
মাওলানা রফীকুল ইসলাম
শনিবার রাতে ইহলোক ত্যাগ করেন মাদানিনগর মাদরাসার শাইখুল হাদীস আল্লামা যাকারিয়া (রহ.)। জীবনের সুদীর্ঘ সময় হাদীসে রাসূলের খেদমত শেষে, তিনি সাড়া দিলেন মাহবুবের ডাকে। অশ্রুজলে ভাসিয়ে দিয়ে গেলেন আমাদের মাদানি প্রাঙ্গণ।
কেমন দেখেছি তাঁকে? কেমন ছিলেন তিনি? এ প্রশ্নটি আজ কাছের-দূরের সবার। তাঁর জীবনচিত্র ছবির মতো জীবন্ত আমাদের স্মৃতির ফ্রেমে। তিনি ছিলেন, তিনি থাকবেন। তাঁর রুহানি বরকত আমাদের দিলকে জিন্দা রাখবে জীবনভর।
তাঁকে দেখে শিখেছি কীভাবে আত্মগরিমাকে মাটি দিয়ে ‘শাইখুল হাদীস’ হয়েও একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করতে হয়। জীবনের চলার পথে, নানারকম কাজ করতে গিয়ে, তিনি মিশে যেতেন সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষের সাথে। সাধারণ ও অসাধারণের মাঝে পার্থক্যের কথা হয়তো তিনি কখনও ভাবেনইনি। কার কী কর্ম, সেটাও তিনি পার্থক্য করতেন না। হাদীসের দরস থেকে নিয়ে বিকালে তাবলিগ জামাতের গাশতেও ছুটে যেতেন আল্লাহর দ্বীনের বার্তা নিয়ে। মেধার অহংকার কিংবা বহিঃপ্রকাশও তিনি কোনো দিন করেননি। সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত এ মানুষটি বিলাসিতা কিংবা চাকচিক্য কাকে বলে তাও হয়তো জানতেন না।
অপরের কষ্টে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন শাইখুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.)। এটি ছিলো তাঁর সবচেয়ে সুন্দর মানবিক গুণগুলোর একটি। মাদরাসার কোনো শিক্ষক কিংবা তাঁর ভক্তবৃন্দ ও খায়েরখাহিদের কষ্টে তাঁকে দ্বিগুণ কষ্ট পেতে দেখেছি। তিনি আক্রান্ত ব্যক্তির চেয়েও বেশি ব্যথিত হতেন। কিন্তু এ ব্যথা বুঝতে দিতেন না। খুব আড়াল থেকেই তার পাশে দাঁড়াতেন।
তিনি ছিলেন প্রবল মেধার অধিকারী। তার মেধার একটা উদাহরণ দিই। একবার তিনি চক্ষু রোগে ভুগছিলেন। চোখে দেখতে পেতেন না। কণ্ঠ অনুমান করেই সবার সঙ্গে কথা বলতেন। একদিন এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে। তিনি ৫-৭ বছর আগে হযরতের সঙ্গে আরেকবার দেখা করেছিলেন। এবার যখন এলেন, হযরত তো অন্ধ। চোখে দেখতে পান না। তবুও ওই লোককে চিনতে ভুল করেননি। তার কণ্ঠ শুনেই বললেন, ‘তুমি সেই লোক না?’ এমন বিস্ময়কর মেধা আল্লাহ তাঁকে দিয়েছিলেন। ছোট-বড়, দূরের-কাছের যেই হযরতের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, তারই ভালো-মন্দ ও সকল খোঁজখবর হযরত নিতেন।
দেওবন্দের উলামাদের কাছেও তিনি ছিলেন খুবই প্রিয়ভাজন। সাহারানপুরি সাহেব (রহ.) থেকে নিয়ে দেওবন্দের অনেক উস্তাদই তাঁর খোঁজখবর রাখতেন। আমার নিজের কথা নয়। দেওবন্দের উস্তাদ হযরত ওমর ফারুক সন্দিপি সাহেব বলেছেন, বাংলাদেশ সফর শেষে তিনি দেওবন্দ ফিরে গেলেই সাহারানপুরী সাহেব (রহ.) যাকারিয়া সাহেব (রহ.)-এর খোঁজ খবর নিতেন। হযরত আসআদ মাদানী (রহ.)-এর খলিফা ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে আমরা আমাদের মাদানি বাগানের আরও একটি ফুল হারালাম। যে ফুলের ঘ্রাণ আমাদের মাতিয়ে রাখতো সারাক্ষণ, সারাবেল।
লেখক : ফুনুনাত বিভাগের যিম্মাদার, মাদানিনগর মাদরাসা।
অনুলিখন : ওমর ফারুক
