উগ্র নাস্তিক্যবাদ প্রতিরোধে কতোটা সফল হেফাজতে ইসলাম?

ওমর ফারুক :

 

বাংলাদেশে নাস্তিকদের উত্থান শুরু হয় গত এক যুগ ধরে। তাদের উত্থানের পর থেকে বারবার ইসলামকেই টার্গেট করা হচ্ছিল। ইন্টারনেট ও ব্লগ সাইটগুলো ছিল তাদের মিশন পরিচালনার মূল ক্ষেত্র। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের ইসলাম ধর্ম ও নবী মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে নানা কটূক্তি করার পর থেকেই বিষয়টি সামনে আসে। সামনে আসে ব্লগের মতো একটি শক্তিশালী মত প্রকাশের মাধ্যম। এর আগে ইসলামি মহলেও ব্লগিং খুব একটি জনপ্রিয় ছিল না।

১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আততায়ীদের হাতে নাস্তিক রাজিব হায়দারের নিহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে নাস্তিকদের অজানা সব তথ্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তখন ‘ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার চক্র’ এবং ‘ব্লগে নাস্তিকতার নামে কুৎসিত অসভ্যতা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে। সাথে সাথে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে। এরই সূত্র ধরে আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে উত্থান ঘটে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের। যে সংগঠনের লক্ষ্য ছিল নাস্তিক্যবাদের প্রতিরোধ ও নবী (সা.) এর মর্যাদা রক্ষা। নাস্তিক্যবাদীদের বিরুদ্ধে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী আন্দোলন ও শানে রেসালাত সম্মেলন।

মূলত নাস্তিক রাজিব হায়দার নিহত হওয়ার পর শাহবাগ আন্দোলনের উত্থান হয়। শাহবাগের মঞ্চ থেকে নাস্তিক্যবাদের সমর্থনে স্লোগান উঠলেই এর বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম জেগে উঠে। অপরদিকে শাহবাগীরাও রাষ্ট্রের সমর্থণ পেয়ে যাচ্ছিল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রাজিব হায়দারের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান এবং শাহবাগীদেরকে ১৯৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করেন। তবে বেশি দূর যেতে পারেনি শাহবাগ। নাস্তিকদের উত্থানের পর তাদের বিরুদ্ধে হেফাজতের সাহসী ভূমিকা দেশব্যাপী সাড়া ফেলে দেয়। তাদের স্মরণকালের বৃহত্তম লংমার্চ এবং ঐতিহাসিক ‘ঢাকা অবরোধ’ সহ দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলায় ‘শানে রিসালাত’ নামে করা সফল সম্মেলনগুলোতে লাখো জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঈমানি চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠিত হয় ৫ মে। সেই থেকে হেফাজত নন্দিত । যার ফলে গত ৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আলেমদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছেন ‘ধর্ম অবমাননাকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’। এটাই কি আজকের হেফাজতের সফলতা? কি মনে করছেন হেফাজতের নেতারা? হেফাজত কী মনে করছে যে, তারা নাস্তিক্যবাদকে রুখে দিতে পেরেছে? বিষয়টি নিয়ে কথা হয় দুই শীর্ষ হেফাজত নেতার সঙ্গে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরীর অন্যতম নেতা ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ একাংশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া মনে করেন নাস্তিক্যবাদ প্রতিরোধে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ অনেকাংশেই সফল। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলাম তখনই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল যখন ইসলাম, মুসলমান ও নবী কারীম (সা.) এর শানে কটূক্তি শুরু হয়েছিল। এগুলো হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারও বাধ্য হয়েছে কিছু লোককে গ্রেফতার করতে। নাস্তিক ব্লগারদেরও ঔদ্ধত্য বন্ধ হয়েছে। এদিকে দিয়ে হেফাজত সফল। সেইসঙ্গে পাঠ্যপুস্তক থেকে আপত্তিকর বিষয়গুলো ও থেমিস দেবির মূর্তি সরাতেও সরকার বাধ্য হয়েছে। এগুলো হেফাজতের সফলতা। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ইসলামের নামে প্রকাশ্যে কটূক্তি করা বন্ধ হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসলামি ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন মনে করেন হেফাজতের আন্দোলনের ফলে নাস্তিক্যবাদরে প্রবণতা না কমলেও নাস্তিক্যবাদের জোয়ার ও আস্ফালন কমেছে। তাদের এগ্রেসিভ মনোভাব ও ইসলামের বিষয় নিয়ে অপপ্রচার, এগুলো কমেছে। এসব ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলাম অনেক সফল। এ আন্দোলনের পর ওলামাদের কদর বেড়েছে। এখন ওলামাদের এ কদরকে সযত্নে আগলে রাখতে হবে। এ কদরকে অযত্নে ফেলে দেওয়া বা নানা জায়গায় ব্যবহার করার ঠিক হবে না। ইসলামের কল্যাণেই ব্যবহার করতে হবে।

