লঞ্চ ভ্রমণ, ভয় ও রোমাঞ্চের হাতছানি

কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ 

ভ্রমণ একদিকে যেমন ক্লান্তিকর, তেমনি আনন্দেরও বটে। হাদিস শরীফে ভ্রমণের ক্লান্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ভ্রমণ জাহান্নামের একটি অংশ। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার সময়ের ভ্রমণের সঙ্গে সভ্যতার সেই আদি যুগের ভ্রমণকে এক কল্পনা করার কোন অবকাশ নেই। তবু আমাদের বর্তমান সময়ের ভ্রমণও যথেষ্ট ক্লান্তিকর। আমাদের দেশীয় যোগাযোগব্যবস্থায় তা হয়ে ওঠে আরো বেশী ভোগান্তির।

তবে একেবারেই ক্লান্তিহীন ও আয়েশী ভ্রমন হচ্ছে লঞ্চভ্রমণ। ঢাকা থেকে বরিশাল ও চাঁদপুর লঞ্চরুট হল দেশের সবচে বিখ্যাত রুট। লঞ্চ ভ্রমণ নিয়ে কিছু রোমাঞ্চকর স্মৃতি জমে আছে।স্মৃতিগুলি অবসরে শিহরণ জাগায়। একবার হুট করেই সিদ্ধান্ত হল চাঁদপুর যাওয়ার। শুধু চাঁদপুর যাওয়াই। আর কিছু না। সারারাত লঞ্চে থাকব। ভোর রাতের দিকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে নেমে সকাল হওয়া দেখব। তারপর সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে সকাল আটটার লঞ্চে আবার ঢাকায় ফিরব।

ভাবনামত সন্ধ্যার পরপরই সদরঘাট চলে এলাম। এখানে এসে শুনি লঞ্চ ছাড়বে রাত সাড় দশটায়। আরেকটা সোয়া এগারটায়। তবে সোয়া এগারটার লঞ্চটি দ্রুতগামী। এটা গন্তব্যে আগে পৌছবে। আমাদের যেহেতু কেবল রাতটা লঞ্চে কাটানোর প্ল্যান। তাই সাড়ে দশটার লঞ্চে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত হলো। তেমন কোন আয়োজন নেই। সঙ্গে ব্যাগপত্রও নেই। মানুষ আমরা কেবল দুজন। অনেকক্ষণ সদরঘাটে ঘুরেফিরে টং দোকানে চা খেয়ে সময় কাটল।

আকাশ মেঘলা। দুই একবার বিজলিও চমকাল। বৃষ্টি হতে পারে, কিংবা ঝড়ও। বৃদ্ধমত একজন বলল, বৃষ্টি দুয়েকফোটা হলেও ঝড় হবে না। কারণ বাতাস আছে বেশ, মেঘ উড়িয়ে নিয়ে যাবে। মুরুব্বীর কথায় ভরসা পেয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে উঠলাম। চাঁদপুরগামী দৈত্যের মত বিশাল লঞ্চ গল্পের অজগরের মত শরীর নাড়িয়ে আস্তে আস্তে সদরঘাটের জেটি ছেড়ে বের হয়ে গেল। আমরা তুমুল উৎসাহে পুরো লঞ্চ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। লঞ্চের প্রথম এবং দ্বিতীয়তলা হল, সাধারণ যাত্রীদের জন্য। এখানে হৈ চৈ লেগেই আছে। টিভিতে খুব সাধারণ মানের সিনেমা চালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে নাচ-গান হচ্ছে। দাঁড়ানো কষ্টকর। এই বিষয়টা খারাপ লাগল। এমন নদীপথের যাত্রা, যেকোন সময়ই ঘটে যেতে ভয়াবহ দূর্ঘটনা, যাত্রীদের উচিৎ আল্লাহর নাম মুখে নিয়ে চলা, সেখানে এমন নাচ-গান চালিয়ে রাখাটা কেমন বাধো বাধো ঠেকে।

তৃতীয় তলায় কেবিন। এবং জায়গাটা অন্ধকার করে রাখা। সম্ভবত যাত্রীদের ঘুমের সুবিধার্থেই। আমরা শেষমেশ ছাদে গিয়ে বসে রইলাম। একটু একটু করে এই যান্ত্রিক রাজধানী শহরটি দূরে সরে যাচ্ছে, এই দৃশ্যগুলি আমাদের বেশ ভালো লাগতে থাকে। রাত দেড়টার মত বেজে গেছে। আমরা ঘুরেফিরে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি। এখন ছাদের রেলিং ধরে চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ ঝড়ের আভাস দেখা গেল। আকাশ থেকে তারাগুলি মুছে যেতে থাকল। বিজলীও চমকাল ঘন ঘন। আমাদের মনে ভয় ঢুকে গেল। যদি সত্যি সত্যি ঝড় হয়! বাতাসে লঞ্চ উলটে যায়!

একটু গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। মুহুর্তেই ছাদ খালি হয়ে গেল। আমরাও দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চেষ্টা করলাম। নিচতলায় এসে দেখি যারা কাথাবালিশ বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তারা কাঁথাবালিশ তুলে ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে আছেন। লঞ্চ ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাঁত হয়ে যাচ্ছে বারবার। আমরা আসন্ন বিপদমুক্তির জন্য দুয়া ইউনুস পড়তে লাগলাম। নদীর ঢেউ এত বেড়ে গেল যে, এক ধাক্কায় লঞ্চের ডেকে অনেকগুলি পানি উঠে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল। এবার আমরা আতংকে জমে গেলাম। তবে যারা নিয়মিত যাত্রী কাঁথাবালিশ তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারা সেভাবেই দাড়িয়েই থাকলেন। কেউ কেউ আলস্যে হাই তুললেন। যেন মাঝরাতে নদী উত্তাল হবে, লঞ্চের ডেকে পানি ঢুকে যাবে এটাই নিয়ম।

অবশেষে ঝড় থামল। বিশ মিনিটের মত স্থায়ী হয়েছিল। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে গেল। আমরা আবার ছাদে এসে ভেজা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশিষ্ট পথ যেতে যেতে একটা ভাবনা মাথায় এলো, আমরা কখনই কোন বিপর্যয় কিংবা খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চাই না। কিন্তু কুদরত আমাদের জীবন নানা অভিজ্ঞতায় জিইয়ে রাখেন। আজকের ঘটনাটার কথা ধরা যাক, যতক্ষণ ঝড় হচ্ছিল, নদী জুড়ে উত্তাল ঢেউ ছিল ততক্ষণ আমি একদৃষ্টে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। লঞ্চের ডেকে পানি ঢুকে যাওয়ার সময়ও চোখ ফেরাতে পারিনি। আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যের মুখোমুখি হয়েও আমি এক দৃষ্টে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারব না। এই বিস্ময়, এই মুগ্ধতা কিসের? কুদরতের অপার শক্তি ও সৌন্দর্যের?

আগের সংবাদজেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা শুরু ১ নভেম্বর
পরবর্তি সংবাদবিদেশি ইমাম ও মুয়াজ্জিন অপসারণের সিদ্ধান্ত সৌদির