বড় বড় সমস্যায় জর্জরিত, নানা সংকটে বিপর্যস্ত। এখন আমাদের প্রথম কর্তব্য নিজের ভাইদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। তাদের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া। তাদের দুঃখে দুখী হওয়া। আমরা সদাই তাদের জন্য দোয়া করব।
আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন তা দিয়েই তাদের সাহায্য করব। তাদের সমস্যা আলোচনা, তাদের পক্ষে প্রতিরোধ, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মিডিয়ার নানা অঙ্গনে তাদের প্রতি বৈষম্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গী হব। মোদ্দাকথা, দ্বীনের সাহায্য মহাকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়।
এ এক উঁচু ও মহৎ লক্ষ্য। আর প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য এর ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত ও অবারিত। আর দ্বীনের সাহায্য উম্মতের কোনো একটি বিশেষ দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেমনটি ভেবে থাকেন কেউ কেউ। এটি ভুল ধারণা, যার আশু সংশোধন জরুরী। কেননা দ্বীনের সাহায্যে এগিয়ে আসা সবার দায়িত্ব। এটা নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে সম্পৃ নয়।
