
আশরাফ উদ্দীন খান
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদান শুরু হয়। রাসুলের জীবদ্দশাতেই সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের প্রচার-প্রসাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরেন। এই অবস্থা একটি সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ মুসলিম সমাজ তাদের দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছিলো আর তাদের দুনিয়াবী প্রয়োজন অন্য কোন উৎস থেকে পূরণ করছিলো। ধীরে ধীরে এক পর্যায়ে এসে শিক্ষাদানের মাধ্যমে মানুষ তাদের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করার সুযোগ পেতে শুরু করে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকগণ সর্বপ্রথম জীবিকা অর্জনের সুযোগ পান, যাতে পার্থিব প্রয়োজন পূরণের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে শিক্ষকগণ তাদের শিক্ষাদান কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর পরে হযরত ওমর (রাঃ) বিজিত দেশের সর্বত্র কুরআনের দরস প্রদানের ব্যবস্থা করেন, তিনি এতদুদ্দেশ্যে মুতাওয়াল্লি ও কারী নিযুক্ত করে তাদের জন্য মাসিক বেতন নির্ধারন করে দেন। পরবর্তীতে হযরত ওমর বিন আব্দুল আজিজের যুগে এসে মুহাদ্দিস ও ফকিহদের জন্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকারী পৃষ্টপোষকতার ঘোষণা দেয়া হয়। ‘জামেউল বায়ানুল ইলম’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে—’এ সময় (হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের যুগে) রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ফরমান জারি করা হয় যে, যারা পার্থিব সম্পর্ক বর্জন করে হাদিস ও ফিকাহ চর্চা এবং গবেষণার জন্য জীবন উৎসর্গ করবেন, আর্থিক সাহায্য হিসাবে বাইতুল মাল থেকে তাদের মাসিক ১০০ দিনার হিসাবে দেয়া হবে।’ (বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব, পৃ: ৫৮, ৬৪)।
এক পর্যায়ে মুসলিম খলিফাগণ ইলমের সাথে বিশেষভাবে জড়িতদেরকে বাইতুল মাল থেকে সন্মানী দেওয়ার প্রথা চালু করেন। এর কিছু দিন পরে ইসলামি শিক্ষা বিশেষ করে ইসলামি আইন শাস্ত্রে পারদর্শীদেরকে সরকারি বিচার ও ইফতা বিভাগের সাথে জড়িত হতে দেখা যায়। এভাবে দেখা যায় যে, মানুষ শিক্ষাগ্রহণ করছে এবং সেই শিক্ষা অনুযায়ী যে কোন ‘খেদমত’ সমাজে পেশ করে তার মাধ্যমে নিজের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করে নিচ্ছে। ইসলামি উলুমের শিক্ষক, বিচারক ও ইফতা বিভাগের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সংশ্লিষ্টতা শুরু হয়। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, আমরা যে যুগের কথা এখানে আলোচনা করছি সেই যুগের মানুষের ধর্মীয় অবস্থা ভিন্ন ছিলো। দুনিয়া থেকে তাদের নির্লিপ্ততা এই পরিমাণ ছিল যে, মানুষ ইসলামি শিক্ষা অর্জন করার সময় তাদের সামনে পার্থিব কোন উপকারের কোন ধারণা উপস্থিত থাকত না। তাদের অবস্থা এই ছিল যে, তাদের সমাজে ইলম অর্জন করা হতো শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, আবার সেই ইলমের মাধ্যমে মানুষের বা সমাজের উপকার করা হতোও শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আবার বাইতুল মাল যেহেতু ছিল মুসলিম উম্মাহের উপকারের উদ্দেশ্যে, তাই বাইতুল মাল থেকে এ ধরনের মানুষদেরকে আর্থিকভাবে উপকৃত করা হতো। মুসলিম আলেমগণ যে পার্থিব স্বার্থ থেকে উর্ধ্বে ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় এভাবে যে ইতিহাসে এমন অনেক