নামসর্বস্ব দলের ছড়াছড়ি, নির্বাচনে কি গুরুত্ব কমছে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি দলগুলোর?

ওমর ফারুক

বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ইতিহাস নতুন নয়। এদেশে ইসলামি রাজনীতির ঐতিহ্য ও সাফল্যের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। তবে হাল আমলে ব্যাঙের ছাতার মতো দেশে গজিয়ে উঠছে নানা ইসলামি রাজনৈতিক দল। যাদের নামসর্বস্ব ব্যানার ছাড়া আর তেমন কোনো কার্যক্রমই নেই।

দেশে প্রায় নিবন্ধিত ইসলামি রাজনৈতিক দল রয়েছে প্রায় ১২ টি। অথচ ইসলামি রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় শ’খানিকের বেশি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এসব রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগই ভুঁইফোড় সংগঠন। তাদের নেই কোনো কার্যালয়ও। নির্বাচন এলেই এসব দলের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে ফায়দা লুটতে চায় এসব রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে দেশে যখন রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করে বা একতরফা নির্বাচন পরিচালনা করা হয় তখন এসব রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বৃহৎ দলগুলো জোটের প্রতিযোগিতায় এদের গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

নিবন্ধন না থাকলেও অতীতে এ ধরনের রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের স্বার্থে ব্যবহার করার নজির রয়েছে। এসব দলের নেতাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় বা জনগণের কাছে কোন রাজনৈতিক আবেদন না থাকলেও বড় বড় পোস্টারে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি থাকে ঠিকই। রাজনৈতিক ফতোয়া দিতেও বড় দলগুলো এসব দলগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। সম্প্রতি আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। তবে এ দলগুলোর কারণে ঐহিত্যবাহী ও নিবন্ধিত ইসলামি দলগুলোর গুরুত্ব বড় দলগুলোর কাছে না কমলেও সামাজিকভাবে ইসলামি দলগুলোর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, ‘এসব কারণে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি দলগুলোর ভাবমূর্তি কিংবা অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। কারণ প্রতিটি দলেরই আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়া নিবন্ধিত আর অনিবন্ধিত দলের গুরুত্ব তো আর এক হতে পারে না। ফলে প্রত্যেকের অবস্থান ও গুরুত্ব ভিন্ন।’

তবে গুরুত্ব না কমলেও এতে করে ইসলামি দলগুলো ভোটারদের কাছে নিজেদের আস্থা ও অবস্থান হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামার মহাসচিব মাওলানা আব্দুর রহীম। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এখন এক ধরণের ট্রেডিশনে পরিণত হয়ে গেছে। কয়েকজন কর্মী নিয়েই অনেকে দল গঠন করে ফেলছেন। বাংলাদেশে এমন সুযোগ রয়েছে বিধায় বিষয়টি সহজে হয়ে যাচ্ছে। ইসলামি দল ছাড়াও অনেক দল এমন রয়েছে যারা দু’একজন লোক নিয়েই সংগঠন পরিচালনা করে। তারা নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে। এ সুযোগ এ দেশে একরকম স্বীকৃতি হয়ে গেছে। ফলে ইসলামি নেতারাও এ সুযোগ পাচ্ছে। তবে ইসলামি ব্যক্তিদের এসব থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে এসব দলগুলো তাদের সামাজিক অবস্থান হারাচ্ছে। যদিও বিষয়টি নির্বাচনে কোনো ধরণের প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা নেই।’

নামসর্বস্ব ইসলামি দলগুলোর চিত্র কী বা কারা এসব দলের নেতা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজ মহল ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে বা ইসলামি অঙ্গনেও তাদের কোনো তেমন কোন পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। কোনো জোটের সঙ্গে শরীক হওয়ার কারণে হয়তো এই দলগুলোর নাম পত্রিকায় উঠে আসে। তবে এসব দলের নামই শুধু জানা যায়, দলের প্রধান ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়াটাও দুস্কর। গত বছর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল সম্মিলিত জাতীয় জোট। এই জোটে দলের সংখ্যা ৫৮। ৫৮ টি দলের অধিকাংশই ইসলামি ও সমমনা দল। ইসলামি ঐক্যজোট একাংশের চেয়ারম্যান মাওলানা মিছবাহুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫টি নাম সর্বস্ব দল নিয়ে ‘ইসলামী গণতান্ত্রিক জোট’ গঠিত হয়েছে। এছাড়া মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামি নেতৃত্বাধীন ইসলামি ঐক্যজোটেও আটটি ইসলামি রাজনৈতিক দল রয়েছে। এসব জোটের আবার কোনটা আওয়ামীপন্থী, কোনটা বিএনপিপন্থী।

