ভোটদানের সময় যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখছেন ইসলামপন্থী তরুণরা

হামমাদ রাগিব

রাত পোহালেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০১৪-এর নির্বাচন বাদ দিলে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার পর এবারই সর্বপ্রথম দলীয় সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে তরুণ ভোটারদেরকে। কারণ, ভোটারদের বড় একটা অংশ তরুণ প্রজন্ম। এ জন্য নির্বাচনী শ্লোগানের বেশির ভাগই দেওয়া হচ্ছে তরুণদের উপলক্ষ করে।

ইসলামপন্থী তরুণ ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনায় রাখছেন, এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর কথা বলেছে দেশের নানা প্রান্তের ইসলামপন্থী তরুণদের সঙ্গে। ভোট প্রদান নিয়ে তাঁদের আছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। অনেকে ভোট আদৌ দিতে পারবেন কি-না, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বিশেষ কিছু দিক বিবেচনা করে রেখেছেন, এগুলোর আলোকেই ভোটের জন্য নিজের প্রার্থী সিলেক্ট করবেন। আবার কেউ কেউ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতো বিব্রত। ভোট দিতে যাবেন কি-না, দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন এখনও।

তেমনই একজন তরুণ ভোটার নারায়ণগঞ্জের মাহফুজুর রহমান। রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাশ করার পর এখন ইসলামের ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনা করছেন। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, ‘ভোট ও নির্বাচন জনিত পরিস্থিতি নিয়ে বেশ সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। সমস্যাটা ঠিক কী, নিজেও বলতে পারি না। ভোট আদৌ দেব কি-না, জানি না।’

রাজধানীর দনিয়াস্থ পলাশপুর জামে মসজিদের খতিব তরুণ আলেম ইবরাহিম খলিল আগামী কাল ভোট দিতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভোটদানের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনায় রাখব, তা ভাবার আগে ভোট আদৌ দিতে পারব কি-না—এ নিয়েই সংশয়ের মধ্যে আছি। যা পরিস্থিতি, আগামী কাল কী অবস্থা হয়, জানি না।’

তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক, আগামী কাল ভোট দিতে যাবেন রাজধানীর মাদরাসাতুল কাউসারের শিক্ষার্থী যিয়াদ বিন সাঈদ। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কোন কোন জিনিসের প্রতি লক্ষ রাখবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইসলামপন্থী একজন ভোটার হিসেবে আমি সর্বাগ্রে ইসলামকেই রাখব৷ কাকে ভোট দিলে আমি একজন মুসলমান হিসেবে এই বাংলাদেশে চলাফেরা করতে পারব নির্বিঘ্নে, তার বিবেচনাই করবো৷ আমার টুপি, আমার পাঞ্জাবিকে যারা রেসপেক্ট করার মানসিকতা নিয়ে আছে তাদেরকেই ভোট দেব। আর এ জন্যেই আমি চাই পরিবর্তন। কারণ আমার এই পোষাক, আমার এই জাতিগত চিন্তাকে চলমান সরকার মেনে নেয়নি তো অবশ্যই৷ বরং আমার উপর ক্রমাগত অন্যায়ের এক অকল্পনীয় শক্তি দিয়ে বারেবারে রক্তচোখে তাকিয়েছে৷ আমাকে বিতাড়িত করতে চেয়েছে। সর্বোপরি আমি চাই এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন হোক৷ আসুক এমন একটি রাষ্ট্রক্ষমতা যেখানে ইসলাম ও মুসলমানেরা চিরশান্তির আলয় খুঁজে পাবে।’

নরসিংদীর তরুণ আলেম হাবিবুল্লাহ সিরাজ ভোটদানের ক্ষেত্রে তারুণ্যকে প্রাদান্য দেবেন। তিনি বলেন, ‘তারুণ্যের অঙ্গীকার পূরণে যারা অধিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, পাশাপাশি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে যারা বলীয়ান এবং ধর্মীয় ও বাক স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, তাদের প্রার্থীকেই ভোট দেওয়ার চেষ্টা করব।’

সিলেট আইডিয়াল কলেজের প্রভাষক ও তরুণ আলেম সাদিকুর রাহমান কিছু নীতির আলোকে নিজের পছন্দ নির্ণয় করে রেখেছেন। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে তিনি জানিয়েছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন ভোটারকে প্রথমত দুটো বিষয় বিবেচনায় রেখে ভোট প্রদান করতে হবে। এক. জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থ। দুই. স্থানীয় স্বার্থ বা উন্নয়ন। যাকে ভোট প্রদান করলে উভয় স্বার্থের প্রতিফলন ঘটবে তাকেই ভোট প্রদান করা উচিত। তবে সবার আগে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। একটি নির্বাচনী এলাকার স্বার্থের চেয়ে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতীক না দেখে প্রার্থীর যোগ্যতা, বৈশিষ্ট্য ও অতীত রেকর্ড মূল্যায়ন করাটা বাঞ্ছনীয়। তবে জাতীয় নির্বাচনে প্রতীকও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রার্থী ভালো কিংবা মন্দ হোক, প্রতীক বিবেচনার মনোনয়ন প্রদানকারী এমন কোনো দল যদি ক্ষমতায় চলে যায়, যার দ্বারা রাষ্ট্রে নাগরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, ইসলামের সুরক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে সেটা হবে সবার জন্যে অকল্যাণকর। সহজ কথায়, জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে মনোনয়ন প্রদানকারী দলকে বিবেচনায় রাখতে হবে। কোথাও যদি ভালো জোট বা দলের প্রার্থী পাওয়া না যায় তাহলে তুলনামূলক ভালো প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। সর্বোপরি, একজন মুসলমান হিসাবে ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি খেয়াল রেখে প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে।

‘দেশের একজন নাগরিক হিসাবে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই আমি আমার ভোট প্রদান করব।’

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের থিওলজির স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র সালেহ ফুয়াদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কথা হয়েছিল ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের বিশেষ প্রতিবেদকের। তিনি একটু স্বতন্ত্র ও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্ত করেছেন নিজের অনুভূতি। জানিয়েছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ৷ উইন্টার ভ্যাকেশন চলছে৷ গ্রামের বাড়িতে এসেছি৷ ছুটি কাটাব, সুযোগ থাকলে ভোটও দেব৷ কাকে ভোট দেব, কেন দেব তার একটা খসড়া হিসেব তো মনে মনে ঠিক করেই রেখেছি৷

‘আর সবার মতো আমিও তুলনামূলকভাবে ‘সৎ ও যোগ্য’ প্রার্থী দেখেই ভোটটা দেব৷ আমাদের দেশে পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক চর্চার অভাব রয়েছে৷ এ কারণে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট লেগেই রয়৷ সবগুলো দলই নিরেট ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে থাকে৷ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলগুলো যা যা প্রয়োজন তার সবটুকুই করে৷ আদর্শিক রাজনীতির চিন্তা বা চেষ্টা তাদের নেই৷ সে হিসেবে কোনো দলের প্রতিই আমার কোনো বিশেষ টান নেই৷

‘তবু ভোটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি ও দল দুটোকেই মাথায় রেখে ভোটাধিকার প্রয়োগ করাকে বেশি যৌক্তিক মনে হয় আমার৷ তাই প্রার্থী ও প্রার্থীর দলের (যদি থাকে) অতীত ও বর্তমান দেখে আমি ভোট দেবো ইনশাআল্লাহ৷’

আগের সংবাদনির্ভয়ে কেন্দ্রে যান, নিরাপত্তা দেবে সেনারা : সেনাপ্রধান
পরবর্তি সংবাদভোটের দিনে বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা নেই