ফিরে দেখা নব্বই দশক: উত্তাল সময়

ওয়ালিউল্লাহ আরমান

বাংলাদেশে এই সময়ে ইসলামী অঙ্গনে অস্থিরতা, অবিশ্বাস আর পারস্পরিক দূরত্ব সকল সীমা অতিক্রম করে গেছে৷ দলের ভেতর দ্বন্দ্ব, দল দলে অবিশ্বাস, জোটের নামে জট, খানকায়-মাসলাকে টানাপোড়েন, তাবলীগে অন্ধ এতায়াত আর ওজাহাতে বিভক্তির মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে৷

আজ থেকে তিনদশক আগে ইসলামী অঙ্গনের চিত্র কি এমনই ছিলো? তখনো কি কথায় কথায় বিভক্তি আর অনৈক্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো? তখনো কি সর্বত্র হতাশা আর দুঃস্বপ্ন বিরাজ করতো? তরুণ সমাজ তখনো কি উদ্ধত আর স্পষ্টবাদী ছিলো? কাজের তুলনায় তখনো কি বাগাড়ম্বরই বেশি ছিলো? নেতৃত্ব/কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব বলে কিছু ছিলো, নাকি সবাই নিষ্ঠা আর নিঃস্বার্থতার প্রতিভূ ছিলেন? অসহিষ্ণুতা আর অবিশ্বাস কি এমন ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো? এই প্রজন্মের যারা সদ্যই ম্যাচিউরড হলো কিংবা যারা এক/দেড়দশক আগে মাঠে-ময়দানে তৎপরতা শুরু করেছে, তারা তিনদশক আগের অবস্থা সম্পর্কে কতোটুকু ওয়াকেফহাল?

আমি ঠিক ৩২ বছর আগে শৈশবে প্রথম প্রত্যক্ষ করা রাজনৈতিক অস্থিরতার নেপথ্য কারণ থেকে আলোচনা শুরু করতে পারি৷ তবে এটাকে কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বলা যাবে না৷ আমি যা দেখেছি কিংবা সুনিশ্চিত জেনেছি, ততোটুকুই আলোচনা করবো৷ বেখেয়ালে কোনো কথা একপেশে হলে কিংবা বিভ্রান্তি তৈরি হলে, ইনশাআল্লাহ, অবশ্যই শুধরে নিবো৷

১৯৮৭ সালের কথা৷ মাত্রই গ্রাম থেকে এসে জামিয়া এমদাদিয়া ফরিদাবাদে ভর্তি হয়েছি৷ ওই বছর পবিত্র হজে ঝামেলা হয়৷ ইরানী হাজিরা মক্কায় বিক্ষোভ করে৷ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সৌদি সরকার শক্ত পদক্ষেপ নেয়৷ রক্তারক্তির পর বিশৃঙ্খলা দূর হয়৷ এর জের বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনকে স্পর্শ করে৷ আমি যে ঘরানায় বেড়ে উঠেছি সেই জমিয়ত এই ইস্যুতে পুনরায় সরব হয়ে ওঠে৷

এর কয়েকবছর আগে ইসলামী অঙ্গনের বিশাল মহীরুহ হজরত হাফেজ্জী হুজুরের (রহঃ) নেতৃত্বে কয়েকজন নেতৃস্থানীয়দের ইরান সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সম্মিলিত প্লাটফর্ম খেলাফত আন্দোলনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়, যা ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে পরিণামে পৌঁছে৷ এসনা আশারিয়া শিয়া ইস্যুতে কট্টর অবস্থান নিয়ে জমিয়ত খেলাফত আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যায়৷ ওদিকে সিংহভাগ ওলামায়ে কেরাম জমিয়তের বিপক্ষে অবস্থান নেয়৷ জমিয়তকে ‘কংগ্রেসি’ এবং ঐক্যবিরোধী অভিহিত করে একঘরে করার প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ অনেক জেলায় কিংবা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উভয় গ্রুপ তথা জমিয়ত এবং বিপরীতপক্ষের লোকজন থাকার কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্রেক হয়৷ ইত্যবসরে খোদায়ী মদদ হিসেবে হজরত মুহিউসসুন্নাহ আবরারুল হক (রহঃ) এর প্রভাবশালী খলীফা করাচির হজরত হাকীম আখতার (রহঃ) বাংলাদেশ সফরে এসে বলে যান, আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইসনা আশারিয়াভুক্ত৷ কুফরী আকীদা পোষণের কারণে তারা মুসলমান নয়৷ এরপর বিভেদের তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করে৷ শিয়াদের প্রতি উদারতা দেখানো বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ ক্ষান্ত হন৷ কওমী অঙ্গন অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পায়৷

এক বছরের ব্যবধানে পীরসাহেব চরমোনাই (রহঃ) এবং শায়খুল হাদীস (রহঃ)-এর নেতৃত্বে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস নামক পৃথক দুটি সংগঠন রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে৷

১৯৮৭ সালে হজে ইরানীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রতিবাদে জমিয়ত নেতৃবৃন্দ ঢাকায় ‘হুরমতে হারামাইন সম্মেলন’ করে৷ যেখানে অন্য ঘরানার নেতৃবৃন্দ আসেননি৷ তবে একে কেন্দ্র নতুন কোনো বিতর্ক অন্তত বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিকে গ্রাস করতে পারেনি৷