আলেমের সন্ধান পাওয়া যায় যারা এই ইলমের মাধ্যমে কখনো পার্থিব স্বার্থের ধারে কাছেও আসেন নি, তাই যখন তাদের সামনে লোভনীয় কোন পদের সুযোগ এসেছে তারা খুবই যত্নের সাথে সেই পদ থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, উদাহরণ হিসাবে বলা যায়—ইমাম আবু হানিফা বাগদাদের বিচারকের দায়িত্ব নিতে সম্মত হননি, ‘আল্লামা আবু ইসহাক সিরাজী বাগদাদের মাদ্রাসা-ই-নিজামিয়ার প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন পরবর্তীতে ২০ দিনের অব্যাহত পীড়াপীড়ির পরে তিনি সেই পদ নিতে সম্মতি প্রকাশ করেন।’ (বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব, পৃ: ৮২)।
একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষ তার আস্থা প্রকাশ করে নিজের সন্তান-সন্তুতিদেরকে সেখানে যখন প্রেরণ করেন, তখন তার চেতনায় এই বিষয়টি বিদ্যমান থাকে যে, এখান থেকে তার সন্তান জ্ঞান অর্জন করবে, চরিত্রের দীক্ষা লাভ করবে ও ভবিষ্যতে তার কর্ম জীবন পরিচালনা করার মত যোগ্যতাও সে এখান থেকে অর্জন করবে। তাই দেখা যায় মানুষ তার পার্থিব প্রয়োজন মেটানোর কর্ম যোগ্যতা সাধারণত শিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জন করে থাকেন। একটি শিশু-ছাত্র প্রথম শ্রেনি থেকে শুরু করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেডিকেল কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করা পর্যন্ত সময়কালের পড়াশোনায় শিক্ষার তিন উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়া উচিত। যদি সঠিক শিক্ষা সে পায় তাহলে সে একদিকে জ্ঞান অর্জন করার সাথে সাথে উত্তম চরিত্র-আখলাকও অর্জন করবে এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে সে তার পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে কোন কর্মে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, কওমি মাদ্রাসাগুলো থেকে আমাদের মুসলিম তরুণ সমাজ শিক্ষা অর্জন করে কর্ম যোগ্যতার প্রথম ও প্রধান অংশ অর্জন করছে। তারা নিজেরা যেমন ইসলামি বিধান অনুযায়ী আমল করছে ঠিক তেমনি সমাজের সাধারণ মানুষদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করার দায়িত্বও পালন করছেন ইখলাসের সাথে। বিপরীত দিকে আমাদের সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা কর্ম যোগ্যতা ও জ্ঞান অর্জন করছেন ঠিক, কিন্ত চরিত্র অর্জনে তারা সঠিক দীক্ষা পাচ্ছেন না। কওমি মাদ্রাসাতে লেখাপড়া করে আমাদের ছাত্র সমাজ জ্ঞান-চরিত্র অর্জন করছেন ঠিক কিন্তু কর্ম যোগ্যতা অর্জনে তারা দুর্বল থেকে যাচ্ছেন। বিভিন্ন কারণে আমাদের সমাজে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে খেয়াল করে অনেক ইসলামি বুদ্ধিজীবী এমন মন্তব্য করেছেন যে, আমাদের কিছু শিক্ষা হচ্ছে ‘কর্মহীন শিক্ষা’ আর কিছু শিক্ষা হচ্ছে ‘ধর্মহীন শিক্ষা’। শিক্ষার এই বিভাজন আমাদের মুসলিম সমাজের কি পরিমাণ ক্ষতি সাধন করেছে তা একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায়।
আমাদের আকাবিরের মধ্য থেকেই অনেকেই ইলমের সুখ্যাতির পাশাপাশি অন্যান্য পেশায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। ইতিহাসে অনেক আলেমের নাম পাওয়া যায় যাদের নামের অংশ হিসাবে বিভিন্ন শব্দ যেমন ‘কুদুরী’ (হাড়ি-পাতিল নির্মাতা), ‘বাযযায’ (বস্ত্র-ব্যবসায়ী), ‘হাদ্দাদ’ (লৌহকার), ‘খাইয়াত’ (দর্জি) ইত্যাদি বিভিন্ন পেশা-নির্ণয়ক শব্দ যুক্ত করতে দেখা যায়, যার অর্থ তারা নিজেরা তাদের জীবিকা অর্জন এই পেশার মাধ্যমে করতেন। অনেকেই ইলমের পাশাপাশি তাদের সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। আবার এটাও ঠিক যে অনেকেই ইলমের বা দ্বীনের খেদমতের স্বার্থে নিজের পেশা বা কারবার বর্জন করে শুধুমাত্র ইলমের সাথে দ্বীনের খেদমতের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রচলন
কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, দীর্ঘ দিন যাবত এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলে আসছে যে, ছাত্রদের লেখাপড়ার সাথে সাথে তাদেরকে এমন কোন কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হোক যাতে তারা ফারেগ হওয়ার পরে, নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এই বিষয়ে আমাদের আকাবিরের মাঝে দুই ধরনের মত পাওয়া যায়:
এক. কারিগরি শিক্ষা প্রদানের পক্ষে
দুই. কারিগরি শিক্ষা প্রদানের বিপক্ষে
উভয় দলই তাদের রায়ের পক্ষে যুক্তি পেশ করে থাকেন। নিম্নে আমরা কয়েকজনের মতামত পেশ করার মাধ্যমে একটি উপসংহারে উপনীত হওয়ার চেষ্ঠা করবো:
এক. মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. (১৮৭৮-১৯৫৭) মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সাথে ছাত্রদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে উল্লেখ করে গিয়েছেন এভাবে—’মাধ্যমিক ও উচ্চতর ক্লাসের ছাত্রদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নিম্নলিখিত হাতের কাজের যে কোন একটি বা একাধিক শিখতে হবে। বিষয় নির্বাচনে তাদের স্বাধীনতা থাকবে। যথা—চরকী চালানো, কাপড় বোনা, ঘড়ি মেরামত, বই-পুস্তক-খাতা বাধাই, চামড়া রং করা, বুট তৈরি, লোহার কাজ, স্বর্নের কাজ, ইলেকট্রিকের কাজ ইত্যাদি।’
মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর ১৮৭৮ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত জীবনকালের দিকে খেয়াল করলে হয়ত তার প্রস্তাবনার গ্রহনযোগ্যতা আমাদের সামনে সহজ হয়ে যায়। কারণ তিনি যে যুগের মানুষ ছিলেন সেই হিসাবে তিনি এই ধরণের হাতের কাজের প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন। মাদানি (রহ.) এর উপরের বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে তিনি ছাত্রদের কারিগরি শিক্ষার পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি যে সকল কাজের কথা এখানে উল্লেখ করেছেন তা আমাদের বর্তমান সময়ে উপযুক্ত মনে হয় না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে যুগের ব্যবধানে মাদানি (রহ.) এ ধরণের হাতের কাজের প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ তার যুগে এ সমস্ত কাজে মানুষ খুব সাধারণভাবে লিপ্ত হত। এখানে মাওলানা মাদানি (রহ.) এর বক্তব্যে একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে তিনি বিষয় নির্বাচনে ছাত্রদেরকে স্বাধীনতা দিলেও মৌলিকভাবে কারিগরি শিক্ষাকে তিনি বাধ্যতামূলক সাব্যস্ত করেছেন।
দুই. মাওলানা নুর মুহাম্মাদ আজমি (রহ.) এর মত এই—’মাদ্রাসা শিক্ষা এক সময় একদিকে যেমন ছিল ধর্মীয়, অপরদিকে তেমন ছিল উহা অর্থকরীও। সিভিল ও মিলিটারি সকল বিভাগের সকল চাকরিতেই ছিল মাদ্রাসা শিক্ষিত লোকদের পূর্ণ অধিকার। তাহারাই সমস্ত বিভাগ পরিচালনা করিতেন এবং আজও সাধারণত আরব, ইরান, আফগান প্রভৃতি মুসলিম রাষ্ট্র মাদ্রাসা শিক্ষিত লোকেরাই পরিচালনা করিয়া থাকেন। কিন্তু পাক-ভারতে ১৮৩৫ সাল হইতে ফারসীর স্থলে ইংরেজীকে করা হয় শিক্ষার বাহন এবং আরবি-ফারসি অভিজ্ঞ মাদ্রাসা শিক্ষিতদের করা হয় চাকরির সমস্ত সুযোগ হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। অতঃপর সমাজের বিত্তশালী লোকেরা পার্থিব মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে এই শিক্ষা হইতে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়া পড়েন এবং কেবল গরীব জনসাধারণই আল্লাহর দ্বীন রক্ষার উদ্দেশ্যে এই শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়। ফলে আজ মাদ্রাসা শিক্ষিত তথা আলেমমাত্রই আর্থিক দিক দিয়া দুর্দশাগ্রস্ত। অতএব, মাদ্রাসায় কোন রকমের অর্থকরী শিক্ষা, যথা—শিল্প শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত। মাদ্রাসায় এইরুপ কারিগরি শিক্ষা দিতে হইবে যাহা শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সহিত খাপ খায়, যথা—কিতাবত, টাইপ রাইটিং, সেলাই ইত্যাদি। হেকিমী ও হোমিওপ্যাথিক এই পর্যায়ে আনা যাইতে পারে। মাদ্রাসা হইতে বাহির হইয়া আজও অনেকে এই সকল বৃত্তি ইখতিয়ার করিয়ে থাকেন। কিন্তু শিল্প শিক্ষা ইচ্ছাধীন বিভাগের অন্তর্ভূক্ত রাখা উচিত। সে ইচ্ছা করিলে ইংরেজী, ফারসী ও অর্থশাস্ত্র প্রভৃতি ইচ্ছাধীন বিষয়সমূহের কোন একটিকে গ্রহণ না করিয়া উপযুক্ত বিষয়সমূহের কোন একটিকে গ্রহণ করিতে পারে। মাদ্রাসা শিক্ষিতদের আর্থিক দুর্দশা দূর করার পক্ষে কেবল শিল্প শিক্ষাই যথেষ্ঠ হইবে না, বরং তাহাদিগকে সরকারী চাকরির সকল সম্ভাব্য ক্ষেত্রে নিয়োগের ব্যবস্থাও করিতে হইবে।’
মাওলানা নুর মুহাম্মাদ আজমি (রহ.) এর বক্তব্যও কারিগরি শিক্ষার পক্ষে। তার ভাষায়, ‘মাদ্রাসায় কোন রকমের অর্থকরী শিক্ষা, যথা—শিল্প শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত। মাদ্রাসায় এইরুপ কারিগরি শিক্ষা দিতে হইবে যাহা শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সহিত খাপ খায়, যথা—কিতাবত, টাইপ রাইটিং, সেলাই ইত্যাদি। হেকিমী ও হোমিওপ্যাথিক এই পর্যায়ে আনা যাইতে পারে।’ মাওলানা মাদানি (রহ.) ও মাওলানা নুর মুহাম্মাদ আজমী (রহ.), উভয়ের প্রস্তাবিত পেশার যে ভিন্নতা দেখা যায় তার কারণ উভয়ের জীবন কালের ব্যবধান। কারন মাওলানা নুর মুহাম্মাদ (রহ.) এর জীবনকাল ছিল ১৯০০-১৯৭২, সেই হিসাবে তিনি আমাদের খুব নিকট অতীতের মানুষ।
তিন. মাওলানা মুহাম্মাদ তাকি উসমানি (দা. বা.) এর অভিমত হলো—’অনেকে এই প্রস্তাব করে থাকেন যে, মাদ্রাসাসমূহে হস্তশিল্প ও কারিগরি বিদ্যা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা উচিত, যেন এখানে শিক্ষা সমাপ্তকারী আলেমগন সমাজের দুঃসহ বোঝা ও পরমুখাপেক্ষী না হয়ে, নিজ হস্তশিল্প ও কারিগরি জ্ঞান চর্চা করে জীবিকার্জনে স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর হতে পারেন এবং কোন বিনিময় ছাড়াই দ্বীনের মহান খেদমত আঞ্জাম দিতে পারেন। উপরোক্ত প্রস্তাবটি প্রকৃতপক্ষে অযৌক্তিক ও বাস্তবায়ন অনুপযুক্ত। কারণ—
প্রথমত, যদি দ্বীনি মাদ্রাসাগুলোর লক্ষ্য হয় কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেম তৈরি করা, তবে এসব জ্ঞান অর্জন ও চর্চার জন্য তো নিরবচ্ছিন্ন সময় ব্যয় করতে হবে, একই সাথে কারিগরি বা হস্তশিল্প শিক্ষায় সময় বের করবে কিভাবে? আর বর্তমান কঠিন যুগের বাস্তব অভিজ্ঞতা হল, কারিগরি কাজে কেউ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ার পর দ্বীন ইলেম চর্চার আশা আশাই হয়ে থাকবে। আজীবন যা অপূর্ণ থেকে যাবে। কোন ছাত্র যদি ইলম অর্জনের পাশাপাশি কারিগরি শিল্প আয়ত্ব করে, বাস্তবে দেখা যাবে যদি সে শিক্ষা সমাপ্ত করে ইলম চর্চায় আত্মনিয়োগ করে, তবে অর্জিত হস্তশিল্পের দিকে কিছুতেই সে মনোযোগ দিতে পারবে না। আর যদি সে অর্জিত শিল্পবিদ্যা দিয়ে জীবিকা অন্বেষণে নিয়োজিত হয় তবে ইলেম দ্বীনের সাথে সামান্য সংযোগও তার আর অবশিষ্ট থাকবে না। উভয়ের সমন্বয় সাধন কিছুতেই সম্ভবপর নয়। এ জন্য যে সব মাদ্রাসা উচ্চ যোগ্যতাধারী আলেম সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত, সেসব মাদ্রাসার জন্য ছাত্রদেরকে ইলমের পাশাপাশি কারিগরি বিদ্যা প্রশিক্ষণ দানের আয়োজন করা শুধু অসমীচীন নয়, অসম্ভবও।
