আসামে কেন আপাতত আরাকানের মতো বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই?

ওমর ফারুক:

সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে আসামের নাগরিক তালিকার খসড়া। গত সপ্তাহের সোমবার এ তালিকা প্রকাশ করে ভারতের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কর্মসূচী ‘এনআরসি’। এতে ৪০ লাখ বাঙালি হিন্দু-মুসলিমের নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। যাদের প্রায় সবাই ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু।নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ার অর্থ ওই বাসিন্দাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এ নিয়ে বেশ আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। ফাতেহ২৪ এর পক্ষ থেকে এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয় তালিকা প্রকাশের পর থেকেই। যোগাযোগ করা হয় ইতিহাসবিদদের সঙ্গে। কথা হয় অসমীয় মুসলিম নাগরিকদের সঙ্গেও। তাতে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে।

আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ও জনমিতি

প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসামে অনুপ্রবেশকারী অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করতে’ এই তালিকা করা হয়েছে। ১৯৫১ সালের পর প্রথমবারের মতো এই তালিকা করে বিজেপি সরকার। এ রাজ্যটির মোট তিন কোটি ২৯ লাখ বাসিন্দার মধ্যে এনআরসিতে নাম উঠেছে দুই কোটি ৯০ লাখ মানুষের। আসামের জনসংখ্যার প্রায় ৩৫% মুসলিম। এর মধ্যে সিলেটের পার্শ্ববর্তী বরাক উপত্যকার মুসলিমরা সেখানকার ভূমিপুত্র, অন্যদিকে রংপুরের পার্শ্ববর্তী বৃহত্তর গোয়ালপাড়ার মুসলিমরাও সেখানকার ভূমিপুত্র। মূলত ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে পৃথক আসাম রাজ্য গঠন করার সময় বেঙ্গলের বরাক উপত্যকা এবং গোয়ালপাড়াকে আসামের সাথে দিয়ে দেয়া হয়, এর ফলে আসামে বাঙ্গালি মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে যায়।

পাশাপাশি বৃটিশ সরকার তার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশ থেকে ৪৭ পুর্ববর্তী সময়ে বেশ কিছু বাঙ্গালী কৃষককে সেখানে নিয়ে যায়, যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম। তবে ৪৭ পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের আসামে যাওয়ার আর কোন প্রবণতা দেখা যায় না। যদিও নানা কারণে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের ৪৭ কিংবা ৭১ পরবর্তী সময়ে আসামে যাওয়ার প্রবণতা আছে, তবে সংখ্যাটা একেবারেই নগন্য।

যেভাবে আসাম সঙ্কটের শুরু

১৯ শতকের অসমীয় মুসলিমদের ইতিহাস করুণ ও বেদনাময়। ১৯৮৩ সালে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে হিন্দুরা প্রায় ৫ হাজার মুসলিমকে হত্যা করে। তারপর থেকে নানা সময়ে ছোট ছোট দাঙ্গা অব্যাহত ছিল। এ দাঙ্গার পর ১৯৮৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় আসামের। সেখানে বলা হয়, যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে থেকেই আসামে বসবাস করে আসছেন তারাই আসামের প্রকৃত বাসিন্দা হিসাবে বিবেচিত হবেন।’

সম্প্রতি এ নাগরিক তালিকা প্রকাশ নিয়ে গত কয়েক মাস যাবতই উদ্বিগ্ন ছিল মুসলিমরা। বিজেপির লোকজন এবং কিছু মিডিয়া এমনভাবে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল যে, ১ কোটির অধিক সেখানে অনুপ্রবেশকারী আছে,যার একটা বড় অংশ মুসলমান।

কারা বাদ পড়েছেন?

