নতুন মজুরি কাঠামোতে সন্তুষ্ট নন পোশাক শ্রমিকরা : স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি

ফাতেহ ডেস্ক

নতুন মজুরি কাঠামোতে সন্তুষ্ট নন পোশাক শ্রমিকরা। মজুরি সমন্বয়ের পরও স্বাভাবিক হয়নি তৈরি পোশাক শিল্পের পরিস্থিতি। গতকালও বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। আশুলিয়ায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এদিন কর্মবিরতি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুধু আশুলিয়া এলাকায় প্রায় অর্ধশত কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকে।

গত বছরের নভেম্বরে পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হলে তাতে অসংগতির অভিযোগ তোলেন তারা। বিষয়টি নিয়ে ডিসেম্বর থেকেই বিক্ষুব্ধ অবস্থানে রয়েছেন শ্রমিকরা। চলমান এ শ্রম অসন্তোষ নিরসনে ছয় গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি সংশোধনের ঘোষণা দেয়া হয় রোববার। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং পোশাক শিল্পের মালিক প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর এ সংশোধিত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে শ্রম মন্ত্রণালয়। এতে গ্রেডভেদে মূল মজুরি বাড়ানো হয় ১০ থেকে ৫২৪ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে মোট মজুরি বৃদ্ধি পায় ১৫ থেকে ৭৮৬ টাকা।

মজুরি কাঠামোয় সংশোধনের ঘোষণা দেয়া হলেও থামেনি শ্রমিক অসন্তোষ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ঢাকার অভ্যন্তরে কোনো কারখানায় শ্রম অসন্তোষ দেখা না গেলেও অসন্তোষ ছিল আশুলিয়ায়। আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় প্রায় অর্ধশত কারখানা গতকাল শ্রম অসন্তোষের জেরে বন্ধ ছিল। আবার কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর চালু হয় সাতটি কারখানা। এছাড়া গতকাল পর্যন্ত ১৩-এর ১ ধারায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩।

ডিআইএফই জানায়, গতকাল মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রম অসন্তোষ দেখা দেয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ছিল সাফা সোয়েটার, ডেকো ডিজাইনার, ডং লিয়ন ফ্যাশন, মাহমুদ ফ্যাশন, একেএফ ক্লদিং, স্টারলিং ক্রিয়েশন, এনভয়, ইয়াগি, সেতারা গার্মেন্টস লিমিটেড, অনন্ত, আজমাত, হা-মীম, মেট্রো নিটিং, মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডায়িং, নাবা নিটওয়্যার, ওইপি অ্যাপারেল, ফাউন্টেন গার্মেন্টস, গাউসিয়া টেক্সটাইল, পলমল, জিজে ক্যাপ, হাসিম, ইথিক্যাল, বডিস, হলিউড, রুমন, স্টারলিং ডিজাইন, এমট্রানেট, বান্দো ইকো অ্যাপারেলস লিমিটেড। এসব কারখানার শ্রমিকরা গতকাল কাজ বন্ধ করে দেন।

গতকাল চালু হওয়া সাতটি কারখানা হলো অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেড, নিউ এজ, জেনারেশন নেক্সট, সিগমা ফ্যাশন, রেজা ফ্যাশন, মাহমুদ ফ্যাশন ও নাসা গ্রুপ।

শিল্প পুলিশ জানায়, আশুলিয়ায় গতকাল মোট ৩৪টি কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এছাড়া শ্রম অসন্তোষের কারণে এ এলাকায় আগে থেকেই বন্ধ ছিল ১৮টি কারখানা। সব মিলিয়ে ৫২টি কারখানায় গতকাল কোনো কাজ হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আশুলিয়ায় গতকাল শিল্প পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, আশুলিয়ায় গতকালের শ্রম অসন্তোষের সূত্রপাত হয় হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানায়। এটিসহ আরো কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা হাজিরা দিয়েই রাস্তায় নেমে আসেন।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পরিদর্শক মাহমুদুর রহমান জানান, সকালে আশুলিয়ায় অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দেন। কিন্তু ৯টার দিকে জামগড়া, নরসিংহপুর ও বেরন এলাকায় হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, এনভয় ও উইনডিসহ প্রায় ১০টি কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এসব কারখানা কর্তৃপক্ষ একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

আশুলিয়ায় গতকালও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিকালে বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এ এলাকার বেশ কয়েকজন কারখানা মালিক। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আজ পোশাক খাতের শ্রম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আগের ঘোষণা অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গতকাল বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, বৈঠকে আগামীকাল (মঙ্গলবার) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় না ফিরলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একই কথা বলেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানও। তিনি বলেন, আমরা আগামীকাল (আজ) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখব। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। আশা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।

শিল্প পুলিশ গাজীপুর সূত্র জানিয়েছে, গতকাল খুব বেশি কারখানায় শ্রম অসন্তোষ দেখা দেয়নি। মূলত সমস্যা দেখা দেয় দুটি কারখানায়। একটির নাম রিয়াজ গার্মেন্টস, অন্যটি সেফ ফ্যাশন কারখানা। রিয়াজের কর্মীরা সংশোধিত মজুরি কাঠামো না মেনে কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। আর সেফ ফ্যাশনের কর্মীরা রাস্তায় নেমে আসেন। এ কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করে। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছত্রভঙ্গ করে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয় শ্রমিকদের। গাজীপুরের মোট আটটি কারখানা গতকাল অসন্তোষের দরুন বন্ধ করে দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিকরা সংশোধিত মজুরি কাঠামো নিয়ে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন গাজীপুরে কর্মরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। সকাল ৮টার দিকে শুরু হলে ১ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায় গাজীপুর এলাকায়। ১৩-এর ১ ধারায় বন্ধ হওয়া কারখানা গাজীপুর এলাকায় আছে দুটি।

শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক আবদুস সালাম বলেন, (সোমবার) পোশাক খাতের অধিকাংশ কারখানা চালু ছিল। ৩০-৩৫টি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেননি। এছাড়া বড় কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। আশা করছি পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এইচআর