দ্বিতীয়ত, কোন মানুষ সমাজের দ্বীনি প্রয়োজন পূরণ করে বিনিময় বা বেতন বা সম্মানী গ্রহণ করার কারণে যদি তাকে সমাজের বোঝা বা পরনির্ভর মনে করা হয় তাহলে তাকে অন্যায় বলতে হবে। কারণ এটা স্বীকৃত বিষয় যে, যে ব্যক্তি যে বিভাগে জ্ঞানার্জন করবে, সে সেই বিভাগের আওতাধীন কোন কাজের মাধ্যমে সমাজে দায়িত্ব পালন করবে, আবার তার জীবিকার ব্যবস্থাও সেই ক্ষেত্র থেকে হবে। তাই যদি একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ বা বিজ্ঞানী নিজের কর্মের মাধ্যমে সমাজের সেবা করে অর্থোপার্জন করেন তাহলে সেটাকে তার প্রতি সমাজের দয়া বা করুণা মনে করা হয় না এবং তাকে সমাজের বোঝা বা পরনির্ভর মনে করার অবকাশও নেই। তাহলে প্রশ্ন হবে ইলমে দ্বীনের খেদমত করা কি সমাজের কোন প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে না? দ্বীনের খেদমত যদি সমাজের জন্য অত্যাবশ্যক হয় আর সমাজ যদি ঐ দায়িত্ব পালনকারী আলেমকে জীবিকার্জন থেকে চিন্তামুক্ত করার জন্য নিজ দায়িত্ব পালন করে, তবে এটা কি সে আলেমের উপর সমাজের দয়া বা করুণা হবে? নিশ্চয় না। কাজেই সামাজের বোঝা হবার বা পরনির্ভরতার অপবাদ দূর করতে আলেম সমাজের হস্তশিল্প শেখার কোন যুক্তিসম্মত কারণ নেই।
শায়েখ তাকি উসমানি (দা. বা.) সাহেবের দৃষ্টিতে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাতে কারিগরি শিক্ষা যোগ করার কোন যৌক্তিকতা নেই। তার প্রথম যুক্তি এই যে, মাদ্রাসার সিলেবাস পরিপূর্ণরুপে আয়ত্ত্ব করতে গেলে ছাত্ররা কারিগরি শিক্ষা অর্জনে সময় বের করতে পারবে না। এই ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য এই যে, এক ধরণের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি একজন মানুষ অন্য আরেকটি সাধারণ বিষয় রপ্ত করতে পারে বা সেই বিষয়ে সময় দিতে পারে। যদি সাধারণ শিক্ষার দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, সেখানে ছাত্ররা তাদের মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্য কোন বিষয়ে সময় দিচ্ছে। বেশীর ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরে ৩ মাস ছুটি থাকে। এই লম্বা সময়ে তারা পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন একটি বিষয়ে সাধারণ ধারণা নিয়ে থাকে যা তাদের মৌলিক শিক্ষায় সহযোগিতা করে। বর্তমান যুগে প্রচলিত জীবন-বৃত্তান্ত লেখার সময় দেখা যায় যে, সেখানে এক অংশ থাকে মৌলিক শিক্ষার বিবরণ নিয়ে আর আরেক অংশ থাকে মৌলিক শিক্ষার বাইরে অর্জিত অন্য কোন শিক্ষা বা যোগ্যতার বিবরণ নিয়ে; এবং যারা এই জীবন-বৃত্তান্ত দেখেন বা বিবেচনা করেন তাদের কাছে, যে প্রার্থীদের মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ যোগ্যতা বেশি তারাই বেশি গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হন। যেমন একজন ছাত্র ইসলামি ফিকাহ বা আইন নিয়ে লেখাপড়া করছে, সে ইচ্ছা করলে সাধারণ আইন বা মানবাধিকারের উপর ডিপ্লোমা করতে পারে, যেই ডিপ্লোমা তার মৌলিক শিক্ষা