৩৬ নম্বর বাস এবং ড্রাইভার-হেলপারদের জীবন

কাজী মাহববুবুর রহমান 

ছেলেটির নাম শহিদুল। বয়স একুশ বাইশের মতো হবে। শুকনো লিকলিকে শরীর৷ গায়ের পোশাক ধুলিমলিন৷ আমাদের পরিচয় ৩৬ নম্বর বাসের দরজায়। সন্ধ্যা সাতটার পরে দরজায় ঝুলতে ঝুলতে মিরপুর যাচ্ছি। উঠেছিলাম খামারবাড়ি থেকে। বাস অত্যন্ত মন্থর গতিতে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। একবার সিগনাল পড়লে অন্তত ২০ মিনিটের আগে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবারই বাস জ্যামে পড়লে ইচ্ছে করে নেমে হেঁটে চলে যাই। এর চেয়ে হেঁটে যাওয়া ভাল। তবু আশায় আশায় বাস ছাড়া হয় না।

ভাবলাম দরজায় ঝুলছিই তো। সময় কাটছে না। নানান উচ্চবাচ্য শোনা যাচ্ছে। আমাদের চারপাশে কত রকম মানুষ। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া আমরা কেউ কারও খোঁজ রাখি না। বাসভর্তি লোকজন, এদের কারও সঙ্গেই কোনো অজুহাত ছাড়া কথা বলা যাবে না। কিছু বললে সন্দেহ করবে।

একমাত্র হেল্পার ছেলেটার সঙ্গেই মনে হলো, কথাবার্তা বলা যায়।

শহিদুল এই পেশায় লেগে আছে ছয় বছর যাবত। শুরু করেছিলেন একেবারে গোড়া থেকে। একদম শুরুতে গাড়ি ধোয়ার কাজ করে। এই পেশার এক বিচিত্র তথ্য জানা গেল। শহিদুলকে বললাম, ‘একজন নতুন লোক নিয়োগ করলে তার বেতন হতে পারে?’

শহিদুল বললেন, ‘কোনো নতুন লোক নেয়া হয় না।’

একদম গোড়া থেকে শুরু করতে হয়। যে কারোরই জন্য একই নিয়ম। ড্রাইভারকে বলা হয় ওস্তাদ। ওস্তাদের সঙ্গে থেকে থেকে একটু একটু করে পাক্কা কর্মচারী হয়ে ওঠা। স্টেশন থেকে বাস বের করতে করতে চালকের পদে অনুশীলন। এভাবেই শুরু হয় তাদের শ্রেণীর একজন গাড়ি চালকের প্রথম পাঠ।

যতদিন ওস্তাদের শিষ্যত্বে পুরোপুরি পাকা হয়ে উঠতে পারবে না, ততদিন কোনো ধার্য বেতন নেই। ওস্তাদের সঙ্গে থাকা-খাওয়া এবং তারই ইচ্ছামাফিক কিছু হাতখরচ।

লোকাল বাসের সঙ্গে জড়িত কারোরই নির্ধারিত বেতন থাকে না। গাড়ির মালিকের কাছ থেকে ড্রাইভার একটি গাড়ি বের করে আনেন। সেই গাড়ির সারাদিনের রোজগার দুইভাগে ভাগ হয়ে অর্ধেক মালিকের হাতে চলে যায়। আর অর্ধেক ভাগ হয় স্টাফদের ভেতর। সেই অর্ধেকের ভেতরেও থাকে ড্রাইভারের প্রতি কিছুটা সমীহ। এভাবে কাজ করতে করতে একজন ছোট স্টাফ বড় হন। তাদের সকলেরই লক্ষ্য থাকে ড্রাইভার হওয়া।

আমরা যে ৩৬ নম্বর বাসটিতে ছিলাম ওটাতে তিনজন স্টাফ ছিল। শহীদুল জানালন, তারা তিনজনই ড্রাইভার। প্রয়োজনে পালাবদল করে তারা ডিউটি করেন।

বাংলাদেশের সড়ক ও যোগাযোগ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। সদ্য অতীত দুই হাজার আঠারোতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাবিশ্বে আলোড়ন তুলে গেল ছাত্র আন্দোলন৷ প্রতিদিন সবচে বেশি পরিমাণ মৃত্যু বয়ে আনে সড়ক দুর্ঘটনা। সুস্থ স্বাভাবিক একটা চঞ্চল প্রাণের উপর দানবের মতো পা তুলে দেয় ঘাতক বাস-ট্রাক।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় আতংক হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ সংবাদপত্র খুলতেই প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ দেখতেই হবে৷ রাস্তাঘাট পারাপার এবং ভ্রমণ সব কিছুই হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক৷ আমাদের কোনো প্রিয়জন ঘরে ফিরতে দেরি করলে সর্বপ্রথম আমাদের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনার কথাই আসে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ এক পেশায় যাঁরা থাকেন, তাঁরা দূরের কেউ না৷ আমাদেরই কাছের কেউ। কিন্তু পেশা তাঁদের মস্তিষ্ক বদলে দিয়েছে৷ দুর্ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে আমাদের এবং তাঁদের দেখার চোখ ভিন্ন। আমরা দুর্ঘটনাগুলিকে এখনো দুর্ঘটনাই ভাবি। তাঁদের কাছে এইগুলি হয়তো স্রেফ ঘটনা। আমরা যখন এসব দুর্ঘটনার দুঃখ নিয়ে ভাবি, তাঁরা ভাবেন প্রটেকশন নিয়ে; কোন কিসিমের দুর্ঘটনা ঘটলে কে কত ভাগ ক্ষতিপূরণ দেবে। ভাবনার এমন দুই প্রান্তেও জীবন চলে যাচ্ছে স্বাভাবিক৷