পরিস্থিতিই আলেমসমাজকে অন্যদিকে চোখ ফেরাতে দিচ্ছে না

ওমর ফারুক :

বড় রকমের সঙ্কটে আটকে আছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজ। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিবাদ মেটাতেই তাদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। উগ্র সালাফিদের অপপ্রচার তো ছিলই, এখন এর সাথে যোগ হয়েছে তাবলীগ জামাতের সঙ্কট। জাতির কর্ণধার আলেমদের এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় দিতে হচ্ছে। এটা জরুরীও বটে। তবে এসব ক্ষেত্রে  বড় সময় চলে যাওয়ায় তারা তাদের মৌলিক কাজ অর্থাৎ ধর্মীয় প্রচার, গবেষণা ও ইসলাম বিরোধীদের প্রতিরোধে যথাযথ সময় দিতে পারছেন না। একে অশুভ সংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞ আলেমরা।

‘ মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে দেখা গেছে, আলেমরা যখন অভ্যন্তরীণ বিবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন বাহিরের শত্রুরা অরক্ষিত অবস্থার সুযোগে আক্রমণ করে বসে। তাতে অনেক সময় মারত্মক বিপর্যয় ঘটে যায়।’ তারা বলছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রবীণ আলেম বলেন, ওলামায়ে কেরাম ও দাঈদের মূল কাজ হচ্ছে ইসলামের প্রচার  ও ইসলাম বিদ্বেষী শক্তির মোকাবেলা করে মানুষের ঈমান আকিদা রক্ষা করা। তাদের মূল প্রতিপক্ষ হচ্ছে তারাই যারা সরাসরি ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করে। যেমন কাদিয়ানী, ইসলামবিদ্বেষী মিশনারী, নাস্তিক শক্তি ও অনৈতিকতায় জড়িত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলেমরা এসব হুমকি মোকাবেলায় বুদ্ধিভিত্তিক কাজ ও সক্রিয়তা থেকে সরে যাচ্ছেন বা সময় কম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সর্বশেষ তাবলীগের একাংশের আমীর মাওলানা সাদ আকিদা, মাসায়েল ও দৃষ্টিভঙ্গিগত বিচ্যুতি ও জোরপূর্বক নেতৃত্ব দখলের সাথে জড়িয়ে গেছেন। এখানেও আলেমদের দিতে হচ্ছে একটা বড় সময়। 

এর ফলে আলেমরা অন্য সব সঙ্কটের দিকে মনোযোগ দিতে পারছেন না। আঞ্চলিক সঙ্কট আরও বিস্তারিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট তো ছিলই, এখন এর সাথে যোগ হয়েছে আসাম। ভারত সরকার আসামের কয়েক মিলিয়ন মুসলমানকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছে। এসব সমাধানে রাজনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ও গবেষণায়  মনোযোগ দেওয়া দরকার। আলেমরাও সেটা জানেন। তবে অভ্যন্তরীণ বিবাদ মীমাংসা ছাড়া এসব দিকে মনোযোগ দেওয়া তো কঠিন।

অপরদিকে উগ্র সালাফিদের প্রতিক্রিয়াশীলতাও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। উগ্র সালাফিদের হানাফি মাযহাবের ওপর আক্রমন; হানাফি মাযহাব অনুসরণ বেদআত ও ইমাম আবু হানীফা রাহঃ কে বিচ্যুত আখ্যা দেওয়ায় জটিলতা বাড়ছে। তারা বলছেন, তার ফেকাহ গলদ, হানাফি মাযহাবের আকিদা শিরকি আকিদা, দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম শিরকের ওপর আছেন। এসব অপপ্রচার আগে ছিল না। গত ১০-১৫ বছর যাবত এসব শুরু হয়েছে। এসব বলে তারা ধর্মীয় গবেষণা ও প্রচারের পরিবেশকে নষ্ট করে ফেলেছেন। এটাও একটা বড় সঙ্কট।অথচ সালাফি ও দেওবন্দী উভয়েরই  ইসলামের দাঈ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা এখন নিজেদের বিশ্বাস, আকিদা প্রমাণ করতেই  তাদের মেধার বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলছেন। উগ্র সালাফিদের প্রতিক্রিয়ার জবাব দিতে বাধ্য হচ্ছেন দেওবন্দি আলেমরা। অথচ তাদের সকলেরই ঐক্যের সঙ্গে ইসলাম বিদ্বেষী চক্রের প্রতিরোধে সময় দেওয়ার কথা ছিল।


ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, অতিরিক্ত গৃহবিবাদ মুসলিম সভ্যতার পতন যুগেরই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তাতারি বিপর্যয়ের ইতিহাস ঘাটলে এ ধরণের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে। বৃটিশরা যে সময়ে ভারতবর্ষ দখল করে, সে সময়েও এ ধরণের আলামত বর্তমান ছিল। ইসলামি সালতানাতের গা ছাড়া ভাব ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ তাদের পতন ডেকে এনেছিল।

এসব সঙ্কট মোকাবেলা ও এর থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামি চিন্তাবিদরা বেশ কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, যদি ইসলামের মূল শক্তি; ওলামায়ে কেরাম ও দাঈ সমাজ ইসলামের মৌলিক কাজগুলো একসঙ্গে করা শুরু করেন, এটাই সবচেয়ে কল্যাণকর হবে। অভ্যন্তরীণ ভ্রান্তিকে তো  ভ্রান্তি বলতেই হবে। তবে এসবের পেছনে একযোগে লেগে থাকলে সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম সমাজের পতনের সূত্রপাত ঘটতে থাকে এই অভ্যন্তরীণ বিবাদে।এজন্য যতবেশি মানুষ ইসলামের মৌলিক কাজে সময় ব্যয় করবেন ততো উপকার, ততো ফায়দা। আর এ ধরণের অভ্যন্তরীণ কোন্দলগুলোতে যত কম সময় ব্যয় করা যায়, ততো ভালো। তবে এ ধরণের পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যই বটে।

তারপরও মৌলিক কাজগুলোর ব্যাপারে সকলের ঐকবদ্ধ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।  সাংস্কৃতিক  ও নাস্তিক্যবাদি আগ্রাসন মোকাবেলা ও মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে আলেম ওলামাদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনা অতি প্রয়োজন। আলেমদের মানবিক শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা পালন, জুলুম নির্যাতনের বিরোধিতা, দুর্নীতির প্রতিরোধ ও মানুষের নৈতিক মান উন্নয়ন, মাদকের প্রসার রোধ ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে আলেমদের।

তারা মনে করছেন, আলেম ওলামাদের এ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো বিবাদ আরও উস্কে দিচ্ছে। এসব বিষয়ে আলেমদের সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত গত কয়েকদিন ধরে ইসলামী বিরোধী মিডিয়াগুলো টানা তাবলীগ ইস্যুতে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এতে বুঝা যায়, তারা আলেমদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ বাড়াতে অত্যন্ত আগ্রহী।