এরশাদ নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় মহাজোটের শরিক ইসলামি দলগুলোর মাঝে রয়েছে, ইসলামি ডেমোক্রেটিক পার্টি, ইউনাইটেড মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ ইসলামিক গণতান্ত্রিক লীগ, জাতীয় ইসলামী জোট, ওলামা মাশায়েখ সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ মানবাধিকার আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফেডারেশন, জমিয়তে মুসলেমিন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামিক লীগ, শরিয়া আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জনতা পার্টি, খেলাফত সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামিক জনকল্যাণ পার্টি, জাতীয় শরিয়া আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী গণআন্দোলন, জাতীয় ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় ইসলামিক মুভমেন্ট, ইসলামী মূল্যবোধ সংরক্ষণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, ন্যাপ ভাসানী পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী আক্বীদা সংরক্ষণ আন্দোলন, খেদমতে খালক পার্টি, বাংলাদেশ ইত্তেহাদুল মুসলেমিন, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট বই পার্টি, হেফাজতে মুসলেমিন বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত বাস্তবায়ন পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, মুসলিম জনতা পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফাতুল উম্মাহ, বাংলাদেশ আকিমুদ্বীন মজলিশ, ইসলামী আক্বীদা সংরক্ষণ পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী পার্টি, ইউনাইটেড ইসলামিক ফ্রন্ট, ইসলামী সমাজকল্যাণ আন্দোলন ও লিবারেল পার্টি বাংলাদেশ।

এদিকে মাওলানা মিছবাহুর রহমান নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ নামের এই জোটে নাম সর্বস্ব ও অনিবন্ধিত ১৪টি দল রয়েছে। জোটের অন্তর্ভুক্ত ১৫টি দল হলো—তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, গণতান্ত্রিক ইসলামিক মুভমেন্ট, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক ফোরাম, বাংলাদেশ গণকাফেলা, বাংলাদেশ জনসেবা আন্দোলন, বাংলাদেশ জমিয়তে দারুস সুন্নাহ, বাংলাদেশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী পেশাজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ মানবাধিকার আন্দোলন, ন্যাশনাল লেবার পার্টি ও ইসলামী ইউনিয়ন বাংলাদেশ।

নামসর্বস্ব হলেও এসব দল যে সময়ে সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে গত কয়েকটি নির্বাচনে এর প্রমাণ রয়েছে। বৃহৎ দুটি দলই নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের কাজে লাগায়। বিশেষ করে গত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে কয়েকটি অনিবন্ধিত ইসলামি দল স্থান পেয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে এসব দল কেন একটি জোটে পরিণত হতে পারছে না? কেনইবা তাদের মাঝে এতো বিভক্তি ও দল উপদল? নাকি ইসলামি নেতারা ঐক্য চান না?

এসব প্রশ্নে নেতারা বলেন, অধিকাংশ ইসলামি রাজনৈতিক নেতাই মনে করেন, নিজেদের মাঝে ঐক্য প্রয়োজন এবং এটাই সময়ের দাবি। নিজেদের মাঝে অন্তত নির্বাচনকালীন ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে ইসলাম এ দেশে একটি বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হতো কোনো সন্দেহ নেই। সেইসঙ্গে তারা ঐক্যের জন্য আশাবাদী।

মাওলানা আব্দুর রহীম বলেন, ‘দেশের অন্যান্য দলগুলো আজ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে এক হয়েছে। অথচ সর্বাগ্রে প্রয়োজন ছিল আমাদের ইসলামি দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে এক ও অভিন্ন হয়ে নির্বাচন করা। তারা সম্মিলিত ফ্রন্ট তৈরি করলে নির্বাচনেও তাদের গুরুত্ব বেড়ে যেতো। এ দেশের ইসলাম ও মুসলমানদের জন্যও স্বার্থ রক্ষা হতো। বরং বিচ্ছিন্নভাবে জোট করার কারণে তারা নিগৃহীত হবে, সমাদৃত কখনো হবে না।’

জনাব আব্দুল জলিলও মনে করেন, সকল ইসলামি দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে ইসলামি শক্তির প্রভাব নির্বাচনে বেড়ে যেতো। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ইসলামি দলগুলোর এ দেশে যতোটা প্রভাব থাকার কথা ছিল তা নেই। এর কারণ অনৈক্য ও মতাদর্শের ভিন্নতা। এসব মতাদর্শ ঠিক রেখে এসব দল অন্তত নির্বাচনকেন্দ্রীক ঐক্যবদ্ধ থাকলেও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষা হতো। আমাদের সংহতি দেখাতে না পারাই আমাদের বড় ব্যর্থতা। তবে ইতিবাচক হচ্ছে, একটা সময় ইসলামি দলগুলো জনসভা ও ওয়াজ মাহফিল কেন্দ্রীক ছিল। বড় দলগুলো এসে তাদের কাছে দোয়া চাইতো। কিন্তু বর্তমানে তারা রাজনীতিতে রয়েছে। গত পার্লামেন্টের আগেও ইসলামি ঐক্যজোটের কয়েকজন এমপি নির্বাচিত হয়েছিল। এই যে ইসলামি নেতাদের সরাসরি এমপি হয়ে আসা এটা কিন্তু অগ্রগতি। বর্তমান নির্বাচনেও ইসলামি দলগুলোকে ঐক্যফ্রন্ট বা মহাজোট ফেলে দিচ্ছে না। তারাও রাজনৈতিক দল হিসেবে কাছে রাখার চেষ্টা করছে। এটাই অগ্রগতি।

আগের সংবাদনওয়াজের মোটা অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পাক তাবলীগের আমির হাজী ওয়াহ্হাব
পরবর্তি সংবাদসবচেয়ে বড় রামের মূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিল ভারত