নাগরিক তালিকার খসড়া প্রকাশের পর দেখা গেছে, এখানে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের সংখ্যাই বেশী। পাশাপাশি কাগজপত্রের জটিলতা নিরসন সম্ভব হলে এই পরিমাণ আরও কমে আসবে। কারণ, এসব লোকের কারো মা, কারো বাপ, কারো ভাই কারো বোনের নাম ইতিমধ্যেই খসড়া তালিকায় নাম এসেছে। ফলে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাটা আরও কমে আসবে।

ফলে এর মাধ্যমে আসামের মুসিলমদের বিশাল একটি অংশ ইতিহাসের চরম অসত্য ও অপবাদের বোঝা থেকে বেঁচে গেলেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাদ পড়া তালিকায় ৭০ ভাগই হিন্দু। যারা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে আসামে গিয়েছিলো। অথচ এ হিন্দুরাই নিজেদের রাজনৈতিক বা জাতিগত বিদ্বেষ থেকে মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বলে নানা সময়ে অপবাদ দিত।

এ তালিকার আওতায় দেখা যায়, দেশভাগের পর হিন্দুদের অনুপ্রবেশ সবচেয়ে বেশি ছিল আর এ তুলনায় মুসলিমদের সংখ্যা ছিল কম। তাই মুসলিমরা বেঁচে যায়। যদিও যুগ যুগ ধরে তাদের অনুপ্রবেশকারী বলেই অপবাদ দিয়ে আসা হচ্ছিল। যুগের পালাক্রমে সম্প্রতি নাগরিক তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে স্থানীয় অসমীয়দের কাছে প্রমাণ হলো যে আসলে হিন্দুদের বিশাল অংশই অনুপ্রবেশকারী। ফলে তারা অনেকটাই হতাশ। তারা চেয়েছিল এ তালিকা প্রকাশের পর দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিমদের দেশ ছাড়া করবে। তারা এখন এনআরসি বাতিল ঘোষণা দেওয়ারও দাবি তুলছে।

আসামে মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা

আসাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আসামে মূলত এককোটি ২০ লাখ মুসলিম বাস করে। যেই ৪০ লাখের নাম খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছে তাদের ৮০% হচ্ছে এমন যাদের পরিবারের কোন না কোন সদস্যের নাম খসড়া তালিকায় এসেছে, ফলে এই ৮০% মানুষের নাম চুড়ান্ত তালিকায় চলে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আর বাকী রইল ২০% যাদের পুরা পরিবারের নামই বাদ পড়েছে। মুলত এই ২০% লোককেই আসামের স্থানীয় বাসিন্দা প্রমানে বেগ পেতে হবে। তবে ২০% এর মধ্যে ১% হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী।

অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এআইইউডিএফ প্রধান ও এমপি বদরউদ্দিন আজমল তাদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই এ নাগরিক তালিকা থেকে মুসলিমদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এর মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছেও বলেও তারা দাবী করেছেন।

হিন্দু মুসলিম যেই হোক তারা কী বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গাদের মতোই বোঝা হয়ে দাঁড়াবেন এমন আশঙ্কার কথাও উড়িয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ,৭১ পরবর্তী সময়ে যাওয়া বাঙ্গালী হিন্দুদেরকে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে রেখে দেয়ার নানা প্রস্তাব আসছে। পরবর্তীতে নতুন কোন আইন করে তাদেরকে হয়ত নাগরিকত্বও দেয়া হবে।

রয়ে গেছে কিছু শঙ্কা

ভারতে ক্রমশ উগ্র হিন্দুত্ববাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে তারা নানাভাবে মুসলমানদের বিপদে ফেলতে চেষ্টা করছে। আসামে উপজাতি , মুসলিম ও হিন্দু, এই তিন সম্প্রদায়ের বসবাস। এই তিন সম্প্রদায়ও বেশ কয়েকটি উপসম্প্রদায়ে বিভক্ত। বিজেপি এই সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে, ‘ভয় ও অবিশ্বাস তৈরির করছে বলে অনেকে অভিযোগ করছেন।’ এভাবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভক্তি তৈরি করা গেলে দাঙ্গা বেঁধে যাবার আশঙ্কা আছে। দাঙ্গা লেগে গেলে ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ প্রসারিত হবে। তাতে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবার মত সঙ্কটও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আগের সংবাদইরান নিয়ে গোটা বিশ্বকেই হুমকি দিলেন ট্রাম্প
পরবর্তি সংবাদটানা আন্দোলনের পর স্বাভাবিক হচ্ছে গণপরিবহন