সোহরাওয়াদী উদ্যানে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় যে সাইবার ও ডিজিটাল আইন করা হয়েছে তা কী যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন? মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, এটা যথেষ্ট নয়। তবে যতোটুই করা হয়েছে এর ভিত্তিতে সরকারের তদারকি ও চিহ্নিত করা প্রয়োজন কারা আমাদের ধর্ম ও নবী (সা.) এর বিরুদ্ধে কটূক্তি ও প্রোপাগান্ডা চালায়। আইনটি করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া ও সুনির্দিষ্ট আইন করা।

নাস্তিকদের কৌশল ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় যথাযথ আইন প্রণোয়ন করা উচিত বলে মনে করছেন মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাযি । তিনি বলেন, সরকার তো আমাদের দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কোনো আইনের পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করেনি। যে ডিজিটাল আইন করা হয়েছে এতে তারা কীভাবে ধরপাকড় হবে, তাদের শাস্তি কী হবে বা কতো দিনের হবে এব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এসব বিষয়ে হেফাজতেক সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ের সরকারের বক্তব্যেও মনে হয়েছে তাদের বক্তব্যগুলো হেফাজতের বক্তব্যের অনুকূলে। তাহলে আইন করতে সমস্যা কোথায়? সে ক্ষেত্রে হেফাজতকে সরকারের সঙ্গে বসা ও আন্দোলন অব্যাহত রাখা উচিত।

দেশের বাহির থেকেও যারা নাস্তিক্যবাদরে প্রচারণা চালাচ্ছে তাদেরকে আইন করে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাযি। তিনি বলেন, এর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি নির্ভর করছে। আগে বাংলাদেশে সুস্পষ্ট কোনো আইন থাকতে হবে। তাহলে বিদেশে বসে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যাবে।

হেফাজতও কি কৌশল পাল্টিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউব ব্যবহার করে তাদের অপপ্রচারের জবাব দেওয়ায় উদ্যোগ নিতে পারে না? এ বিষয়ে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাযি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া কোনো কার্যকর কোনো বিষয় নয়। এতে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে কেউ যদি সরাসরি বিতর্কে আসতে চায় এ ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেরা প্রস্তুত রয়েছে। এরা তো বিচ্ছিন্ন ও বিকৃত মস্তিকের জাতি। বিতর্ক করে এদের ফিরিয়ে আনাও কঠিন। তারা সেভাবে বিতর্কে আসবেও না। নাস্তিকদের সঙ্গে আমাদের আকাবিররাও বিতর্ক করেছেন। এরা তো ফেরাকে বাতেলা। এদের সঙ্গে বিতর্ক করার জন্য আমাদের আকাবিরদের বইপুস্তক ও কলাকৌশল শিখানো হয়ে থাকে। এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এরা যে দিক থেকে বিতর্কে আসে সেদিক থেকে আমাদের উপস্থিতি কম। ওরা ওদের মতো করে বিতর্ক করে লোকদের বিভ্রান্ত করে। আড়ালে থেকে তো বিতর্কের অবসান হয় না। আমরা যে মৌলিক শিক্ষায় তরুণদের গড়ে তুলছি তারাই এসবের জন্য যথেষ্ট। এর জন্য হেফাজতের আলাদা উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি না। অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে যতোটুকু পারছেন করে যাচ্ছেন।

এ আন্দোলনের ফলে যে নাস্তিকরা তাদের কৌশল পালটে অন্য কোনভাবে কাজ করছে কিনা, এ বিষয়ে মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, এখন যদি তারা কৌশল পাল্টিয়ে থাকে আমাদের কৌশল পাল্টাতে হবে। তবে কৌশল পাল্টানের বিষয়গুলো হয়তো হেফাজতের নেতৃবৃন্দের নজরে আসেনি। বিষয়গুলো তাদের নজরে আসলে হয়তো তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আমাদের তরুণ আলেম উলামাদের এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত।