ভারতীয় চ্যানেল বাংলাদেশের জন্যও কেন হুমকি স্বরূপ?

মুসান্না মেহবুব

সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট থেকে পাকিস্তানে সবধরনের ভারতীয় চ্যানেল সম্প্রচারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি কর। দেশটির প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘পাকিস্তানে ভারতীয় কোনো টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করা যাবে না। এটা আমাদের সংস্কৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ।’

স্বাভাবিকতই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশেও তো ভারতীয় চ্যানেল দেদারসে সম্প্রচারিত হচ্ছে, মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেখছে, ভিনদেশের এসব টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্যও কি হুমকি নয়?

বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থা এমন হয়েছে, ভারতীয় চ্যানেলের সম্প্রচার আমাদের প্রতিটা ঘরে ঘরে। স্যাটেলাইট ডিশ মানেই ভারতীয় চ্যানেল। আর ভারতীয় চ্যানেল মানে অলংকার আর নানা চমকের ঝলকানির পোশাক পরে সংসারের কূটনামি আর ষড়যন্ত্র মার্কা ধারাবাহিক। ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত সিরিয়ালগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজে। উচ্চবিত্তের পরকীয়া, বহুবিবাহ, বউ-শাশুড়ির যুদ্ধ, পারিবারিক বিরোধ প্রভৃতি এইসব সিরিয়ালের মুল বিষয়বস্তু, যা কঠিন ব্যাধির মতোই মানসিক আঘাত হানছে নারী ও শিশু দর্শকের।

এইসব সিরিয়ালের কুপ্রভাবে সমাজে বাড়ছে অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা, পরকীয়া, বহুবিবাহ, মনোমালিন্য, সন্দেহ, ডিভোর্সসহ আত্মহত্যার মতো বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনা। যুব সমাজের একটি অংশ আসক্ত হয়ে পড়েছে হিন্দি ভাষায়। আগে বলা হতো নাটক-চলচ্চিত্র সমাজের দর্পণ। আর এখন দেখা যায় তার উল্টো। অর্থাৎ- জীবনই নাটক-সিনেমার দর্পণ।

ভারতীয় চ্যানেলগুলি যে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিকে দূরারোগ্য ব্যাধির মতো নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে তা সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। ফলে সমাজের একটি বড় অংশ যখন ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে, ঠিক তখনই কেউ কেউ মিনমিনে স্বরে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ না করার পক্ষে নানা যুক্তি খাড়া করছেন। তাদের যুক্তি, মুক্ত এই আকাশসংস্কৃতির যুগে উত্তরের জানালা যদি খুলে দেয়া হয়, সেই জানালা দিয়ে বাতাসের সাথে খানিকটা ধুলো-বালিও নাকি আসবে। এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

খানিকটা ধুলো-বালি যদি আসত, তা নাহয় সহ্য করা যেত। কিন্তু এ যে ধুলো-বালি নয়, রীতিমত কাদামাটি ও নোংরা জল; যা আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অংগনকে একসাথে কর্দমাক্ত করে দিচ্ছে। ভারতীয় চ্যানেল আমাদের ‘দেশীয় পণ্য কিনে হও ধন্য’ শ্লোগানটাকেও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ভারতীয় চ্যানেলে ভারতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন থাকবে তা স্বাভাবিক। কিন্তু এই বিজ্ঞাপনের বদৌলতে আমাদের নারীসমাজ ভারতীয় পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে দিনের পর দিন।

ভারতীয় সিরিয়ালের নামে বাজারে ঈদ-পূজায় পোশাক আসে। সেই পোশাক কিনতে না পেরে ডিভোর্স ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আমাদের সমাজে ভারতীয় চ্যানেল যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এই সমস্ত ঘটনা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। দেশের ভালো ভালো পণ্য আজ ভারতীয় পণ্যের কাছে হেরে যাচ্ছে কেবল প্রচারের অভাবে।

বোদ্ধা সমাজ মনে করেন, আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে ভারতীয় চ্যানেলগুলো আমাদের দেশীয় সভ্যতায় যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা দিন দিন বেড়েই চলবে, যদি না এসব চ্যানেল সম্প্রচারের ব্যাপারে খুব দ্রুত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

আগের সংবাদইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিএনপির বৈঠক
পরবর্তি সংবাদসংখ্যালঘু ও উপজাতিদের ওপর নৃশংসতা চালাচ্ছে বিজেপি : রাহুল গান্ধী