নিজ নিজ সংগঠনের ব্যানারে জমিয়ত, খেলাফত এবং ইশা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে থাকে৷ যদিও প্রকাশ্য বৈরিতা অনেকাংশে হ্রাস পেলেও খেলাফত আন্দোলন কেন্দ্রিক দূরত্ব তখনো পুরোপুরি মেটেনি৷ তবে এটা সত্যি যে, আস্তে আস্তে দূরত্বের জমাট বরফ গলতে থাকে৷

আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে কওমী অঙ্গনে তৎপর সংগঠনের মধ্যে জমিয়ত যেনো সবসময় একটা শক্ত অবস্থান নেয়, কিংবা নিজেদের অবস্থানকে হকের সবচে কাছাকাছি মনে করে৷ এমন মনোবৃত্তি অপরের সাথে দূরত্ব তৈরী করলেও জমিয়ত সে বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি৷ নজরিয়াতি বিষয়ে এমন কট্টরপন্থাকে অন্যরা একরোখা মনে করলেও এ বিষয়ে ২০০১-এর জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কোনোরূপ ছাড় দিতে দেখিনি জমিয়তকে৷

১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে সংসদীয় হুইপের দায়িত্ব দেয়৷ তিনি শীর্ষ আলেমদের পরামর্শে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ বয়সে খুব ছোট হলেও আব্বার হাত ধরে এমপি হোস্টেলে অনুষ্ঠিত সেই পরামর্শ সভায় এক কোণে বসার সুযোগ হয়েছিলো আমার৷

তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে একটা বিষয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে৷ স্বাধীনতা-উত্তর বাঙলাদেশে প্রথম দেওবন্দি আলেম হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া মুফতি ওয়াক্কাসকে কওমী মাদরাসায় সানন্দে সংবর্ধনায় দেয়া হয়৷ সচিবালয় কিংবা সংসদ কার্যালয়ে কথা প্রসঙ্গে তিনি ইসলামী শিক্ষা এবং ইসলামী চেতনাকে বিভক্ত করার দুরভিসন্ধিতে ইংরেজ সরকার কর্তৃক আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরেন৷ এতে আলিয়া নিয়ন্ত্রকগণ ক্ষুব্ধ হন।

প্রেসিডেন্ট এরশাদের উপর ব্যাপক প্রভাবশালী শর্ষিনার মরহুম পীর মাওলানা আবু জাফর মুহাম্মদ সালেহ মুফতি ওয়াক্কাসকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে বলেন (মরহুম মুফতী গোলাম মোস্তফা (রহঃ)-র সূত্রে জেনেছি)। শর্ষিনার পীরসাহেব ছিলেন আলিয়া-শিক্ষকদের সংগঠন ‘জমিয়াতুল মুদাররিসিন’র প্রধান উপদেষ্টা৷ যে সংগঠনে একইসাথে জামায়াতে ইসলাম এবং মাজারপন্থি বেদাতিরা সম্পৃক্ত ছিলো৷ সে হিসেবে শর্ষিনার পীরসাহেবের তৎপরতায় কওমি-আলিয়া দ্বন্দ্বেরও একটা বহিঃপ্রকাশ ছিলো৷

এই নিরব দ্বন্দ্বের মধ্যেই বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী হিসেবে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব বক্তৃতা দিতে উঠলে তাকে বিব্রত করার জন্য সংশ্লিষ্ট একটি মহলের ইশারায় হৈ-হট্টগোল বাঁধানো হয়৷ এরপর জমিয়াতুল মুদাররিসিন পুনরায় তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ দিলে প্রেসিডেন্ট এরশাদ তাকে সরিয়ে যশোরেরই নাজিমুদ্দীন আল আজাদকে ধর্মপ্রতিমন্ত্রির দায়িত্ব দেন৷ তিনিও বেশিদিন মন্ত্রী থাকতে পারেননি৷ আসলে স্বৈরাচারী এরশাদের মন্ত্রিসভায় কারো মন্ত্রিত্বেরই কোনো নিশ্চয়তা ছিলো না৷

তবে স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এক মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবের আগে পরে আর কেউই বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়াটা আমাদের জন্য নিদারুণ ব্যর্থতা, হতাশা, দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয়৷

ওই সময় বড় বড় আলেমরা জমিয়ত করলেও রাজনৈতিক মাঠের ঝানু ব্যক্তিবর্গের বড় অংশ শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহঃ)-এর সাথে কাজে করেন৷ ওদিকে পীরসাহেব চরমোনাই-এর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও নিজস্ব গতিতে আগাতে থাকে৷ জমিয়ত মাদরাসাকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনাকে গুরুত্ব দেয় বেশি৷

ঐক্যবদ্ধ শক্তি গঠনের নিমিত্তে আলেম-ওলামাদের সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল এবং মেজর জয়নাল আবেদীনদের সম্পৃক্ত করে নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ শুরুতেই থমকে যায়৷ কারণে সেখানে আদর্শিক এবং নজরিয়াতি পার্থক্য ছিলো প্রবল৷

কালক্রমে ওলামায়ে কেরাম ১৯৯০-তে এসে আবার ঐক্যবদ্ধ হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তীব্রভাবে৷ তবে এবার আর দল বিলুপ্ত নয় বরং নিজ নিজ দলীয় পরিচিতি বহাল রেখে সম্মিলিত প্লাটফর্ম গড়তে জমিয়ত, মজলিস এবং ইশা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ নানামুখী তৎপরতা চালাতে থাকেন এবং তাদের দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ নামে নতুন একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরী হয়৷

লেখক: আলেম ও রাজনীতিবিদ

পরের কিস্তি
ইসলামী ঐক্যজোট: ঐক্যের নতুন প্লাটফর্ম