
ফাতেহ ডেস্ক
জাপানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বৃদ্ধদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। নানা ধরণের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছেন এই বৃদ্ধরা। তারা মূলত বিনামূল্যে বাসস্থান ও খাদ্যের জন্য জেলে যেতে চান। তাই তারা অপরাধ করে নিজ থেকে থানায় গিয়ে ধরা দিচ্ছেন। এমন খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
৬৯ বছর বয়সী তোশিও তাকাতা হিরোশিমার একটি বাড়িতে বসবাস করেন। বেশ কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি সম্প্রতি মুক্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনি জানান, বিনা খরচে একটি থাকা-খাওয়ার জায়গা খুঁজছিলেন। সেটি কারাগার হলেও মন্দ নয়। ‘আমি এখন পেনশনের উপর নির্ভরশীল। আমার অর্থ ফুরিয়ে গেছে। সেজন্য আমি ভাবলাম যদি কারাগারে থাকি তাহলে হয়তো বিনা খরচায় থাকতে পারবো।’
তিনি আরো জানান, ‘কারাগারে যাবার জন্য রাস্তার পাশ থেকে একটি বাইসাইকেল নিয়ে সেটি চালিয়ে সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে বললাম, আমি এটা চুরি করেছি।’ জাপানের আদালতে ছোট-খাটো চুরির বিষয়গুলোকেও বেশ গুরুত্ব সহকার গ্রহণ করে। ফলে তোশিওকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলো।
দ্বিতীয় অপরাধের প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি একটি পার্কে গেলাম এবং কয়েকজন মহিলাকে ছুরি দিয়ে ভয় দেখালাম। তাঁর কোনো ক্ষতি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি ভেবেছিলাম তাদের কেউ একজন পুলিশকে ডাকবে। একজন সে কাজটি করলেন। আর এবার সাত বছরের জেল হয়।’
তোশিও আরো বলেন, ‘আমি যে কারাগারে থাকতে পছন্দ করি, তা নয়। কিন্তু আমি সেখানে বিনা খরচে থাকতে পারি। সেখানে থাকা অবস্থায় আমার পেনশনের অর্থ খরচ হয় না। সুতরাং কারাগারে থাকা খুব একটা কষ্টের নয়’।
জাপানে বৃদ্ধদের দ্বারা যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে তোশিও তার একটি উদাহরণ মাত্র। জাপানের মানুষ ভীষণভাবে আইন মেনে চলে। ১৯৯৭ সালে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন অপরাধী ছিলেন ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষ। আর এখন প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন অপরাধী হলেন ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। ২০১৬ সালে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে অপরাধীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। আর তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ পাঁচ বারের বেশি অপরাধের জন্য দণ্ডিত হয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৭০ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘আমি আমার স্বামীর সাথে থাকতে পারিনি। আমার এখন কোথাও থাকার জায়গা নেই। সুতরাং আমার একমাত্র উপায় ছিল কোনো কিছু চুরি করে কারাগারে যাওয়া’।
তিনি আরো বলেন, ‘৮০ বছরের ঊর্ধ্বে যারা ঠিকমতো হাঁটতে পারে না তারা অপরাধ করছেন। কারণ তাদের খাবার নেই, টাকা নেই’।
এই সব বয়স্ক ব্যক্তি যেসব অপরাধ করছেন সেগুলোর মধ্যে প্রধানত রয়েছে সুপার শপ থেকে জিনিসপত্র চুরি করা। এগুলো খুব দামি জিনিস নয়, এগুলোর বেশীর ভাগের দাম তিন হাজার ইয়েন বা ২০ পাউন্ডের কম।
অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত মাইকেল নিউম্যান ২০১৬ সালে প্রকাশিত তার এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, বাড়ি ভাড়া, খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সেবার জন্য পেনশন গ্রহণকারী অনেক বৃদ্ধ ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। জাপানের যেসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা কম, সেসব জায়গায় তরুণরা তাদের পরিবার ছেড়ে কর্মসংস্থানের জন্য অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ফলে পেনশনের উপর নির্ভর বৃদ্ধরা বেকায়দায় পড়েন। তাই পেনশনের অর্থের উপর নির্ভরশীল হয়ে যারা চলতে পারবেন না, তারা কারাগারে থাকা শ্রেয় মনে করছেন।
অপরদিকে ‘উইথ হিরোশিমা’ নামের একটি সংস্থার পরিচালক কানিচি ইয়ামাদা মনে করেন, বৃদ্ধদের অপরাধ প্রবণতা তৈরি হবার বিষয়টি মানসিক সমস্যার সাথে সম্পর্কিত। এর সাথে আর্থিক কোনো সম্পর্ক নেই।
কানিচি আরো বলেন, ‘বৃদ্ধরা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। তারা একাকিত্ব সহ্য করতে পারছেন না। সাধারণত মানুষ অপরাধ করে না, যদি তাকে দেখাশোনা করার কেউ থাকে’।
তিনি মনে করেন, ‘অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি একটি অজুহাত মাত্র। তাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে একাকিত্ব। যারা প্রচণ্ড একাকিত্বে ভুগছেন, তারা বারবার অপরাধ করার মাধ্যমে কারাগারে যেতে চাইছেন। কারণ সেখানে তারা সঙ্গী খুঁজে পান।’
উৎস : বিবিসি বাংলা
