ক্ষুধা আর দুর্গন্ধে মনে হতো চিৎকার করে কান্না করি: দেওবন্দ ফেরত শিক্ষার্থী

ওমর ফারুক :

গত ১০ মে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে দেশে ফেরার পথে ত্রিপুরার আগরতলা রেলস্টেশনে আটক হয়েছিল ২৪ জন শিক্ষার্থী। পরবর্তী ৫ জুন মাসে ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী এলাকার বটতলায় আটক হয়েছিল আরও দুইজন দেওবন্দ ফেরত শিক্ষার্থী। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক এ ২৬ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন দেশের আলেমসমাজ। সেসময় কওমি ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীতে দেওবন্দে বৈধভাবে পড়তে যাওয়ার সুযোগ দাবিতে মানববন্ধনও করা হয়েছিল। আটকদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়েও পরোক্ষভাবে দাবি করা হয়। অবশেষে মাস কয়েক জেল খেলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তারা দেশে ফিরেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবারও সর্বশেষ ছয় শিক্ষার্থী দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন আটক দলটির সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষাকারী   দেওবন্দের সাবেক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আল আমীন। মাওলানা আল আমীনের সূত্র ধরেই যোগাযোগ করা হয় মুক্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী মাওলানা মুহাম্মদ ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি গত ৫ জুন ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী এলাকার বটতলায় আটক দুই শিক্ষার্থীর একজন। ফাতেহ২৪ এর কাছে জীবনের এ জটিল অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন মাওলানা ওমর ফারুক।

তিনি বলেন, বছর শেষে সীমান্ত পারি দিয়ে দেশে ফেরার ব্যাপার নিয়ে আগ থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ, চারপাশ থেকে শুনছিলাম কিছুদিন আগেই আটক চারজন শিক্ষার্থীর একজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। জেলাখানায় এসেও এ কথা শুনেছিলাম। যদিও নিহত শিক্ষার্থীর পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ সত্যতা আমার জানা নেই।

‘এ ভয় ভীতির মাঝেই আমরা দুইসঙ্গী একজন দালালকে ঠিক করি। তার সঙ্গে সীমান্ত পার করে দেওয়ার ব্যাপারে ১২ হাজার টাকার চুক্তি হয়। নির্ধারিত সময়ে বিমানে দিল্লি কলকাতা হয়ে করে আখাউড়া পৌঁছি। সেখান থেকে দালালের মাইক্রোবাসে করে সীমান্তবর্তী এলাকা বটতলায় যাই। একটি বাজারে যেয়ে দালাল আমাদের অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু আমরা তার সঙ্গে যেতে চাই বললাম। কারণ, অপরিচিত জায়গায় একা একা বসে থাকা নিরাপদ মনে করছিলাম না।’

বাজারের ভেতর ঢুকে দালাল আমাদের একটু দাঁড়াতে বলল। এ সুযোগে আমরা কিছু ইফাতরসামগ্রীও কিনি। একটু পরেই দালাল দৌঁড়ে এসে আমাদের তারাতারি গাড়িতে উঠতে বলে। সবকিছু রেখেই আমারা গাড়িতে এসে উঠলাম। দালাল গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে শুরু। শুরু জীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। গোটা দুইটা মাস আমাদের অবর্ণনীয় কষ্ট, মানসিক নির্যাতন ও হেনস্তার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।’

মাওলানা ওমর ফারুক বলেন, আমাদের সন্দেহ ওই দালালই আমাদের ধরিয়ে দেয়। দেখা হওয়ার পরই সে আমাদের থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে গিয়েছিল। দালাল গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পরই একজন সিভিল পোশাকের পুলিশ এসে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় কয়েকটি চড় থপ্পড়ও মারে তারা। তারপর কারাগারে নিয়ে যায়।

মাওলানা ওমর ফারুক বলেন, কারাগারের কষ্টের দিনগুলো খুবই নির্মম। শারীরিক নির্যাতন না হলেও ক্ষুধার কষ্ট সইতে হয়েছে আমাদের দিনের পর দিন। প্রতিবেলায় দু লোকমা মুখে দিলেই খাবার শেষ হয়ে যেতো। পেটের ক্ষুধা পেটেই থেকে যেতো। টয়লেটের দুর্গন্ধ আর ক্ষুধায় মনে হতো চিৎকার করে কান্না করি। পরদেশে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার মতো কেউ ছিল না। বাহির থেকে খাবার দিয়ে যাবে এমনও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অবশেষে কীভাবে ছাড়া পেলেন?

মাওলানা ওমর ফারুক জানান, কারাগারে আমরা দু’ মাসের মতো থাকি। এর মধ্যে কারাগারেই উকিলের একজন মুহুরি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমাদের পরিবারের নাম্বার নিয়ে যায়। তারা আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মুক্তির শর্তে উকিল অনেক টাকা দাবি করে। অবশেষে ছাড়া পেতে প্রতিজন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা করে খরচ করতে হয়।

দেওবন্দে পড়তে যেয়ে ভিন্ন এ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী? জানতে চাইলে মাওলানা ওমর ফারুক জানান, আল্লাহ হয়তো এটি আমার কপালে রেখেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আমার জন্য আরও ভালো কিছু রেখেছেন বলে আমি মনে করি। এটি আমার অপরাধেরই শাস্তি। এর জন্য কাকে আর দায়ী করবো? তবে বাংলাদেশ সরকার ও মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে যেন আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের বৈধভাবে দারুল উলূম দেওবন্দে পড়তে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ইলম শিখতে যেয়ে আমাদের মতো কোনো শিক্ষার্থীর এভাবে হেনস্তার শিকার হতে না হয়।