
ওয়ালিউল্লাহ আরমান
বর্তমানে অনৈক্য এবং নানামুখী সিদ্ধান্ত, কর্মতৎপরতা ও বক্তব্য-বিবৃতির কারণে একসময়ে আশার প্রদীপ জ্বালানো ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ নামটি এখন আফসোসের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।অথচ বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এদেশের ইসলামী রাজনীতির অঙ্গণে ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ নামটি একটি বিশাল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদয় হয় এবং প্রথম কয়েক বছর তার কার্যক্রমও ছিল বেশ আশাজাগানিয়া। সময়ের শীর্ষ ও শ্রেষ্ঠ আলেম-উলামা এবং ইসলামি সংগঠনগুলোর পুরাতন ঐতিহ্য ও নতুন প্রতিশ্রুতির মিশেলে গঠিত ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ ছিল সবার প্রত্যাশা ও চাহিদার শীর্ষে।
১৯৯০ সালে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয়৷ বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার দেশে নির্বাচনী আবহ তৈরি করে৷ ইসলামি অঙ্গণে ‘খেলাফত আন্দোলন’-কেন্দ্রিক ক্ষত প্রায় শুকিয়ে এসেছে তখন, পারস্পরিক দূরত্বও অনেকটা ঘুচে গেছে৷ এই প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে ইসলামি দলগুলি পর্দার আড়ালে ব্যাপকভাবে তৎপর হয়ে ওঠে। দিনের পর দিন মিটিং-সভা-মতবিনিময়ের পর নেতৃবৃন্দ একটি বৃহত্তর জোট গড়তে সম্মত হন৷ যদিও জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কারণে জোট গঠনের পূর্বে দলগুলি খুব বেশি সময় পায়নি। তবু তারা অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সুসংগঠিত নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম গড়ার দিকে এগিয়ে যায়।
১৯৯১ সালে নির্বাচনী ডামাডোলের শুরুর দিকেই, ওই সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র মিরপুর আরজাবাদ মাদরাসায় মিটিং-এর পর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও ফরায়েজি জামাতের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘ইসলামী ঐক্যজোট’৷ নির্বাচন পর্যন্ত যার সমন্বয়কারী ছিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহঃ) এবং যুগ্ম সমন্বয়কারী ছিলেন আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহঃ)৷
নির্বাচনের পর ইসলামী ঐক্যজোটের প্রথম চেয়ারম্যান হন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহঃ) এবং মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস৷ নেতৃত্ব নির্বাচনের নীতিমালা এভাবে ঠিক হয় যে, জোটের কমিটি হবে দুইবছর মেয়াদী৷ জোটভুক্ত পাঁচটি সংগঠন থেকে পাঁচ/ছয়জন করে শুরা সদস্য মনোনীত হবেন। প্রত্যেক সংগঠনের পক্ষ থেকে একজন করে দুই বছরের জন্য চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন৷ শুরার পরামর্শে নির্ধারিত প্যানেল থেকে ‘বাই রোটেশন’ পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন৷ এভাবে ইসলামী ঐক্যজোটের কাজ এগিয়ে যেতে থাকে।
১৯৯৩ সালে কাদিয়ানীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ‘আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত’ এবং ‘খতমে নবুওয়াত আন্দোলন পরিষদ বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে সারাদেশে তৃণমূল থেকে তৃণমূলে ‘আকিদায়ে খতমে নবুওয়াত’ সংরক্ষণের এই ঈমানি দাবি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তখন তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াতের আমির ছিলেন বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা ওবায়দুল হক (রহঃ)। অন্যদিকে খতমে নবুওয়াত আন্দোলন পরিষদের মহাসচিব ছিলেন মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহঃ)। মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী মরহুম খতিব সাহেবের আহবানে সাড়া দিয়ে নিজ নেতৃত্বাধীন পরিষদের কার্যক্রম স্থগিত রেখে তাহাফফুজে নবুওয়াতের কাজে সদলবলে শামিল হন।
১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে মানিক মিয়া এভিনিউতে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি লক্ষকণ্ঠে ধ্বনিত হয়। সেই প্রোগ্রাম বানচাল করার জন্য তৎকালীন বিএনপি সরকার নানা অপতৎপরতা চালায়। মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে দাওয়াত গ্রহণ করেও প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস শেষ মুহূর্তে প্রোগ্রামে আসতে অস্বীকৃতি জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিথ্যাচারের মাধ্যমে প্রচার করে যে, খতমে নবুওয়াতের মহাসমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু ওলামায়ে কেরামের অনমনীয় ও আপোষহীন ভূমিকার কারণে সরকারের সে অপপ্রচার মাঠে মারা যায়। বিশেষত মানিক মিয়া এভিনিউর প্রোগ্রাম সফলে মরহুম মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহঃ)-এর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই তুঙ্গস্পর্শী আন্দোলন কীভাবে কীভাবে যেনো স্তিমিত হয়ে যায়। খতমে নবুওয়াতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্য ঝিমিয়ে পড়ে, সংগঠনগুলোও নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরে যায়।
ইতিমধ্যে নতুন ফেতনা হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’। এই পত্রিকাটি সরাসরি কুরআন এবং দ্বীনের মৌলিক অনেক বিষয়ে প্রকাশ্যে বিভ্রান্তিকর লেখা ছাপতে থাকে। সেবাদানকারী সংস্থা লেবেলের আড়ালে সাধারণ মুসলমানের ঈমান হরণের জঘন্য খেলায় মেতে ওঠে এনজিও ‘ব্রাক’। ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী ড. আহমদ শরীফ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নানারকম বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে থাকে। নারীবাদ, আধুনিকতা ও মুক্তচিন্তার চটকদার শ্লোগানে মতিভ্রষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন পত্র-পত্রিকায় কলাম, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ লিখে ইসলাম-মুসলমান, কুরআন-সুন্নাহ, আল্লাহ-রাসূল এবং ইসলামের নানা মৌলিক বিষয় সম্পর্কে নজিরবিহীন কুৎসা, অপব্যাখ্যা এবং ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াতে শুরু করে। ওলামায়ে কেরাম এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এসবেরর মোকাবেলায় সম্মিলিত তৎপরতা শুরু করে। কুরআনের মর্যাদা রক্ষায় কিশোরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন ইসলামী ছাত্র মজলিসের কর্মী শহীদ আরমান হোসাইন। পুলিশের হাতে আটক হন অসংখ্য নেতা-কর্মী।
তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত নিরীহ মুসলমানদেরকে ‘রাজাকার’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ছাত্র ও যুবলীগের লোকজন ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক)’-এর নামে তাদের উপর সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ করে। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝিতে দানা বেঁধে ওঠা আন্দোলনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং সচিবালয় অবরোধ করা হয়। ইসলামপন্থীদের তীব্র গণআন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার তসলিমা নাসরিনকে রাতারাতি দেশ ছাড়তে সহায়তা করে।
পরের কিস্তিঃ
ইসলামী ঐক্যজোটে অস্বস্তি, সংগ্রামের নতুন প্ল্যাটফর্ম সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের উত্থান।
লেখক: আলেম, রাজনীতিবিদ