ইসলামি আইনে সহযোগিতা করবে। সাধারণ শিক্ষায় দেখা যায় যে, একজন ছাত্র কোন বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি অন্য কোন কারিগরি বিদ্যা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে সেই কারিগরি শিক্ষাকেই সে তার ভবিষ্যত পেশা হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। তাহলে দেখা যায় যে, বর্তমানে মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে সময় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যার অর্থ ইচ্ছা করলে আমরাও—কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা—ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অন্য আরেকটি বিষয় রপ্ত করতে পারি, যদি সেই ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে আমরা এই দাবী করতে পারি যে, ছাত্র জীবনে মূল শিক্ষার পাশাপাশি আরেরকটি সাধারণ কোন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করা সম্ভব।
তাকি উসমানি (দা.বা.) এর প্রথম যুক্তির দ্বিতীয় অংশ ছিল এরকম যে, এই ধরণের কারিগরি বিষয় রপ্ত করার পরে তারা এই বিষয়কে যদি নিজেদের পেশা হিসাবে নিতে চান তাহলে তারা তাদের ইলমি খেদমতের পাশাপাশি সেই কাজে সময় দিতে পারবে না কিংবা খেদমতে যথেষ্ঠ সময় দিতে পারবে না।
এখন দেখা যাক ছাত্র জীবন সমাপ্ত করে, ছাত্ররা দ্বীনি ইলমের খেদমতের সাথে সাথে এই সাধারণ বিদ্যা বা কারিগরি শিক্ষাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে কি না। দ্বীনি ইলম অর্জন করে আমরা সাধারণত মাদ্রাসার শিক্ষকতা বা মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব জড়িত হয়। ইমামতি এমন একটি দায়িত্ব যে দায়িত্ব পালন করার জন্যে আলাদা কোন সময় ব্যয় করতে হয় না; যদিও এই দায়িত্বের জন্য ইমামের ব্যক্তিগত কাজের একটা রুটিন মেনে চলতে হয়, এবং দেখা যায় মাদ্রাসার শিক্ষকগণই তাদের আশেপাশের মসজিদগুলোতে ইমামতির দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আর মাদ্রাসায় কিতাব পড়ানোর যে দায়িত্ব সেই দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করার পরেও একজন শিক্ষক তার ব্যক্তিগত কোন কাজ পূরণ করার জন্যে যথেষ্ট সময় পেয়ে থাকেন। সেই সময়ে ইচ্ছা করলে তিনি তার দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণ করার সামান্য কোন কাজ করতে পারেন। মাদ্রাসার শিক্ষকগণ শিক্ষাদানের পাশাপাশি অন্য কাজ করার সুযোগ পান তার একটি প্রমাণ এই যে, অনেক শিক্ষক এমন আছেন যারা মাদ্রাসায় কিতাব পড়ানোর সাথে সাথে লেখালেখি করেন বা কিতাব অনুবাদ করে থাকেন। এতে প্রমাণ হয় যে, কিতাব পড়ানোর পর শিক্ষকদের হাতে অবসর সময় থাকে, যা ইচ্ছা করলে তারা তাদের যে কোন কাজে লাগাতে পারেন। সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের অনেকেই শিক্ষাদানের পাশাপাশি অন্য আরেকটি কাজে নিয়োজিত থাকে।
এখানে কওমি মাদ্রাসার দায়িত্ব পালনে যে সমস্যা তা এই যে, কওমি মাদ্রাসাতে সাধারণত ছাত্ররা যেমন ২৪ ঘন্টা মাদ্রাসার আবাসিক হলে থাকেন, শিক্ষকদেরকেও ২৪ ঘন্টা আবাসিক হলে থাকতে হয়। আমাদের মনে হয় মাদ্রাসার ছাত্রদের দেখাশুনার জন্য সকল ওস্তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক না করে একজন দুইজন শিক্ষকের দায়িত্ব থাকবে ছাত্রদের নেগরানি করা এবং এজন্য তাদেরকে শিক্ষার সাথে সাথে সম্মানী দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর যাদের মাদ্রাসার নেগরানীর দায়িত্ব থাকবে না তারা দরসের সময়ের পরে