হুমায়ূন আহমেদ : এক মিথ্যেবাদী রাখালের গল্প

কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ 

গল্পকার বলতেই আমার চোখে এক মিথ্যেবাদী রাখালের ছবি ভাসে। যে মানুষকে গল্পে ভুলিয়ে রাখে। তার গল্পে সত্য মিথ্যার মাঝামাঝি এক অন্যরকম ধোঁয়াশা তৈরী হয়। আমাদের দেশেও এমন এক গল্প বলার রাখাল জন্মেছিলেন। ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮ এর সন্ধ্যায়।

বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। মা সাধারণ বাঙালী গৃহিণী। বাবার পোস্টিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শৈশবও ঘুরে বেড়িয়েছে দেশের নানা জায়গায়। মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা শহীদ হলেন। তিনি পড়ে গেলেন বাংলাদেশের এক বিপন্ন সময়ের মুখে। উনিশশো একাত্তর সাল কেটে যায় জীবন ও পরিবারের ভয়ে পলাতক।

স্বাধীনতার আগে বাবা বেঁচে থাকতেই লেখালেখি শুরু করেছিলেন। লেখা প্রকাশ পায় স্বাধীনতার পরে। ১৯৭২ এর সালে তার প্রকাশিত প্রথম এবং লিখিত দ্বিতীয় উপন্যাস ” নন্দিত নরকে ” প্রকাশিত হয়।

হুমায়ূন আহমেদের একেকটি দিন ছিল বাংলা সাহিত্যের একেকটা নতুন গল্পের বাঁক। তিনি একটি জনাকীর্ণ রাস্তায় হেটে গেছেন, সেও এক গল্প। বন্ধুর বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়েছেন সেও এক গল্প। তার গল্প আমাদেরই বাংলাদেশের গল্প। ঢাকার কোনো এক তস্য গলিতে মেসের খাটে শুয়ে থাকা ভবঘুরে যুবকের গল্প। কিংবা রাজকীয় প্রাসাদের বারান্দায় কফির মগ হাতে দোলনায় দুলতে থাকা রাজকন্যার গল্প।

তার গল্পের একটা পুরোধা অংশে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজ। সাধারণ চাকুরিজীবি পিতা। পরিবারের দুঃখ- কষ্ট, সুখ- আহলাদ, পিতার সীমিত সাধ্য ও প্রেম- ভালবাসার বহুবিধ টানাপোড়ন। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের জীবনকে দেখেছেন ওপর থেকে। অনেকটা খোদা তাআলার মত। ( এটা রুপক অর্থে বলা হয়েছে। ) আমরা জীবনের ভেতর খেই হারিয়ে ফেলছি বারবার। আবার কোনো অযাচিত সুখ আমাদের ভাসিয়ে দিচ্ছে। এসব গল্প যখন তার লেখার ছত্রে পেয়েছি, তখন নিজেরই জীবনের প্রতিবিম্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা হতবাক হয়ে গেছি।

এই জীবনে তিনি লিখেছেন উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন অল্প কিছু কবিতা আর গান। কিছু ইতিহাস আশ্রিত সফল উপন্যাসও লিখেছেন। সফল লেখকের আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি এসেছিলেন সিনেমার জগতে। সাফল্যের সঙ্গে নির্মাণ করে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছু প্রথমশ্রেনীর সিনেমা। তিনি ছিলেন বাংলাভাষার অতীতকালের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় লেখক। তার সময়ে কিংবা তার আগে পরেও তার সমান জনপ্রিয় কাউকে দেখা যায় না।

তার সঙ্গে তুলনা করা যায় বাংলা সাহিত্যের কেবল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেই। তবু শরৎ আজ জাদুঘরের ফসিল হতে চলেছেন। মৃত্যুর পর হুমায়ূন হয়ে উঠছেন আরো মুল্যবান। একসময় তাকে নিয়ে কেবল পক্ষপাতের রাজনীতিই চলেছে। একপক্ষ তাকে সস্তা বাজারী বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। অপরপক্ষ সব ছেড়ে কেবল তাকেই আঁকড়ে ধরেছেন। এই দুই প্রান্তিক মতের বাইরে অধুনা তাকে নিয়ে ভাবতে হচ্ছে আসলেই হুমায়ূন এই প্রান্তিকতার বলি হবেন কিনা!

খোলা চোখে দেখলে পরিস্কার হয়ে যায়, বাংলাভাষার এই রাজপুত্র যতখানি মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন, কিংবা যতটা সক্ষমতা তিনি দেখাতে পেরেছেন তা দিয়ে তিনিও খুব গাম্ভীর্যপূর্ণ লেখক হতে পারতেন। এটা তার জন্য অসম্ভব ছিল না। তবু কেন সারাজীবন একরকম খেলো বাতাবরণ ছড়িয়ে গেলেন, সে এক রহস্য! তার এই একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিটাই বাংলা সাহিত্যের ক্ল্যাসিক স্টাইল হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে কিনা, এজন্য ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

এক জীবনে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন প্রচুর। জীবনের শেষ লগ্নে এসে সমালোচিত হয়েছেন সংসার, দ্বিতীয় বিবাহ ইত্যাদির কারণে। আমাদের বাংলাদেশের অনভ্যস্ত সমাজ খুব সহজে তার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি।

হিমু মিসির আলীর এই দুই বিপরীতমুখী রহস্যের জগত সৃষ্টির পিতা নিজেও সারাজীবন ধর্ম অধর্মের দ্বন্দ্বে দুলেছেন। নিজেকে কেবলই আড়াল করে গেছেন। এলেবেলের মত বিতর্কিত বই লিখেছেন। বলেছেন মৃত্যুর পরে মাটি হয়ে যাব, আবার তিনিই কেঁদে উঠেছেন করুণ আঁকুতির সুরে, রে যাদুধন! আমার মুখে কলমা তুলে দিও ” হিসেব নিকেশ শেষ হয়েছে একদিন। রাখালের গল্প বলা সাঙ্গ হয়। বাঘের মত মৃত্যু থাবা মেলে ছুটে আসে। ২০১২ সালের এইদিনে  হাসপাতালের বদ্ধ কামরায় শুয়ে মারা যান। চান্নি পসর রাত দেখা হয়নি রাখালের। আমরা তার মঙ্গল কামনা করি।

আগের সংবাদনিজ বাসভবনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত তালেবান নেতা মাওলানা সামিউল হক
পরবর্তি সংবাদশোকরানা মাহফিল : কওমি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া