দায়িত্বমুক্ত থাকবেন—ইচ্ছা করলে মাদ্রাসাতে থাকতে পারেন আবার ইচ্ছা করলে মাদ্রাসার বাইরে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতে পারেন। মাদ্রাসার আলেমগন যদি মাদ্রাসার বাইরে সাধারণ কাজে নিয়োজিত হন তাহলে তারা সেই পরিবেশে বসেও দ্বীনের খেদমত বা দ্বীনের দাওয়াত চালিয়ে যেতে পারবেন। বরং এক্ষেত্রে আমাদের ধারণা এই যে, দ্বীনের খেদমত মাদ্রাসার পরিবেশের সাথে সাথে সাধারণ পরিবেশেও ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা দেখা দেবে।
তাকি উসমানি (দা. বা.) এর দ্বিতীয় যুক্তি ছিল এই যে, মানুষ যে পেশার মাধ্যমে সমাজের খেদমত করে থাকে সেই পেশার মাধ্যমে সে তার জীবিকা অর্জন করে থাকে এবং এটাকে সমাজের মানুষের পক্ষ থেকে কোনরুপ দয়া বা অনুকম্পা গ্রহন হিশেবে দেখা হয় না। একজন চিকিৎসক সমাজের যে খেদমত করছেন আর মসজিদ বা মাদ্রাসার একজন ইমাম বা শিক্ষক যে খেদমত করছেন, সেই উভয় প্রকার খেদমতই সমাজের জন্য অবশ্যই জরুরি। আমাদের দৃষ্টিতে একজন আলেম মুসলিম সমাজে যে খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন তা আমাদের সমাজের জন্য একজন ডাক্তারের খেদমত থেকে অনেক গুণ বেশি প্রয়োজনীয়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল আমাদের সমাজ একজন আলেমের এই খেদমতটুকুকে কি এই পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে থাকে? মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, সমাজ আমাদের ইমাম-মুয়াজ্জিন বা আলেম সমাজকে এই পরিমাণ গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিন তাদের দায়িত্ব পালন করে বিনিময়ে তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু পূরণ করার সামর্থ্য লাভ করছেন না। তাই পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করার জন্য দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দেয়ার সাথে সাথে, সাধারণভাবে ছোট কোন পেশা অবলম্বন করার জরুরুত অনেকেই অনুভব করে থাকেন।
চার. মাওলানা লিয়াকত আলির মত হলো,—’ফারেগ হওয়ার পর মাদ্রাসা পড়ুয়ারা কী করবে? এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা কর্তব্য। বর্তমানে এমন ধারণা পোষণ করা হয় যে, মাদ্রাসা পড়ুয়াদের কর্মক্ষেত্র শুধুমাত্র মসজিদ-মাদ্রাসা।………… আল্লাহর রহমতে দেশের আনাচে কানাচে কওমি মাদ্রাসার জাল বিস্তৃত হয়েছে। প্রতি বছর দাওরাতুল হাদিস সম্পন্ন করে বের হচ্ছেন কয়েক হাজার আলেম। কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র সে অনুযায়ী প্রসারিত হচ্ছে না। ফলে এখন অনেক আলেমকেই কর্মের খোঁজে পেরেশান থাকতে দেখা যায়। সুতরাং উলামায়ে কেরামের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে উলামায়ে কেরামের অন্তর্ভূক্তি বর্তমান সময়ে জটিল, কেননা কওমি মাদ্রাসার সনদ রাষ্ট্র স্বীকৃত নয়।…………সরকারি কাজ ব্যতীত আরো অনেক কাজ রয়েছে যাতে উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহন কঠিন নয়। বিশেষকরে বৃত্তিমূলক ও বানিজ্যিক কাজসমূহ। এসব কাজের জন্য সনদ মূখ্য নয়। তথ্য-প্রযুক্তি, প্রকাশনা, অফিস ব্যবস্থাপনা, ইউনানী চিকিৎসা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে উলামায়ে কেরাম অনায়াসে অংশ নিতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজন আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করা ও কিছুটা প্রশিক্ষণ নেওয়া। এজন্য মাদ্রাসাসমূহের অধীনে কিংবা মাদ্রাসার তত্ত্বাবধানে বৃত্তিমুলক প্রশিক্ষনের প্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।’
উপসংহার
এখানে চারজন আলেমের মন্তব্য উল্লেখ করা হল। যার মাধ্যমে আমাদের সামনে দুই ধরণের ধারণা আসে—কারো মতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মের উপযুক্ত শিক্ষা চালু করা দরকার, আবার কারো মতে এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা জরুরী। এটা ঠিক যে, কওমি মাদ্রাসার সাথে ঐতিহাসিকভাবে ‘কর্মসংস্থান’ শব্দটির সম্পর্ক মোটেই মাননসই নয়, কারণ, যে প্রেক্ষাপটে আমাদের এই উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কওমি মাদ্রাসার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, সেই অনুযায়ী নিজেকে পরিচালনা করা এবং ইখলাসের সাথে এই দ্বীনের জ্ঞান সমাজে প্রচার-প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। যুগ-যুগ ধরে আমাদের সমাজে পরিবর্তন এসেছে, আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় পরিবর্তন ঘটেছে, সমাজের মানুষের মন-মানসিকতার আমুল পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তিত নতুন পরিবেশে—মনে হয়—কওমি মাদ্রাসার সাথে কর্মসংস্থান শব্দটি আমরা যোগ করতে পারি বা অন্তত পক্ষে যোগ করার যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করতে পারি। ইতিহাসের কোন এক কালে শিক্ষা ছিল শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণীর অধিকার। বুদ্ধিজীবী মহলে এই বিতর্ক ছিল যে, শিক্ষা কি শুধুই শিক্ষার জন্যে, না শিক্ষা জীবিকা অর্জনের জন্যেও। সমাজের কঠিন বাস্তবতার সামনে এই বিষয়টি প্রতিভাত হয়েছে যে, শিক্ষা শুধুই শিক্ষার জন্যে না, বরং শিক্ষা জীবন ও জীবিকার জন্যেও। তাই বাস্তবতার সামনে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে জীবিকা অর্জনের উপায় ও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
আমাদের কওমি মাদ্রাসার নুরানি পরিবেশে আমরা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যে স্বচ্ছ-সঠিক ইলম অর্জন করে থাকি, যেই ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার কোন বিকল্প ধারা আজও তৈরি হয়নি এবং নিকট ভবিষ্যতে এর বিকল্প ধারা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও দেখি না। কিন্তু ছাত্রদের কর্মজীবনের বিষয়টি নিয়ে আমাদের চিন্তা ভাবনা করে দেখা উচিত। মানুষের জীবিকা অর্জনের পন্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। চিন্তা করে দেখা যায়, আজ থেকে ৫০ বা ৬০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবিকা অর্জনের কী পন্থা ছিল? হয়ত ব্যবসা না হয় কৃষিকাজ, এবং তাদের এই ব্যবসা ও কৃষিকাজের অবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। এইজন্যে কাউকে তেমন কোন প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা অর্জন করতে হত না। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা চিন্তা করে দেখুন, এখানে ব্যবসা কত জটিল একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব-বিদ্যালয়সমূহে ব্যবসা-বানিজ্য নিয়ে আলাদা ভাবে শাস্ত্রীয় জ্ঞান দান করা হচ্ছে, এখন আমাদের দেশে কৃষি-বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিশ্ব-ব্যবস্থার সামনে আমাদের তালেবুল ইলমের কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় এসেছে, আমাদের আগামী দিনের কওমি প্রজন্মের জন্যে এই বিষয়টি নিয়ে এখনই আমাদের ভেবে রাখা উচিত।
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক
